‘ট্রিপল এ’ ক্রেডিট রেটিং একটি ব্যাংকের আর্থিক শক্তি ও সুশাসনের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। আপনার দৃষ্টিতে এ স্বীকৃতি অর্জনের পেছনে কোন কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে?
ধন্যবাদ। আপনি ঠিকই বলেছেন, একটি ব্যাংকের ‘ট্রিপল এ’ ক্রেডিট রেটিং প্রাপ্তির নেপথ্যে তার আর্থিক শক্তি ও সুশাসনের ভূমিকা অপরিসীম। মূলত এ দুই প্যারামিটার ‘ট্রিপল এ’ ক্রেডিট রেটিং অর্জনের ফাউন্ডেশন হিসেবে কাজ করে। আমার দৃষ্টিতে আরো কিছু প্যারামিটার রয়েছে, যা ইবিএলের স্ট্র্যাটেজিক ডিরেকশন ও অর্গানাইজেশনাল কালচারের ইতিবাচক ফলাফলকে নির্দেশ করে। যেমন সাসটেইনেবল ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি; লো-কস্ট ডিপোজিট আহরণে সুষম অগ্রগতি; উন্নত অ্যাসেট পোর্টফোলিও ও সুপিরিয়র কাস্টমার রিলেশন, যা অত্যন্ত সবল আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নিদর্শন; ইবিএলের অতিরিক্ত প্রভিশন সংরক্ষণ, যা সুষম ব্যবস্থাপনা ও উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পরিচায়ক; সবল ও বহুমাত্রিক ফান্ডিং প্রোফাইল; দক্ষ ও মজবুত মালিক পক্ষ এবং অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপনা বছরের পর বছর ইবিএলের ‘ট্রিপল এ’ রেটিং অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এ রেটিং ধরে রাখার জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
এ রেটিং ধরে রাখার জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যালান্স শিট গ্রোথ। আমরা ডিপোজিট মোবিলাইজ করতে পারছি, কিন্তু আমাদের কনভেনশনাল ও ইসলামিক ব্যাংকিং—উভয় উইং থেকেই এ তহবিলের বিনিয়োগ এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ আপনি জানেন, বর্তমানে প্রাইভেট ক্রেডিট গ্রোথ রেট ৫ শতাংশের নিচে, যা একসময় প্রায় ১৮ শতাংশ ছিল। আমরা আমাদের রিস্ক অ্যাপেটাইট স্টেটমেন্ট অনুযায়ী কাজ করছি, কিন্তু গ্রাহকদের ঋণের চাহিদা কম। অন্যদিকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের ইল্ড নিম্নমুখী, আর পুঁজিবাজার এখনো তার কাঙ্ক্ষিত সূচকে পৌঁছতে পারেনি। ব্যালান্স শিট গ্রোথ না হলে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন হবে না। এখন বিশেষ করে আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী প্রভিশন ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আরো একটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হলো ব্যাংকের ক্যাপিটাল রেইজ করা। ব্যাংকগুলোর ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুসরণ করতে এবং উচ্চ লভ্যাংশ প্রদান করতে উল্লেখযোগ্য মূলধন সংগ্রহ প্রয়োজন, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়।
‘ট্রিপল এ’ রেটিং কি তহবিল সংগ্রহের খরচ কমাতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে বা ব্যবসা সম্প্রসারণে বাস্তব কোনো সুবিধা দিচ্ছে?
জি, অবশ্যই। যখন একটি ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে ইয়ার-অন-ইয়ার ‘ট্রিপল এ’ রেটিং অর্জন করে, তখন সেই ব্যাংকে অ্যাকাউন্টেবিলিটি ও গুড গভর্ন্যান্সের বাস্তব প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয়, যা লায়াবিলিটি মার্কেটিংয়ে একটি অতিরিক্ত সুবিধা দেয়। একজন গ্রাহক তার কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা চান, যা একটি গুড গভর্ন্যান্স-সম্পন্ন ও ওয়েল-ম্যানেজড ব্যাংক নিশ্চিত করতে পারে।
‘ট্রিপল এ’ রেটেড ব্যাংক হিসেবে ইবিএল কখনই গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি। এমনকি কোনো ফরেন পেমেন্টেও ইবিএল কখনো ডিফল্ট করেনি। ইবিএলের লিকুইডিটি আরো ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত। এসব শক্তি গ্রাহকদের আস্থা বাড়াতে এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
আপনার ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বর্তমান অবস্থা কী? ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কী ধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করছেন?
ইবিএলের এনপিএল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ২ দশমিক ২৪ শতাংশ, যা ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রিতে সর্বনিম্ন। আপনারা নিশ্চয়ই অবগত, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে জাতীয় পর্যায়ে এনপিএল ছিল ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং সিএলের পরিমাণ ছিল ৬.৪৭ লাখ কোটি টাকা। ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংকের সিআরএম ডিভিশন শক্তিশালী করতে হবে, ক্রেডিট কমিটি গঠন করতে হবে, ক্রেডিট অফিসারদের ডিএলএ দিতে হবে এবং সর্বোপরি ক্রেডিট কালচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে কোনো চাপ প্রয়োগ বা নেম-ল্যান্ডিং হবে না।
আগামী দিনের ব্যাংকিং হবে প্রযুক্তিনির্ভর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিকস, ওপেন ব্যাংকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট ও সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আপনার ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর কৌশল কী?
ইবিএল ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন রোডম্যাপের প্রস্তুতি জোরেশোরে নিচ্ছে এবং এ বিষয়ে বিনিয়োগের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবও উপস্থাপন করেছে। ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন একটি হোলিস্টিক রোডম্যাপ, যেখানে প্রসেস অটোমেশন, রোবোটিক প্রসেসিং, অ্যাপ ও ওয়েব প্লাটফর্মের মাধ্যমে পেমেন্ট অটোমেশন এনহ্যান্সমেন্ট ও সাইবার নিরাপত্তা—সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আশার কথা, ইবিএল ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের এ দৌড়ে অগ্রগামী খেলোয়াড়, যে টেক ট্রান্সফরমেশনে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে আন্তর্জাতিক মানে আরো শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক করতে নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে কী ধরনের সমন্বয় ও সংস্কার সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন?
প্রথমত, আমি বিশ্বাস করি ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো—বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, বিএসইসি, এফআরসি ও আইডিআরএ যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে এবং যেকোনো পলিসি ফরমুলেশনে আগে সবার মতামত গ্রহণ করে, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এছাড়া বাজারমুখী সুদহার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের যৌক্তিক ইনডিপেনডেন্স নিশ্চিত হলে তা ব্যাংক খাতের জন্য খুবই মঙ্গলজনক হবে।
আগামী পাঁচ বছরে আপনার ব্যাংকের প্রধান কৌশলগত অগ্রাধিকার কী?
আগামী পাঁচ বছরের জন্য ইবিএলের কৌশলগত প্রায়োরিটি হবে সাসটেইনেবল ব্যালান্স শিট গ্রোথ, নিম্ন এনপিএল বজায় রাখা, রিটেইল ব্যাংকিংয়ে টপ টিয়ারে থাকা, সিএমএসএমই, ইসলামিক ব্যাংকিং ও ক্রেডিট কার্ড—তিন খাতে মার্কেট শেয়ারের দিক থেকে টপ টিয়ারে অবস্থান করা, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনে বিনিয়োগ, যাতে ইবিএলের সুফল আগামী বছরগুলোয় পেতে পারে।