স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬ অনুষ্ঠিত

নাগরিক থেকে আবাসন প্রতিষ্ঠান, নগর পরিবহন কেউই নিয়মকানুন মানতে চায় না

বণিক বার্তা সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত কনক্লেভে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, ‘‌মহাপরিকল্পনা ছাড়া কাজ করা অনেকটা একটি লক্ষ্য ঠিক করে চারটি তীর ছোড়ার মতো।

নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়নের জন্য নিয়মকানুন থাকলেও বাস্তবে তা মানার প্রবণতা কম। নাগরিক থেকে আবাসন প্রতিষ্ঠান, এমনকি নগর পরিবহন—সবাই নিজের স্বার্থে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাচ্ছে। এর ফলে সারা দেশে নগরায়ণ প্রক্রিয়ায় জলাশয় ও খোলা জায়গা দখল, নকশাবহির্ভূত ভবন, অপরিকল্পিত আবাসন তৈরি হচ্ছে। আর ঢাকায় ক্রমেই বাড়ছে জনসংখ্যার চাপ। জমির স্বল্পতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নগরজীবনকে আরো কঠিন করে তুলছে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়; প্রয়োজন স্মার্ট আবাসন, পরিবহন, জ্বালানি ও নাগরিক সেবাকে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা। সে লক্ষ্যে সরকার প্রথমবারের মতো ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় মেট্রোপলিটন সিটি থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মাস্টারপ্ল্যান করা হবে বলে জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের।

তিনি বলেন, কোথায় কী ধরনের উন্নয়ন হবে, তা নির্ধারণে জোনিং করা হবে। মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া উন্নয়ন কার্যক্রম অনেকটা লক্ষ্য ঠিক না করে তীর ছোড়ার মতো। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরবান ডেভেলপমেন্ট ডাইরেক্টরেটকে (ইউডিডি) শক্তিশালী করা হচ্ছে। বণিক বার্তা আয়োজিত ‘‌স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ’ শীর্ষক স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী। গতকাল রাজধানীর বনানীতে শেরাটন হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে এ নীতি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

সরকারের নীতিনির্ধারক, আবাসন ও নির্মাণ খাতের উদ্যোক্তা এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের অংশগ্রহণে এ কনক্লেভে বক্তারা বলেন, স্মার্ট আবাসন ও টেকসই নগরায়ণে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাত—উভয় পক্ষকেই সুশাসন মেনে চলতে হবে। আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে করা যেকোনো কাজের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সাশ্রয়ী ও সবুজ আবাসন, বিকেন্দ্রীকরণ এবং কঠোরভাবে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দেশে বাসযোগ্য ও টেকসই নগর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এর মাধ্যমে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি তৈরির যে রূপকল্পের কথা বলা হয়েছে, সেটিও এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।

বণিক বার্তা সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত কনক্লেভে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, ‘‌মহাপরিকল্পনা ছাড়া কাজ করা অনেকটা একটি লক্ষ্য ঠিক করে চারটি তীর ছোড়ার মতো। আমরা সুনির্দিষ্টভাবে কাজ করতে চাচ্ছি। সেজন্য ইউডিডিকে শক্তিশালী করছি। এ বিভাগকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে চাই। ‌পর্যাপ্ত তথ্য থাকলে সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা যায়। সর্বশেষ যে শুমারি হয়েছে, সেটাও অনেকদিন হয়ে গেছে। আমাদের আরেকটি সঠিক শুমারি করা উচিত, যার ভিত্তিতে আমরা পরিকল্পনা করতে পারি।’

কনক্লেভে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী, ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসি ও জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, জিএমইএবির সভাপতি ও নাসির সিনট্যাক্স গ্রুপের এমডি নাসিম বিশ্বাস, স্পেসজিরো লিমিটেডের এমডি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ, ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসির এমডি ও সিইও নাসিমুল বাতেন, এবিসি রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের এমডি শ্রাবন্তী দত্ত, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। অনুষ্ঠানে দেশের আবাসন ও নির্মাণ খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তা, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তা, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেন।

সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে রাজউক চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা একটি বাসযোগ্য ঢাকা তৈরি করতে চাই, যেখানে অন্তত যেন ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বাস করা সম্ভব হয়।’

