টানা কয়েকদিন জ্বরে ভোগার পর হাসপাতালে যান চাঁদপুরের বাসিন্দা কামাল হোসেন (৩০)। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। দীর্ঘ সময় চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। সে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘জ্বর নিয়ে তিনবার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই। চিকিৎসক অনেক পরীক্ষা দিয়েছেন, কিন্তু ডেঙ্গুর দেননি। বারবারই বলেছেন ডেঙ্গুর কোনো লক্ষণ নেই। তিন সপ্তাহ জ্বরে ভোগার পর হাত-পায়ে র্যাশ দেখা দেয়, শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন হাসপাতালে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ডেঙ্গু ধরা পড়ে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার আচরণ। বদলে যাচ্ছে ডেঙ্গুর লক্ষণও। এতে আগে যেসব লক্ষণ দেখে ডেঙ্গু অনুমান করা হতো এখন সেগুলো আর মিলছে না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
ডেঙ্গু সম্পর্কে এক সভায় সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর বলেন, ‘ডেঙ্গু আগের মতো সহজভাবে মোকাবেলার সুযোগ নেই। এখন রোগীদের মধ্যে জটিল উপসর্গ বেশি দেখা যাচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। এজন্য পোর্টেবল আল্ট্রাসনোগ্রাম ও বেডসাইড হেমাটোক্রিট মেশিনের প্রয়োজনীয়তা এখন অনেক বেশি।’
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) সূত্রে জানা গেছে, ডেঙ্গুর ১, ২, ৩ ও ৪ নামে চারটি ধরন আছে। এর মধ্যে গত তিন বছর মানুষ বেশি আক্রান্ত হয়েছে ধরন-২-এ (ভ্যারিয়েন্ট)। চলতি বছর এর সঙ্গে ধরন-৩-এ আক্রান্তও বেড়েছে, যা বেশি হচ্ছে রাজধানীতে। নতুন এ ধরনের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় রোগীর ঝুঁকি অনেকটা বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিদরা। তাই এখন পর্যন্ত রাজধানীতে রোগ অনুপাতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার আগের দুই বছরের চেয়ে বেশি বলে জানান তারা।
রাজধানীর বাইরে চলতি বছর এখন পর্যন্ত বরগুনায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। উপকূলীয় জেলাটিতে গত জুনে ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তারের পর এক জরিপ চালিয়ে আইইডিসিআর জানায়, সেখানে আক্রান্তদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ ধরন-৩-এ আক্রান্ত।
এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হাসান সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এতদিন ডেঙ্গুর যে ধরনের প্রাধান্য ছিল একটি বিরাট সংখ্যা মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নতুন ধরন এলে সেই অ্যান্টিবডি আগের রোগীদের যে সুরক্ষা দিয়েছিল, তা আর কাজে আসবে না। আগেরবারের ধরনে আক্রান্ত ব্যক্তি নতুন ধরনে আক্রান্তের ঝুঁকিতে থাকবেন। আর নতুন ধরনে আক্রান্ত হলে তার জটিলতা বেড়ে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।’
ঢাকার বাসিন্দা জামাল হোসেন সম্প্রতি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসা চলাকালীন বারবার তাকে ডেঙ্গুর পরীক্ষা করানোর পরও তা নেগেটিভ আসে। কিন্তু আশঙ্কাজনকভাবে কমতে থাকে রক্তের প্লাটিলেট। তখন তাকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা দিয়েই সুস্থ করে তোলা হয়।
ডেঙ্গুর জন্য সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা হলো লক্ষণবিহীন ডেঙ্গু। এ প্রসঙ্গে ড. মাহবুবুল হাসান সিদ্দিকী বলেন, ‘আমাদের জন্য বিপদের কথা হলো ডেঙ্গুর ধরন বদলে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর লক্ষণও পাওয়া যাচ্ছে না। ডেঙ্গুর ধরন বদলে যাওয়ার কারণে মানুষ প্রথমে বুঝতে পারে না কিংবা ডাক্তার ডেঙ্গুর টেস্ট দেয় না। পরবর্তী সময়ে অবস্থা খারাপ হলে মানুষ শেষ সময়ে হাসপাতালে যাচ্ছে। এতে জটিলতা বাড়ছে।’
ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামনের দিনগুলোয় আরো ভয়ংকর আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রলম্বিত বর্ষার কারণে এখন ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমরা অনুমান করছি আগামী কয়েক সপ্তাহ ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে। এবার বর্ষা প্রলম্বিত হওয়া ছাড়াও আরেকটা কারণ হলো, সম্প্রতি দেশে একটা বড় ছুটি গেছে। এ সময় মশক কার্যক্রম অনেকটা ঢিলা হয়ে পড়ে। সামগ্রিকভাবে ডেঙ্গু মোকাবেলার জন্য স্থানীয় সরকারের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই বলেই মনে হচ্ছে।’
এদিকে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরো তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে দুজনের ও উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজনের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে এডিস মশাবাহিত এ রোগে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ২২০ জন প্রাণ হারিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৭০০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ সময় ডেঙ্গু নিয়ে সবচেয়ে বেশি ১৫৫ জন ভর্তি হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার বিভিন্ন হাসপাতালে। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪৯ রোগী ভর্তি হয় ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে (সিটি করপোরেশন ব্যতীত)।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৫২ হাজার ১০৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। এ সময় ডেঙ্গু নিয়ে ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয় বরিশাল বিভাগের হাসপাতালগুলোয়, ১৪ হাজার ২৯৬ জন। এর মধ্যে ৭ হাজার ৫৫৯ জনই বরগুনা জেলার বাসিন্দা।
ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। মৃত্যুর সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল বিভাগ, ৩২ জন।
বরগুনায় প্রচুর পরিমাণে লক্ষণহীন ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রচুর রোগী পাচ্ছি, যারা হাসপাতালে এলে ডেঙ্গুর লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তাদের পরীক্ষা করলে ঠিকই ডেঙ্গু ধরা পড়ছে। আবার এমন রোগীও পাচ্ছি যাদের ডেঙ্গু পরীক্ষা করলে নেগেটিভ আসে কিন্তু প্লাটিলেট কমতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর চিকিৎসা এক জটিল পরিস্থিতিতে এসে পৌঁছেছে।’
লক্ষণহীন ডেঙ্গু রোগী ঢাকায়ও প্রচুর পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বারিধারার মাদানী হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. ইব্রাহিম মাসুম বিল্লাহ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই আমরা অনেক রোগী পাচ্ছি যাদের জ্বর-ঠাণ্ডা ছাড়া অন্য কোনো লক্ষণ নেই। কিন্তু পরীক্ষা করলে ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। তাছাড়া ডেঙ্গু নেগেটিভ হওয়ার পরও প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে এমন রোগীও পাচ্ছি।’