পরিবেশের ছাড়পত্র পেতে জটিলতা

৪৫ স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটতে না পারায় দুই মাসে ক্ষতি ১৯০ কোটি টাকা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলো লাল শ্রেণীর তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান। তাই নতুন পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী, এসব ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছ থেকে দুই দফায় ছাড়পত্র নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ জটিলতায় ৪৫টি জাহাজ গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে কাটতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এগুলো আমদানি করায় দৈনিক ক্ষতি গুনতে হচ্ছে ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার মতো। আর দুই মাসে সেই ক্ষতির পরিমাণ ১৯০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলো লাল শ্রেণীর তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান। তাই নতুন পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী, এসব ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছ থেকে দুই দফায় ছাড়পত্র নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ জটিলতায় ৪৫টি জাহাজ গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে কাটতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এগুলো আমদানি করায় দৈনিক ক্ষতি গুনতে হচ্ছে ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার মতো। আর দুই মাসে সেই ক্ষতির পরিমাণ ১৯০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

দেশের জাহাজ ভাঙা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্যমতে, গতকাল পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টনের ৪৫টি স্ক্র্যাপ জাহাজ। এতে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ করতে হয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ মার্চ ‘পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩’ প্রকাশিত হওয়ার পর মধ্য মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০টি ইয়ার্ডে জাহাজগুলো সৈকতায়ন হয়েছে। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবেশ অধিদপ্তরে ২১ দিন পরপর অনুষ্ঠিত সভায় ছাড়পত্র দেয়া হয়। কোনো কারণে এক সভায় ছাড়পত্র নিতে না পারলে পরের সভার জন্য আরো তিন সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র নিতে এ দীর্ঘসূত্রতার কারণেই গত দুই মাসে ইয়ার্ডগুলোয় জাহাজ কাটিং কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিদিন ৭ লাখ টাকা ব্যাংককে সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। সেক্ষেত্রে ৪৫টি জাহাজের জন্য ইয়ার্ডগুলোর দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত তিনদিনে সৈকতায়ন হয়েছে বড় আকারের তিনটি স্ক্র্যাপ জাহাজ। এগুলোর ক্ষেত্রে আবার প্রতিদিন ১০ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি গুনতে হচ্ছে। অন্যদিকে কাজ না করালেও বেতন-ভাতা দিয়ে যেতে হচ্ছে শ্রমিকদের। এতেও বড় অংকের ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। 

বিএসবিআরএর সহকারী সচিব নাজমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুই মাসের বেশি সময় কোনো জাহাজই কাটার অনুমোদন দেয়নি পরিবেশ অধিদপ্তর। স্ক্র্যাপ জাহাজগুলো সাধারণত ব্যাংকঋণ নিয়ে কেনা হয়। এমনকি কাস্টমসের নিয়ম মেনে প্রবেশের পরই সৈকতায়ন করতে হয়। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তরসহ প্রায় আটটি প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শন শেষ হলে এগুলো কাটা শুরু হয়। কিন্তু দুই মাস ধরে বিভিন্ন ইয়ার্ডে জাহাজ সৈকতায়ন হওয়ার পরও অনুমোদন জটিলতায় সেগুলো কাটাই শুরু করা যায়নি। এভাবে জাহাজ বসে থাকার কারণে প্রতিদিন স্ক্র্যাপ জাহাজের সুদ গুনতে হচ্ছে ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত।’ পরিবেশের নতুন বিধিমালা সংশোধন করে কমলা শ্রেণীতে ফিরিয়ে আনা এবং আইন সংশোধন না করা পর্যন্ত অনুমোদনের বিষয়গুলো সহজীকরণের দাবি জানান নাজমুল ইসলাম।

পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালায় জাহাজ ভাঙা শিল্পকে লাল থেকে কমলা শ্রেণীতে ফিরিয়ে নিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. মোমিনুর রশীদ গত ১৫ মে এক চিঠির মাধ্যমে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করেন। কেননা শ্রেণী পরিবর্তনের কারণে জাহাজ ভাঙার কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে শিল্প খাতটিতে বিনিয়োগকারীরা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি স্টিল রড বা ইস্পাত শিল্পের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসবিআরএ সভাপতি আবু তাহের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার গত ৫ মার্চ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে লাল তালিকায় সর্বশেষ ৭২ নম্বরে রাখা হয়েছে জাহাজ ভাঙা শিল্পকে। আর লাল তালিকায় নেয়ায় ছাড়পত্র দেয়ার ক্ষমতা হারায় পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়। এখন ছাড়পত্র নিতে হলে দুই-তিন দফায় ঢাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয়ে আবেদন করতে হয়। গত দুই মাসে ছাড়পত্র না পাওয়ায় বিভিন্ন ইয়ার্ডে বুধবার পর্যন্ত ৪৫টি জাহাজ আটকে আছে। জাহাজগুলোয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। এভাবে চলতে থাকলে ছোট ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারবেন না।’ 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই ডলার কিংবা এলসি জটিলতায় জাহাজ ভাঙা শিল্পে অস্থিরতা চলছে। গত ফেব্রুয়ারির পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসায় বন্ধ থাকা ইয়ার্ডগুলো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করছে। ছোট-বড় স্ক্র্যাপ জাহাজগুলোয় টনপ্রতি খরচ হয়েছে প্রায় ৫৮০-৬০০ ডলার। কিন্তু নতুন পরিবেশ বিধিমালার কারণে জাহাজগুলো সৈকতায়নের পরও অনুমোদন না পাওয়ায় উল্টো প্রতিদিন লোকসান গুনছে। এ জটিলতা দ্রুতই নিরসন করা না হলে আবারো স্থবির হয়ে পড়বে ইয়ার্ডগুলো। শ্রমিকদের বেতন-ভাতাও বন্ধ করে দিতে হবে।

এসএন করপোরেশনের মালিক ও ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এসএন করপোরেশন হংকং কনভেনশন অনুযায়ী গ্রিন শিপইয়ার্ড হিসেবে অনুমোদন পেয়েছে। আমাদের এখানে স্ক্র্যাপ জাহাজ বিক্রি করতে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে। নরওয়ে কিংবা জাপানিজ প্রতিষ্ঠানগুলোও আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালার কারণে সৈকতায়নের পরও জাহাজ কাটা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে এ শিল্প খাতে। এ বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান জরুরি, নয়তো জাহাজ ভাঙা ব্যবসায়ীরা আগ্রহ হারাবেন, যার প্রভাব পড়বে দেশের ইস্পাত শিল্পের বাজারেও।’

এদিকে নতুন জাহাজ কাটা বন্ধ থাকায় চাহিদা তুঙ্গে থাকার পরও ইয়ার্ডগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী রি-রোলিং মিলগুলোয় স্ক্র্যাপ সরবরাহ করতে পারছে না। গত ৫ মার্চের আগে যেগুলো পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি পেয়েছিল বিভিন্ন ইয়ার্ডে এখন কেবল সে জাহাজগুলোই কাটা হচ্ছে। সেগুলো থেকেই কিছু স্ক্র্যাপ সরবরাহ হচ্ছে রি-রোলিং মিলগুলোয়। এতে ইয়ার্ডগুলোর পাশাপাশি রি-রোলিং মিলগুলোর মালিকরাও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (জেলা) মো. ফেরদৌস আনোয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন পরিবেশ বিধিমলা অনুযায়ী ছাড়পত্র বা অনুমোদনের বিষয়গুলো চলছে। বিভিন্ন শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে ৩৮টি জাহাজের ছাড়পত্রের জন্য আবেদন জমা দিয়েছেন। এর মাধ্যে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে আমরা ৩০টির অনুমোদনপত্র ঢাকায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি। সম্প্রতি এক সভায় ১১টি স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যেগুলো দ্রুতই আবেদনকারীদের জানিয়ে দেয়া হবে। বাকিগুলোও অনুমোদনের বিষয়ে কাজ চলছে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘জাহাজ ভাঙা শিল্পকে লাল থেকে কমলা শ্রেণীতে আনার জন্য এর মালিকরা শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমাদের (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন) মন্ত্রণালয়ে একটি সুপারিশ পাঠিয়েছেন। এখনো বিষয়টি সমাধান হয়নি। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় যেভাবে নির্দেশনা দেবে সেভাবেই সব কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।’

আরও