মঙ্গলবার কক্সবাজার থেকে ১৩-১৪ কিলোমিটার দূরে হিমছড়ির পেঁচারদ্বীপ এলাকায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থী সমুদ্রে নামেন। স্থানীয় জেলেরা ওই শিক্ষার্থীদের বারণ করলেও তারা সে সতর্কবার্তা শোনেননি। পরে বৃষ্টি শুরু হলে দুই বন্ধু সৈকতে উঠে আসতে পারলেও বাকি তিনজন পারেননি। কয়েক মিনিটেই তারা সমুদ্রে ভেসে যান। গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দুইজনের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। একজন এখনো নিখোঁজ।
ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ থাকায় দেশের স্থানীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় গত প্রায় এক বছর আগের চেয়ে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। ব্যতিক্রম নয় দেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ কক্সবাজার। এছাড়া রেলপথে সংযুক্ত হওয়ায় কক্সবাজারের সৈকত পর্যটকদের আরো কাছে এসেছে। অন্যদিকে সৈকতে নেমে জোয়ার কিংবা ভাটায় ভেসে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও সম্প্রতি বেড়েছে। কিন্তু পর্যটকদের আগাম সতর্কবার্তা দেয়া এবং এ রকম পরিস্থিতিতে উদ্ধারের নির্ভরযোগ্য বেসরকারি সার্ভিসটি অর্থাভাবে বন্ধের পথে।
কক্সবাজারের সৈকতে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা দিতে ২০১৪ সালে ‘সি সেফ প্রজেক্ট’ চালু করে দ্য সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কক্সবাজারের জনপ্রিয় তিনটি সমুদ্রসৈকতে ২৭ জন প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড কর্মী পর্যটকদের সেবা দিয়ে আসছেন। ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের ৭ জুলাই পর্যন্ত ৬৩ জন কক্সবাজার সৈকতে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এ সময়ে লাইফগার্ড কর্মীরা ৭৯৫ জন পর্যটককে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। ২০১৫ সালে সমুদ্র স্নানে যাওয়া ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর ২০২৪ সালে রেকর্ড ১২ পর্যটক মৃত্যুবরণ করেন। গত বছর ১৪৩ জনকে উদ্ধার করাও ছিল বিগত এক দশকের মধ্যে রেকর্ড। আর এ বছরের প্রথম ছয় মাসে ১১ জন পর্যটক কক্সবাজারের সৈকতে প্রাণ হারিয়েছেন। একই সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে ৫৩ জনকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লেও সমানতালে লাইফগার্ড কর্মীর সংখ্যা বাড়েনি। বরং এক্ষেত্রে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পরিচালিত উদ্যোগ অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আগামী সেপ্টেম্বরে। কক্সবাজারের পর্যটন অর্থনীতি নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার অভাবে সমুদ্রসৈকত বিপজ্জনক হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সিআইপিআরবির সি সেফ প্রকল্পের ফিল্ড টিম ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পের অধীনে স্বল্প জনবল নিয়ে কক্সবাজারের মতো দীর্ঘ একটি সমুদ্রসৈকতের মাত্র তিনটি পয়েন্টে লাইফগার্ড সদস্যরা কাজ করেন। তা-ও প্রতিটি বিচের মাত্র ৫০ শতাংশ এলাকা আমাদের সদস্যদের নজরদারির আওতায় থাকে। সীমিত সুবিধা, প্রতিনিয়ত প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আমাদের কর্মীরা কাজ করেন। ফান্ড পাওয়া না গেলে আগামী সেপ্টেম্বরে প্রকল্প শেষ হয়ে যাবে। আমরা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে আবেদন করেছি।’
উল্লেখ্য, হিমছড়ি এলাকার যে সৈকতে মঙ্গলবারের দুর্ঘটনাটি ঘটেছে সেটি সি সেফ প্রকল্পের নজরদারির বাইরে।
জেলা প্রশাসন ও সিআইপিআরবির তথ্যমতে, কক্সবাজারে তিনটি সৈকতে লাইফগার্ড কর্মীরা কাজ করেন। তারা পাঁচ ওয়াচ টাওয়ার থেকে পর্যবেক্ষণ এবং নয়টি স্কি টিউব ও একটি রেসকিউ বোট দিয়ে সৈকতে বিপদগ্রস্ত পর্যটককে উদ্ধার করেন। এছাড়া সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার হিসাবে হাঁটুপানিতে নামার স্থান নির্ধারণে লাল, লাল-হলুদ পতাকা উত্তোলন, হুইসেল প্রদানের মতো সতর্কতামূলক কাজও করেন এ কর্মীরা।
অসতর্কতা ও নির্দেশ অমান্য করে সমুদ্রে নামা পর্যটকদের সমুদ্রে ভেসে যাওয়া বাড়লেও এ বিষয়ে কক্সবাজার প্রশাসনের আধুনিক ও টেকসই কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, তাদের অধীনে অস্থায়ী ভিত্তিতে কক্সবাজারে ২৯ জন, সেন্টমার্টিনে পাঁচজন বিচ কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। এ কর্মীরা পর্যটকদের সতর্ক করতে মাইকিং, হাঁটুপানির বেশি পানিতে না নামতে নির্দেশনা প্রদান, বিপদ বুঝে লাল-হলুদ পতাকা ওড়ানোসহ বিভিন্ন কাজ করেন। তবে বিপদে পড়া পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখে সি সেফ প্রকল্পের লাইফগার্ডরা।
যোগাযোগ করা হলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শাহিদুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে নেমে মৃত্যুর সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। বেসরকারি উদ্যোগে চলমান সি সেফ গার্ডদের কার্যক্রমে জেলা প্রশাসন নিয়মিত তদারকি করে। কিছুদিন আগে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেলে জেলা প্রশাসক বিভিন্ন সংস্থার কাছে চিঠি দিয়ে প্রকল্পটি চালু করেছেন। পর্যটক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সৈকতে ভেসে গিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় একটি টেকসই উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা করছে জেলা প্রশাসন।’ নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে বিচ কর্মীসহ সি সেফ গার্ড কর্মীদের সমন্বয়ে প্রশাসন পর্যটকদের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানান তিনি।
সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকত দেড় কিলোমিটার, লাবনী বিচ এক কিলোমিটার দীর্ঘ হলেও সি সেফ গার্ড কর্মীদের আওতায় থাকে মাত্র অর্ধেক। কক্সবাজার পৌর এলাকায় আরো বেশকিছু সৈকতে পর্যটকদের আনাগোনা থাকলেও সেখানে নিরাপত্তা দিতে পারছেন না তারা। পর্যটনসংশ্লিষ্টরা মনে করেন হিমছড়ি, ইনানী, পাটুয়ারটেক, সেন্টমার্টিনসহ বিভিন্ন সৈকতের অন্তত আরো ১০টি পয়েন্টে সি সেফ গার্ড নিয়োজিত করা প্রয়োজন। সিআইপিআরবিসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন পর্যটককেন্দ্রিক সংগঠন দাবি জানালেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তাই দিন দিন বিভিন্ন সৈকতে পর্যটকদের ভেসে যাওয়া ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন তারা।