মো. রিয়াজুল ইসলাম আরো বলেন, ‘‌রাজউকের মূল কাজ হলো পরিকল্পনা দেয়া, ড্যাপ দেয়া। কাগজে-কলমে ড্যাপ একটি ভালো পরিকল্পনা, কিন্তু বাস্তবে তা ‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নাই’। ড্যাপে চিহ্নিত জলাশয়ের জায়গায় এখন অননুমোদিত ১০ তলা ভবন দাঁড়িয়ে গেছে। রাজউকের চেয়ারম্যান হিসেবে আমাকে এ বাস্তবতাটা অনুধাবন করতে হয়। এসব ব্যবস্থাকে সমন্বিত করতে না পারলে আমরা কোনোদিনই সমস্যার সমাধান করতে পারব না।’

স্মার্ট আবাসনের ক্ষেত্রে দেশে বিদ্যমান জমি সংকটকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম। তিনি বলেন, ‘আমাদের কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জমির স্বল্পতা। এ সীমিত জমিকে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারি। বিআইএম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুপরিকল্পিত আবাসন ও নগরায়ণের পরিকল্পনা করা যায়।’

ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে সুন্দর ও বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এ কাজ শুধু সরকার একা করতে পারবে না। অবশ্যই বেসরকারি অংশীজনদের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমি বিশ্বাস করি, ছোট্ট বাংলাদেশকে যদি আমরা স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ ও সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এটি সম্ভব।’

স্মার্ট সিটি কনক্লেভে আবাসন ও নির্মাণ খাতের চারটি পৃথক বিষয় নিয়ে প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ‘জ্বালানি রূপান্তর: এলপিজি ও সোলার’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে শিল্প উদ্যোক্তা ও ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, ‘নতুন শহর বা আবাসিক এলাকা উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে এলপিজি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এলপিজি স্টোরেজ করা হলে সেখান থেকে বাসাবাড়িতে সংযোগ দেয়া যেতে পারে। তখন সিলিন্ডার বহন করার প্রয়োজন হবে না। ঢাকায় অনেকগুলো এলপিজি কোম্পানি এভাবে জ্বালানি সরবরাহ করে থাকে। এতে বাসাবাড়ি বা কোনো ভবনের দুইতলা, তিনতলা কিংবা পাঁচতলায় সিলিন্ডার নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। এ ধরনের ব্যবস্থা করতে হলে প্রত্যেক সেক্টরে এর জন্য কিছু জায়গা রাখতে হবে। কারণ এখানে সেফটি ইস্যু আছে।’

একই সঙ্গে ভবিষ্যতের শহর ও আবাসিক এলাকা উন্নয়নের সঙ্গে জ্বালানি অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নিরাপদ এলপিজি সরবরাহ এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তিকে সমন্বিত করেই পরিকল্পনা করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

‘নির্মাণে দেশীয় সক্ষমতা’ শীর্ষক শিরোনামে আলোচনায় অংশ নিয়ে নাসির সিনট্যাক্স গ্রুপের এমডি নাসিম বিশ্বাস বলেন, ‘গ্লাস এমন একটি পণ্য, যা পুনর্ব্যবহারযোগ্য। গ্লাসের কোনো বর্জ্যই অপচয় করতে হবে না; এগুলো পুনর্ব্যবহার করা যায়। ফলে রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব। একই সঙ্গে নতুন কাঁচামাল ও আমদানি খরচও কমানো যায়।’

অনেক আবাসন নির্মাতা আধুনিক প্রযুক্তির গ্লাস ব্যবহারে এগিয়ে আসছেন উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘ফ্লোট গ্লাস উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। নির্মাণকাজে আরো বেশি গ্লাস ব্যবহার করলে ভবনের ভেতরে প্রাকৃতিক আলোর প্রবেশ বাড়বে, বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহার কমবে এবং জ্বালানির সাশ্রয় সম্ভব হবে। নির্মাণকাজে ডাবল-গ্লেজড গ্লাসের ব্যবহার বাড়ানো গেলে বড় ধরনের জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। এর মাধ্যমে ভবনের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।’

ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে উচ্চ শক্তির রড ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরে জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘নতুন প্রযুক্তিতে যে ইস্পাত বা রড তৈরি হচ্ছে, সেটা শুধু বিদ্যুৎ বা জ্বালানি খরচ কমায়, তা নয়। এটি উচ্চ শক্তির রড তৈরি করে। আগে যেটা ৪০০ গ্রেডে ছিল, সেটি আপগ্রেড হয়ে ৫০০ গ্রেডে এসেছে। আবার ৫০০ গ্রেড থেকে ৬০০ গ্রেডে এসেছি। নতুন প্রযুক্তিতে ইস্পাত তৈরি করলে সেটি ৬০০ গ্রেড পর্যন্ত করা যায়। আমার অনুরোধ, এ ধরনের শিল্প, যেগুলো আমাদের দেশীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে, সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। সবার বক্তব্যে সবুজ অর্থায়নের কথা উঠে আসছে। সেই বিষয়টি যেন সবাই মাথায় রাখেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় এখানে আছেন, রাজউকের চেয়ারম্যান মহোদয় আছেন, আমাদের আবাসন খাতের অনেকেই এখানে আছেন। সবার কাছে অনুরোধ, আপনারা এ বিষয়টি মাথায় রেখে উচ্চ শক্তিসম্পন্ন রডের ওপর ভিত্তি করে নকশা করবেন।’

স্মার্ট-সবুজ আবাসন ও অর্থায়ন নিয়ে কথা বলেন ডিবিএইচ ফাইন্যান্সের এমডি ও সিইও নাসিমুল বাতেন। তিনি বলেন, ‘খুব সহজেই কিন্তু বিল্ডিংকে গ্রিনে পরিণত করা যায়। ছাদে যদি রিফ্লেক্টেড পেইন্ট, সোলার ব্যবহার করি, ভেন্টিলেশন ঠিকমতো মেইনটেইন করি, ডিজাইন পর্যায়ে জানালার ওপর শেডিংগুলো করি, ট্যাপ ও শাওয়ারে লো-ফ্লো ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করি, এলইডি বাল্ব, বিএলডিসি ফ্যান চিন্তা করি তাহলে ৩ থেকে ৪ শতাংশ নির্মাণ ব্যয় বাড়বে। ২ হাজার ৫০০ টাকার জায়গায় হয়তো ২ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হবে। কিন্তু লাভ হবে দীর্ঘমেয়াদে। এফোর্টেবিলিটিতে এবং সাসটেইনেবিলিটি নিশ্চিতে সরকার এবং বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করলে তবেই আমরা যে স্মার্ট সিটির স্বপ্ন দেখছি, সেটা বাস্তবায়ন হবে।’

স্মার্ট-সবুজ আবাসনের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন স্পেসজিরো লিমিটেডের এমডি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘স্মার্ট আবাসন মানে শুধু আধুনিক প্রযুক্তি, সোলার রুফ বা নানা গ্যাজেট নয়; বরং ভবনে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের প্রবাহ নিশ্চিত করা, জ্বালানি ও পানির ব্যবহার এবং জীবনচক্রের ব্যয় কমানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সোলার, এনার্জি অডিট ও কম জ্বালানি ব্যয়ের উপকরণ ব্যবহারের পাশাপাশি ভবনটি এমন জায়গায় নির্মাণ করতে হবে, যেখান থেকে প্রয়োজনীয় সেবা ও কর্মস্থলে সহজে যাতায়াত করা যায়। তা না হলে দীর্ঘ যাতায়াতের কারণে পরিবহন ব্যয় ও কার্বন নিঃসরণ দুটোই বাড়বে।’

গ্রিন হাউজিংকে শুধু মার্কেটিং টার্ম নয় বরং প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়ে এবিসি রিয়েল এস্টেটের এমডি শ্রাবন্তী দত্ত বলেন, ‘এখন যেকোনো ধরনের পরিসংখ্যান বা পরিবেশগত বিবেচনায় আমরা বাংলাদেশ ও ঢাকা শহরে যে অবস্থায় আছি, সেখানে আমাদের সব অংশীজনের জন্য সবুজ আবাসনকে শুধু একটি প্রচলিত শব্দ বা বিপণনের বিষয় হিসেবে না রেখে এটিকে প্রয়োজনীয়তা হিসেবে বিবেচনা করার সময় চলে এসেছে। আমাদের এখানে দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে। জমি কমে যাচ্ছে। সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক। অন্য যেসব শহর এখন উন্নত হচ্ছে, সেখানেও ঢাকায় করা ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।’

