প্রকল্পের অধীনে পদ্মা সেতু-সংলগ্ন মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের জাজিরায় তাঁতপল্লী নির্মাণের কথা রয়েছে। শুরুতে শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী নামকরণ হলেও ২০২৪ সালে নামটি পরিবর্তন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমানে এটি হাজি শরীয়তুল্লাহ তাঁতপল্লী। ২৯৬ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকার প্রকল্পটির লক্ষ্য তাঁতিদের জন্য উন্নত পরিবেশ, কর্মসংস্থান, আবাসন, আধুনিক তাঁত সুবিধা, প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতের ব্যবস্থা করে শিল্পটিকে পুনরুজ্জীবিত করা। তবে দেড় বছরে শুধু নাম বদলেছে। প্রকল্পের কাজ এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাঁতপল্লীর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর। ওই এলাকার ১২০ একর জমিতে প্রথম পর্যায়ে জমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়নে মাটি ভরাট এবং প্রকল্প এলাকায় সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়। প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে। তবে দেড় বছর ধরে থমকে আছে প্রকল্পের কাজ। প্রকল্পের শিবচর অংশের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমি পড়ে আছে বিরানভূমি হয়ে। অন্যদিকে নাওডোবা এলাকার বিস্তীর্ণ জমিতে তরমুজের পরীক্ষামূলক চাষ হয়েছে এবার।
স্থানীয়দের দাবি, তাঁতপল্লী গড়ে তোলার জন্য তৎকালীন সরকার এ এলাকার ফসলি জমি অধিগ্রহণ করেছে। তাঁতপল্লী নির্মাণ হলে গ্রামীণ জনপদে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগবে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ। দ্রুত তাঁতপল্লীর নির্মাণকাজ শুরু করা উচিত।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তথ্য বলছে, প্রকল্পে ছয় তলাবিশিষ্ট ভবনে প্রত্যেক তাঁতির জন্য ৬০০ ফুটের কারখানা ও ৮০০ ফুটের মধ্যে আবাসন সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের শো-রুম, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, তাঁতির ছেলেমেয়েদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকার কথা রয়েছে। বিশাল এ প্রকল্পের প্রথম ধাপে ওই এলাকায় জমি অধিগ্রহণ করে মাটি ভরাট করা হয় এবং প্রকল্পের পুরো এলাকায় সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়। তবে দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে প্রকল্পের কাজ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরই প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে প্রকল্পটির অবকাঠামো। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এখন প্রকল্পের নাম হাজি শরীয়তুল্লাহ তাঁতপল্লী করা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁতপল্লীর কাজ বন্ধ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচএম ইবনে মিজান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তাঁতপল্লীর বিষয়টি আমার বিস্তারিত জানা নেই। শুনেছি এর নাম পরিবর্তন হয়েছে। যেটি আগে ছিল শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী, এখন এর নাম হয়েছে হাজি শরীয়তুল্লাহ তাঁতপল্লী। তএ বিষয়ের বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে পরে জানানো যাবে। আমার কাছে এ বিষয়ে তেমন কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই।’
সরজমিন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-শরীয়তপুর সড়কের দুই পাশেই তাঁতপল্লীর জন্য নির্ধারিত জায়গায় পড়ে আছে কিছু অবকাঠামো। এক পাশে কাশবন এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে স্থানটি। আনসার সদস্যদের থাকার জন্য একটি টিনশেড থাকলেও তা পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। দরজা-জানালা ভাঙা। সড়কের অন্য পাশে নাওডোবা অংশে পরিত্যক্ত ভূমিতে তরমুজ চাষ করতে দেখা গেছে কৃষকদের।
স্থানীয়রা জানান, অনেকদিন ধরেই সরকারি এ জায়গাগুলো পড়ে থাকায় পরীক্ষামূলকভাবে তরমুজের আবাদ করেছেন ওই এলাকার চাষীরা।
শিবচরের কুতুবপুর এলাকার কৃষক ইসমাইল খান বলেন, ‘প্রায় দেড় বছর ধরে তাঁতপল্লীর কাজ বন্ধ। আগে লোকজন আসত। এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। আমাদের কৃষিজমি তাঁতপল্লীতে পড়েছে। আমরা অধিগ্রহণের টাকাও পেয়েছি। তবে এখন কাজ বন্ধ রয়েছে। তাঁতপল্লী নির্মাণ হবে কিনা তাও জানা নেই। তাঁতপল্লীটি নির্মাণ হলে এ এলাকার উন্নয়ন হবে।’
স্থানীয় আরেক কৃষক আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘তখন ফসলি জমি দিয়েছি। উন্নয়নের স্বার্থে সরকার জমি নিয়েছে। আমরাও খুশি ছিলাম, এলাকায় শিল্প-কারখানা হবে। এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এখন কাজ বন্ধ। আদৌ তাঁতপল্লী হবে কিনা তাও অনিশ্চিত। তবে আমরা চাই সরকার দ্রুত তাঁতপল্লীর কাজ শুরু করুক।’
তাঁত শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাঁতপল্লীর জন্য সড়কের দুই পাশেই জায়গা নিয়েছে সরকার। আরেক পাশে তরমুজের চাষ করা হয়েছে এবার। বালি দিয়ে ভরাট করা খালি জায়গা পড়ে আছে। এজন্যই ওই এলাকার লোকজন তরমুজ চাষ করেছে। পরিত্যক্ত জায়গায় ফসল হলে খারাপ কী? সরকার শতকোটি টাকা খরচ করে জমি নিয়েছে, ভরাট করেছে। এখন পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এ এলাকার মানুষের উন্নয়ন হবে।
বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় সংশ্লিষ্ট কেউ অবস্থান করছেন না। প্রকল্পটি আদৌ বাস্তবায়ন হবে কিনা সে বিষয়ে মাদারীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আল নোমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পটি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেয়া হয়েছিল। বাস্তবায়নের জন্য জমি অধিগ্রহণও হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে তাঁতপল্লীর কার্যক্রম মূলত বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন সরকার সিদ্ধান্ত নেবে প্রকল্পটির ভাগ্যে কী হবে। এছাড়া আপাতত প্রকল্পটি চালুর কোনো অগ্রগতি দেখছি না।’