ঝিনাইদহে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বন নেই। যা আছে তার সবই সামাজিক বন। এক দশক আগেও সামাজিক বনায়নের পরিমাণ ছিল ১৪ দশমিক ২ একর। তবে অপরিকল্পিত আবাসনসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে তা অনেকাংশেই কমে গেছে। যদিও এর সঠিক হিসাব নেই বন বিভাগের কাছে। সাধারণত ঝোপ-জঙ্গলে আবাস গড়ে তোলে মেছো বাঘ কিংবা গন্ধগোকুলের মতো কিছু প্রাণী। এসব জঙ্গলে একসময় ফলদ গাছের আধিক্যও ছিল। তখন থেকেই আসতে শুরু করে কালোমুখো হনুমান। তবে বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় খাদ্য সংকটে পড়েছে এসব প্রাণী। খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে এসে অনেক সময় হিংস্রতার শিকারও হচ্ছে। সামনে মিললেই ফাঁদ পেতে বা তাড়া করে ধরা হচ্ছে এসব প্রাণী। পিটিয়ে হত্যার পর ঝুলিয়ে উল্লাস করার ঘটনাও ঘটেছে।
গত বছর পৌরসভার সাতগাছিতে একটি মেছোবাঘ ধানখেতে আশ্রয় নেয়। ধান কাটা মেশিনে গুরুতর আহত হয় বাঘটি। আহত অবস্থায়ই স্থানীয় জনতা পিটিয়ে হত্যা করে। পরে তা ঝুলিয়ে উল্লাস করতে দেখা গেছে। করা হয় ফেসবুক লাইভও। সবশেষ ২৯ ডিসেম্বর সদর উপজেলায় আহত অবস্থায় একটি মেছো বাঘ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে প্রাণীটিকে অবমুক্ত করে বন বিভাগ। এর আগে ২৭ ডিসেম্বর পার্শ্ববর্তী মধুহাটি ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামে আরো একটি মেছো বাঘ উদ্ধার করা হয়েছিল।
কুঠিদুর্গাপুর গ্রামের বাসিন্দা সাব্দার হোসেন জানান, তার বাড়িতে মুরগি ধরার চেষ্টা করছিল মেছো বাঘটি। মুরগির ডাক শুনে তিনি সেখানে গিয়ে দেখেন হাঁস-মুরগির ঘরে ঢুকে পড়েছে প্রাণীটি। এ সময় ভয়ে দূর থেকে ইট ছুড়ে মারলে মাথায় লেগে আহত হয় মেছো বাঘটি।
পরিবেশবিদরা বলছেন, নগরায়ণের ফলে বনাঞ্চল কমে যাচ্ছে। এতে বন্যপ্রাণী তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে। মানুষের মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতা কমে যাওয়ায় অকারণে অহরহ বন্যপ্রাণী হত্যার ঘটনাও ঘটছে। মানুষের প্রয়োজনে দেশের প্রতিবেশ ঠিক রাখতে বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্থানীয় বন বিভাগ ও প্রশাসনের দায়িত্বহীনতায় বাড়ছে এ হত্যাকাণ্ড। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে পোস্টারিং, মাইকিং কিংবা সভা-সমাবেশ প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় এ অঞ্চলে ফলদ ও বনজ গাছ থাকায় খাবারের অভাব ছিল না বন্যপ্রাণীর। কিন্তু গাছপালা কমে যাওয়ায় এখন খাবার সংকটে পড়েছে ঝোপ-জঙ্গলে থাকা প্রাণী। ফলে কখনো ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। এ অঞ্চলে অনেক আগে থেকেই কালোমুখো হনুমানের আবাস রয়েছে। জঙ্গলে আগের মতো খাদ্য না থাকায় অনেক সময় লোকালয়ে চলে আসে প্রাণীগুলো।
প্রাণ পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংগঠক সুজন বিপ্লব বলেন, ‘কালোমুখো হনুমান রক্ষায় তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ, শিকারি প্রাণীর হাত থেকে সুরক্ষা এবং স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। সরকার ও বন বিভাগকে তাদের জন্য অভয়ারণ্য ঘোষণা এবং খাবারের বরাদ্দ বাড়াতে হবে। যাতে তারা খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে না আসে এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাত এড়ানো যায়। যেসব অঞ্চলে কালোমুখো হনুমানের বিচরণ বেশি, সেগুলোকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা দরকার। তাদের বিচরণ ক্ষেত্র বা বনভূমি ধ্বংস করা থেকে বিরত থাকতে হবে। স্থানীয় মানুষের মধ্যে হনুমান সংরক্ষণ ও তাদের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা, ফসল বা অন্যান্য ক্ষতি হলে হনুমানকে মেরে ফেলা বা আঘাত করা থেকে বিরত থাকার জন্য প্রচার চালাতে হবে। নিরাপদ আবাসস্থলে গড়ে তুলতে বনায়ন করতে হবে। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় হনুমান নিধন বন্ধে আইনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ কার্যকর রয়েছে। আইন অনুযায়ী, যেকোনো বন্যপ্রাণী হত্যা, শিকার বা বাসস্থান ধ্বংস করা অপরাধ। আইনের ধারা ৩৮(১) অনুযায়ী, সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী হত্যা বা শিকার করলে দোষী ব্যক্তির সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
এ ব্যাপারে ঝিনাইদহ জেলা ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা জাকির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হনুমানের জন্য নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিদিন বন বিভাগের পক্ষ থেকে বাদাম, কলা ও সবজি খেতে দেয়া হয়, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। হনুমানগুলো শুধু মহেশপুর উপজেলার ভবনগর গ্রামেই থাকে। জেলার অন্য কোনো উপজেলায় তাদের অবস্থান নেই। মাঝে মধ্যে খাবারের অভাবে এদিক সেদিক ছুটে যায়। তবে এ জেলায় সামাজিক বনায়ন ছাড়া কোনো বন নেই। ১০ বছর আগে সামাজিক বনায়নের পরিমাণ ছিল শতকরা ১৪ দশমিক ২ একর। তবে বর্তমানে তা অনেকাংশে কমে গেছে। যদিও এর সঠিক কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। কেউ হনুমান শিকার করলে বা ক্ষতির চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়। জেলায় প্রাকৃতিক বন না থাকায় হনুমানের অভয়ারণ্য ঘোষণা করার কোনো সুযোগ নেই।’
তবে বাস্তবতা বলছে অন্য কথা। বন বিভাগের হিসাবে বর্তমানে ভবনগর গ্রামে রয়েছে দুই শতাধিক কালোমুখো হনুমান। অথচ একসময় ছিল দ্বিগুণের বেশি। প্রাকৃতিক আবাস ধ্বংস, খাবার সংকট আর মানবসৃষ্ট বৈরী পরিবেশে প্রাণীটির সংখ্যা দ্রুত কমছে।
পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে এ বিরল প্রজাতির হনুমান। ক্ষতিগ্রস্ত হবে জীববৈচিত্র্য। তাই সবার আগে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত সংরক্ষণ উদ্যোগ, খাবারের স্থায়ী ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা।