রাঙ্গামাটির সরকারি প্রাথমিক স্কুলে তীব্র শিক্ষক সংকট

চারবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরীক্ষাই নিতে পারেনি পার্বত্য জেলা পরিষদ

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণে ২০২২ সালের ২৯ মে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণে ২০২২ সালের ২৯ মে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। নানা জটিলতায় চারবার পরীক্ষা স্থগিত করেছে জেলা পরিষদ। সর্বশেষ গত ২১ নভেম্বর চতুর্থ দফায় নিয়োগ পরীক্ষায় যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ করা হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়েছে। ২০২২ সালে শুরু হওয়া এ নিয়োগ প্রক্রিয়া ২০২৫ সালে এসে শেষ করা না গেলেও প্রতি বছরই সহকারী শিক্ষক পদে অবসরজনিত কারণে শূন্যপদ সৃষ্টি হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম কার্যত বন্ধ থাকায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ক্রমাগত সংকট বাড়ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।

১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী, বিশেষায়িত তিন পার্বত্য জেলায় সরকারের ২৫টি স্থানীয় দপ্তর ও পার্বত্য জেলা পরিষদের (তিন জেলা পরিষদ) মাধ্যমে পরিচালিত হয় ৩০টি কার্যক্রম। তার মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রথম ধাপ প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগও রয়েছে। সে অনুযায়ী দেশের ৬১ জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় নিয়োগের বিষয়টি দেখভাল করে সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদ।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের তথ্য বলছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাঙ্গামাটির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চাকরিপ্রার্থীদের বয়সসীমা ৪০ বছর নির্ধারণ করা হয়। ২০২২ সালের ২৯ মে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল জেলা পরিষদ। ওই বছর ২৩ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পরীক্ষার তারিখও নির্ধারণ হয়। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় নিয়োগ কমিটি গঠন নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে প্রতিনিধি না পাঠানোর কারণে প্রথম দফার এ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দাবি, ৪০ বছর বয়সসীমা নির্ধারণের সার্কুলারটি বাতিল হয়েছে। কাজেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ৪০ বছর বয়সসীমা কার্যকরকরণ স্থগিত রাখার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানায়। পরবর্তী সময়ে বয়সসীমা ৪০ বছর কার্যকর করা যাবে না বলে ২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর সিদ্ধান্ত দেয় মন্ত্রণালয়। বয়সসীমা চূড়ান্ত করার পর ৩০ বছর বয়সসীমার প্রার্থীদের বাছাই করে ২০২৪ সালের ২৪ মে পরীক্ষা নেয়ার প্রস্তুতি নেয় জেলা পরিষদ। তবে ত্রিশোর্ধ্ব একজন প্রার্থী তাকে কেন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হবে না জানতে চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট করেন। ওই রিটে উচ্চ আদালত ৩০ বছরের ঊর্ধ্বের যারা আগে পরীক্ষার জন্য কার্ড পেয়েছেন, তাদেরও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ার আদেশ দেন। এ জটিলতায় ২০২৪ সালে দ্বিতীয় দফায় পরীক্ষা স্থগিত হয়।

সর্বশেষ চলতি বছরের ২৭ আগস্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সহকারী শিক্ষক পদে বয়সসীমা সর্বনিম্ন ২১ থেকে সর্বোচ্চ ৩২ বছর নির্ধারণ করা হয়। সে অনুযায়ী রাঙ্গামাটি জেলায় প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকের ৫৮৯টি শূন্যপদে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়। গত ১৪ নভেম্বর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে ১১ নভেম্বর ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে পরীক্ষা স্থগিত করে জেলা পরিষদ। পরে নিয়োগ পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন কর্মসূচি ও দাবির মুখে ২১ নভেম্বর পরীক্ষা নেয়ার উদ্যোগ নেয় নিয়োগ কমিটি। গত ১৯ নভেম্বর প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা বৈষম্যের অভিযোগ তুলে হরতালের ডাক দেয় স্থানীয় ‘কোটাবিরোধী ঐক্যজোট, সাধারণ শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকবৃন্দ’ নামের একটি জোট। তাদের অভিযোগ ও প্রধান দাবি হলো শিক্ষক নিয়োগে জেলা পরিষদ ৭০ শতাংশ উপজাতীয় কোটা ও ৩০ শতাংশ বাঙালি কোটায় চাকরি দিচ্ছে। জোটের আন্দোলনের মুখে নিয়োগ পরীক্ষা চতুর্থ দফায় স্থগিত হয়েছে।

বারবার জেলা পরিষদের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাকে দুঃখজনক মনে করছেন শিক্ষাবিদ ও অন্তর্বর্তী সরকারের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য নিরূপা দেওয়ান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন যার যেমন ইচ্ছা, তাই করছে। আমরা সবসময় বলি, মানসম্মত শিক্ষা দেয়া হচ্ছে না। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় অপ্রতুল শিক্ষক দিয়ে কীভাবে মানসম্মত শিক্ষা দেবে? শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরই হলো আমাদের ভিত্তি। কিন্তু সেই ভিত্তি যদি নড়বড়ে হয়, সেখানে পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হবে? এটা আসলে অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা যারা শিক্ষা নিয়ে কাজ করি, যারা চান শিক্ষা-দীক্ষায় পার্বত্য অঞ্চল এগিয়ে যাক, তাদের জন্য এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা আসলেই পিছিয়ে যাচ্ছি। ২০২২-২৫ সাল পর্যন্ত তিনটি বছর পিছিয়ে গেলাম। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় পাঠদান যে ব্যাহত হচ্ছে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটা দুর্ভাগ্যজনক।’

এদিকে নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী স্থানীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেয়া হবে, নাকি সর্বশেষ পুনর্বিন্যাসকৃত ৭ শতাংশ কোটা ও ৯৩ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে হবে; সেটি জানতে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা চেয়েছে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। এ নিয়ে গত ২২ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা জানতে চাইলে ১ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানায়, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিভাগের মতামত পাওয়ার পর চূড়ান্তভাবে জানানো হবে।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জেলা পরিষদের সদস্য দেবপ্রসাদ দেওয়ান বলেন, ‘সার্বিক বিবেচনায় চূড়ান্তভাবে সুস্পষ্ট মতামত না পাওয়া পর্যন্ত সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে পরবর্তী সময়ে কার্যক্রম গ্রহণ করা সমুচিত হবে না। জেলা সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুস্পষ্ট মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী কার্যক্রম সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে করা হবে। এ বিষয়ে জেলা পরিষদের সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে।’

আরও