থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের ব্যস্ততম সড়কে হঠাৎ ভয়াবহ ধস (সিংকহোল) দেখা দেয় গতকাল। সকাল সোয়া ৭টার দিকে আকস্মিক এ সিংকহোলে ৩০ মিটার প্রশস্ত ও প্রায় ৫০ মিটার (১৬০ ফুট) গভীর গর্ত তৈরি হয়। ব্যাংককের উপকণ্ঠে ভাজিরা হাসপাতাল রেলওয়ে স্টেশনের ওপরে বিশালাকার এ গর্তের কারণে স্টেশনের সুড়ঙ্গে মাটি ঢুকে আশপাশের কাঠামো ধসে পড়ে। পানি সরবরাহের বড় একটি পাইপ ফেটে যেতে দেখা যায়। বিদ্যুতের খুঁটিও ভেঙে পড়ে গভীর ওই গর্তে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংককে সৃষ্ট এ সিংকহোলের মতো ঘটনা ঘটতে পারে রাজধানী ঢাকায়ও। বিশেষ করে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বহুতল ভবন নির্মাণ, ব্যাপক হারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ভূমিধস ও সিংকহোলসহ মানবসৃষ্ট দুর্যোগের মতো বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরো বাড়িয়ে তুলেছে বলে জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
চলতি বছরের মে মাসে রাজধানীর ধানমন্ডি শংকর বাসস্ট্যান্ডের কাছে পিচঢালা রাস্তার মাঝখানে আকস্মিকভাবে বিশালাকার গর্ত তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। গর্তের ভেতরে পানি চলাচল ও বিদ্যুতের লাইনও দেখা যায়। বিশালাকার ওই গর্ত মাটি সরে যাওয়ার কারণে তৈরি হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিংকহোল না হলেও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর ফলে এ ধরনের গর্ত তৈরি হতে পারে।
ভূতত্ত্ববিদ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিল্কহোল মূলত মাটির নিচে ক্ষয় হয়ে এক ধরনের শূন্যস্থান তৈরি হওয়া, যা পরবর্তী সময়ে মাটির ওপরের স্তর দুর্বল করে ধসে পড়তে সহায়তা করে। এ ধরনের পরিস্থিতিগুলো ঘটে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, অতিভারী বৃষ্টি, ভূগর্ভস্থ কূপ খনন, অবকাঠামো নির্মাণ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি। জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ঢাকা দুই কারণে সিংকহোলের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রথমত, অনবরত ভূগর্ভস্থ পানি তুলে ফেলা। যে কারণে প্রতি বছর পানির স্তর তিন ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে মাটির নিচে ফাঁকা জায়গা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, মাটির ওপর বড় বড় অবকাঠামো এ শহরকে ভারী করে তুলছে। আশঙ্কা করছি যেকোনো সময় ভূমিকম্প অথবা সিংকহোলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নগরটিকে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, কোনো দুর্যোগের ব্যাপারে আমাদের নীতিনির্ধারকরা সজাগ নন। যদি তারা সজাগ হতেন, তাহলে অবশ্যই ঢাকা বিকেন্দ্রীকরণের প্রচেষ্টা থাকত। কিন্তু আমরা দেখছি, এখনো সবকিছুতে ঢাকাকেন্দ্রিক পরিকল্পনাই রয়ে গেছে।’
সিংকহোলের মতো ভয়াবহ ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলার অন্যতম একটি কারণ রাজধানীর পানি সরবরাহে অতিমাত্রায় ভূগর্ভস্থের পানি উত্তোলন করা। এটি এ শহরকে তীব্র ঝুঁকির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উইং ভূগর্ভস্থ পানি বিভাগের ২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৫ সালে ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ৩২ মিটার নিচে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে (২০০০ সালে) তা ৪১ মিটার নিচে নেমে গেছে। ২০০৫ সালে তা আরো বেড়ে ৫৪ মিটারে নামে। দুই দশকের ব্যবধানে অর্থাৎ ২০২৫ সালে এ পানির স্তর ৮০ মিটার নিচে নেমে যেতে পারে বলে ওই গবেষণায় প্রক্ষেপণ করা হয়। তাতে আরো দেখানো হয়, ২০৩০ সালে ৮৫ মিটার, ২০৩৫ সালে তা ১০০ মিটারের নিচে নেমে যেতে পারে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুস সালাম ব্যাপারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে ঢাকায় নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটবে, বিষয়টি ঢাকা ওয়াসা ৯০ দশকেই শনাক্ত করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শীতলক্ষ্যা, পদ্মা ও মেঘনার পানি পরিশোধন করে নগরবাসীর পানের উপযোগী করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য ছিল ৭০ শতাংশ পানি ভূ-উপরিস্থ হবে আর বাকি ৩০ শতাংশ নিচ থেকে তুলব। কিন্তু এতদিনে অনেক অবকাঠামো হয়েছে, কিন্তু সেগুলো ত্রুটির কারণে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আমরা আশা করছি, আর এক বছরের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির নির্ভরতা কমিয়ে আনতে পারব।’
