পর্যটন অবকাঠামো বাড়লেও কক্সবাজারে উপেক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা

দেশের প্রধান পর্যটন জেলা কক্সবাজার। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে এখানে নিত্যনতুন আধুনিক ও বিলাসবহুল অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে, বাড়ছে শিল্পায়নও। এসব কারণে বাড়ছে জেলায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা।

দেশের প্রধান পর্যটন জেলা কক্সবাজার। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে এখানে নিত্যনতুন আধুনিক ও বিলাসবহুল অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে, বাড়ছে শিল্পায়নও। এসব কারণে বাড়ছে জেলায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা। এখানে অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। কয়েক বছর ধরে এ জেলায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৩-১৪ লাখ মানুষ বাস করছে। পর্যটনে ঝাঁ চকচকে অবকাঠামোর বিপরীতে জেলার চিকিৎসা পরিষেবা পড়ে আছে সেই মান্ধাতা আমলে, রুগ্‌ণ দশায়। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এ জেলার সাধারণ মানুষসহ দেশী-বিদেশী পর্যটক।

সরকারি হিসাবে কক্সবাজার জেলায় মোট জনসংখ্যা ২৭ লাখ ৯০ হাজার। প্রতিদিন গড়ে এক লাখ পর্যটক, কয়েক লাখ অস্থায়ী বাসিন্দার পাশাপাশি ১৩-১৪ লাখ রোহিঙ্গাসহ দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার কর্মী মিলিয়ে কক্সবাজারে বসবাসকারীর সংখ্যা ৪৫ লাখের বেশি। কিন্তু এ বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি হিসাবে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা মাত্র ৫৮৬। এর মধ্যে শুধু কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ২৫০ শয্যাই মূল শহরের বাসিন্দাদের চিকিৎসাপ্রাপ্তির প্রধান ভরসা। হাসপাতালটিতে ৩২৮টি পদের মধ্যে ৭৬টি শূন্য রয়েছে। জরুরি বিভাগে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ শতাধিক রোগী সেবা নিতে আসে। মাত্র তিনজন চিকিৎসক তাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

এমন পরিস্থিতিতে জটিল কিংবা সাধারণ রোগেও কক্সবাজারবাসীকে চিকিৎসা নিতে ছুটতে হয় চট্টগ্রামে শহরে, কক্সবাজার মূল শহর থেকে যার দূরত্ব প্রায় ১৬০ কিলোমিটার। এ পথ যেতে সময় লাগে ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা। গুরুত্বপূর্ণ হলেও মাত্র দুই লেনের মহাসড়কের কারণে যাতায়াতে দীর্ঘ সময় লাগে। স্থানীয় অপ্রতুল চিকিৎসাসেবার কারণে সবচেয়ে কাছের বিভাগীয় জেলায় যেতেও ভোগান্তির শিকার হয় কক্সবাজারবাসী। পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কক্সবাজার জেলা দেশের সর্বদক্ষিণে হলেও বিভিন্ন কারণে খুব গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসাসেবা পেতে এখানকার মানুষের জন্য কক্সবাজার জেনারেল হাসপাতাল মূল ভরসা। বিশেষ করে এখানে আসা সাধারণ ও ভিআইপি পর্যটক, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিদেশী কর্মীরাও জেনারেল হাসপাতালের ওপর নির্ভর করেন। অপ্রতুল সুবিধা সত্ত্বেও আমরা এ হাসপাতালের মাধ্যমে সব ধরনের রোগীকে চিকিৎসা সুবিধা দিয়ে যাচ্ছি।’

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, কক্সবাজার সদর হাসপাতাল ২৫০ শয্যার হলেও প্রতিদিন দেড়-দুই হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। এছাড়া হাসপাতালে গড়ে এক হাজার রোগী ভর্তি থাকে। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল রোগের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই এ হাসপাতালে। ২০২০ সালের দিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময় বিদেশী সংস্থার অধীনে ২০ শয্যার আইসিইউ ও ২০ শয্যার সিসিইউ সেবা চালু ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তিরও ইতি ঘটে। এরপর বিভিন্ন দাবির মুখে সামান্য লোকবল দিয়ে চলছে এ বিভাগের সিসিইউ সেবা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আইএসও প্রকল্পের মাধ্যমে এ বিভাগে বর্তমানে সাতটি আইসিইউ ও ১০টি সিসিইউ বেড চালু রয়েছে। এ মাসের শুরুতে সিসিইউ কয়েক দিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দুজন চিকিৎসককে পদায়ন করা হয়। পরে আরো দুই চিকিৎসক বিনাবেতনে সেবা দিতে সম্মতি জানালে চারজন দিয়ে চালু করা হয়েছে বিভাগটি। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মং টিং ঞো এসব তথ্য জানান।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ। কিন্তু ১৭ বছরেও এ মেডিকেল কলেজের জন্য প্রতিশ্রুত ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়নি। কক্সবাজার মেডিকেলকে হাসপাতালে রূপান্তর নিয়ে অজানা কারণে গড়িমসি হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. অং সুই প্রু মারমা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কক্সবাজারের স্বাস্থ্যসেবা খাতের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে বর্তমান সরকার অবগত। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমানের কাছে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা হাসপাতাল নির্মাণের দাবি তুলে ধরেছেন। কয়েক মাসের মধ্যেই হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হবে।’

ডা. অং সুই প্রু মারমা আরো জানিয়েছেন, শিগগিরই বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের শয্যা সংখ্যা উন্নীতকরণ, চিকিৎসক নিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে কক্সবাজারের চিকিৎসা খাতকে নতুন রূপে নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু হবে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামকে ঘিরে বর্তমান সরকার বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। অবকাঠামোগত বৃহৎ কর্মযজ্ঞ সত্ত্বেও কক্সবাজারে চিকিৎসা ব্যবস্থার নাজুক পরিস্থিতি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জড়িতদের স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলায় সরকারি হাসপাতালগুলোর মোট শয্যা সংখ্যা ১২ হাজার ৮০৬। জনসংখ্যার অনুপাতে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যায় এসব জেলার মধ্যে কক্সবাজারের অবস্থান সপ্তম। পর্যটক, বিদেশী নাগরিক, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ পর্যটন জেলাটির ৪৫ লাখেরও বেশি মানুষের জন্য বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের ৫৮৬টি শয্যা খুবই অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। জেলায় আসা পর্যটকদের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের বিশেষ দুর্ভোগে পড়তে হয়। আর অসুস্থতা গুরুতর হলে প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার অভাবে বাড়ে জীবনের ঝুঁকিও।

আরও