আবাসন, নির্মাণ ও টেকসই নগরায়ণ বিষয়ে প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘রাজউকসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এরই মধ্যে প্রকৌশলীদের নিবন্ধন এবং ইলেকট্রনিক কনস্ট্রাকশন পারমিটের মতো বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু করেছে। ফলে ভবনের ডিজাইনের মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু নির্মাণকাজ চলাকালীন সেটি অনুমোদিত ডিজাইন ও নির্ধারিত মান অনুযায়ী হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করার সামগ্রিক ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিল্ডিং কোডে একটি ওভারসাইট অথরিটির কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি আইন করে এ ধরনের কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে এটিকে কার্যকর করতে বিধিমালা, অর্গানোগ্রাম, জনবল ও বাজেটসহ প্রয়োজনীয় কাঠামো দ্রুত তৈরি করতে হবে। এ কাজ শুধু সরকারি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। দক্ষ প্রকৌশলী, স্থপতি ও অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।’

স্মার্ট আবাসন ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চারটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘প্রথম সুপারিশ হলো সাশ্রয়ী ও সামাজিক আবাসন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে সাশ্রয়ী আবাসন গড়তে হবে। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে স্বল্পসুদে ঋণ ও উন্নয়নযোগ্য জমির জোগান বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, ল্যান্ড ব্যাংকিং ও ডেডিকেটেড আবাসন। দরিদ্র মানুষের জন্য ‘ল্যান্ড ব্যাংকিং’—নির্দিষ্ট জমি সংরক্ষিত রাখতে হবে। বাজারদরে জমি কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, তাই পরিকল্পনার মাধ্যমে তাদের চাহিদামতো ভাড়াভিত্তিক ও সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানিক পরিকল্পনা। কেবল ঢাকা বা চট্টগ্রামমুখী এ অসীম জনস্রোত সামাল দেয়া সম্ভব নয়। বরিশাল, ময়মনসিংহ, রংপুর, সিলেট, কুমিল্লা বা অন্যান্য বিভাগীয় ও আঞ্চলিক শহরগুলোকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, কঠোর আইন ও পরিকল্পনা প্রয়োগ। নকশাবহির্ভূত বা পরিবেশ ধ্বংসকারী কোনো উন্নয়ন মেনে নেয়া যাবে না।’

বণিক বার্তা আয়োজিত স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬-এ গতকাল উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সচিব মনদীপ ঘরাই, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম, প্রধান প্রকৌশলী মো. আমিনুর রহমান, সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শেখ মতিয়ার রহমান, পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-২) মোহাম্মদ কাইছার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অঞ্চল-৩-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উন নেছা শিউলী, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ তানজিলা খানম, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ড. সৈয়দা সায়কা বিনতে আলম, নগর পরিকল্পনাবিদ তৌফিক মহিউদ্দিন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এনায়েত হোসেন, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবু হাসানাত মো. কিশোয়ার হোসেন, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান ড. মো. মহিনুজ্জামান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, ত্রয়ী অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ ফজলে রেজা সুমন, নগর পরিকল্পনাবিদ ফারজানা রহমান, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সহসভাপতি মো. আলমগীর কবির, বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান।

অনুষ্ঠানে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এনসিসি ব্যাংক পিএলসি ও ইলেক্ট্রো মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুন নেওয়াজ সেলিম, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চেয়ারম্যান ও অনন্ত গ্রুপের এমডি শরীফ জহীর, প্রাইম ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান তানজিল চৌধুরী, সাবেক অর্থ সচিব ও সোনালী ব্যাংক পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হেলাল আহমেদ চৌধুরী, এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া, ওয়ান ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিত রহমান, পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল আলম খান চৌধুরী, অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কান্তি কুমার সাহা, এসবিএসি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি ও ডেল্টা এগ্রো ফুডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক, টিএএস গ্রুপ ও বাক্কাহ হোল্ডিংস লিমিটেডের চেয়ারম্যান কেএম মুজিবুল হক, এক্সপো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আনাম, এনেক্স কমিউনিকেশনস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান, ইলেক্ট্রো মার্ট গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আফছার, আনোয়ার ল্যান্ডমার্ক লিমিটেডের সিইও মোহাম্মদ ফছিউল মাওলা, ইউনিভার্সেল এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান সাজু, সামিট মেঘনাঘাট ১ ও ২ পাওয়ার কোম্পানিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. রিয়াজ উদ্দিন, রূপায়ণ গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান মাহির আলী খান রাতুল, আকিজ রিসোর্সের চিফ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার তৌফিক হাসান, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ মার্কেটিং অফিসার কাজি মো. মহিউদ্দিন, মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি লিমিটেডের চিফ মার্কেটিং অফিসার আবু সাঈদ রাজা, বিএসআরএমের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স প্রকৌশলী সৌমিত্র কুমার মুৎসুদ্দি প্রমুখ।

আরও