রাজধানী ঢাকায় গত দুই দশকে প্রচুর অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। বাস্তবায়ন করা হয়েছে অনেক বড় বড় প্রকল্প। রাজধানী ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনা, নগরায়ণ পরিকল্পনায় বড় বড় নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে ঢাকায় নির্মাণাধীন ও পরিকল্পনাধীন এসব অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। এতে এ শহরের ভূমির সহনশীলতায় বড় প্রভাব পড়বে। ফলস্বরূপ রাজধানীর ভূমি ডেবে যাওয়ার প্রবণতাও বেড়ে যাবে বলে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত, গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
ভূতাত্ত্বিক গঠনের দিক থেকে ঢাকা মধুপুর ট্র্যাকের অন্তর্ভুক্ত। আর এ এলাকার বেশির ভাগ মাটিই শক্ত। সে হিসেবে ঢাকার ভূমি ডেবে যাওয়ার প্রবণতা কম হওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। কিন্তু ঢাকার নগর সম্প্রসারণ খুব একটা স্বাভাবিকভাবে হয়নি বলে জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। জলাভূমি, পুকুর, খাল দখল করেও বৃহৎ আকারে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণে ঢাকার মিরপুর, উত্তরা ও ডেমরার মতো খাল-বিল ও নদ-নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোয় ডেবে যাওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ঢাকার ভূমি ডেবে যাওয়া নিয়ে টাইম সিরিজ গবেষণা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তিন শিক্ষক।
১৯৯৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনটি স্যাটেলাইট থেকে ইমেজ নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে ভূমি ডেবে যাওয়ার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। এর মধ্যে মিরপুর ও উত্তরার ডেবে যাওয়ার পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বেশি। গত ২০ বছরে মিরপুর ১০ ইঞ্চি ও উত্তরা নয় ইঞ্চি ডেবে গেছে। রমনা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকা ডেবেছে প্রায় আট ইঞ্চি করে। একই পরিমাণ ডেবেছে লালবাগ ও ডেমরা অঞ্চল। এছাড়া গুলশান, তেজগাঁও, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর ডেবেছে সাত ইঞ্চি পরিমাণে।
ঢাকায় সিংকহোলের ঝুঁকি রয়েছে কিনা—এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিংকহোলের বিষয়টি নিয়ে এখনো ভাবা হয়নি। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে এখনো ঘটেনি। যে কারণে বিষয়টি পরিকল্পনায় উঠে আসেনি। তবে ঢাকায় যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাতে সিংকহোল নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। বিশেষ করে লালমাটিসমৃদ্ধ এলাকার বাইরে যেভাবে ঢাকা বেড়ে উঠেছে, সে এলাকাগুলো পুরোটাই ঝুঁকিতে। বর্ধিত ঢাকার পুরোটাই জলাভূমি বা কৃষিজমি ভরাট করে করা হয়েছে। ফলে এসব এলাকায় ভূমিকম্প বা সিংকহোল দুটোই ঘটার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে দেশে ক্রামগত ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটছে। বিষয়গুলো এখনই আমলে নিয়ে কার্যকর সমাধানের দিকে এগোনো উচিত।’
ঢাকার ভূমি অবনমন সম্পর্কে একটি পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায় ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের করা আরেকটি গবেষণায়। ২০০৫-০৭ সাল পর্যন্ত ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সুজিত কুমার বালা গবেষক দলের সদস্য ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তখন আমাদের গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার মাটি বেশ ভালোই শক্ত। ভূমি ডেবে যাওয়ার ঝুঁকি তখনো আমরা পাইনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঢাকার নগরজীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিপজ্জনকভাবে কমেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বেড়েছে ভারী অবকাঠামোর চাপ। ফলে এখন নতুন করে গবেষণা করে দেখতে হবে, ঝুঁকি কতটা বেড়েছে।’
নগরীর চাপ বহনের সক্ষমতা যাচাই না করলে ভবিষ্যতে বিপদ হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন নগর গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অবকাঠামোর চাপে ভারী হয়ে গেছে ঢাকা। মেট্রোরেল, পাতাল রেল, বাণিজ্যিক ভবন ইত্যাদি নির্মাণ করা হচ্ছে, কিন্তু ভূমির সহনক্ষমতা নিয়ে গবেষণা না করলে ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হবে। অবকাঠামোর চাপে মেক্সিকো, ব্যাংককের মতো শহরে ভূমি ডেবে বিপর্যয় নেমে এসেছে। আমরাও সে ঝুঁকির দিকেই যাচ্ছি।’
থাইল্যান্ডের মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশে তৈরি হওয়ার সম্ভবনা নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ভূমিকম্প সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে গবেষণাও হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ব্যাংককের মাটি খুবই কর্দমাক্ত-নরম। সেখানে সিংকহোল খুবই সাধারণ ঘটনা। এমনকি অনেক দূরে কোথাও ভূমিকম্প হলেও ব্যাংককে বড় বড় বিল্ডিংয়ে প্রচণ্ড কম্পন হয়। সৌভাগ্যক্রমে ঢাকার মাটি খুবই শক্ত। বিশেষ করে লালমাটির এলাকা। এখানে সিংকহোলের আশঙ্কা নেই।’