‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বর্তমান সরকার দেশের এভিয়েশন খাতকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তরে কাজ শুরু করেছে। আমাদের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা। এ অগ্রযাত্রায় এভিয়েশন খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এয়ারপোর্ট হলো দেশের আয়না। আমরা এয়ারপোর্টের যে অবস্থান পেয়েছি, সেটা থেকে তো বের হয়ে আসতে হবে। আমাদের এয়ারপোর্টে কার্গো ও যাত্রী সুবিধা আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। দীর্ঘ ৪২ বছর পর আমরা বেসামরিক বিমান পরিবহনের নিয়মকানুন পরিবর্তন করতে যাচ্ছি। যে নিয়মগুলো অংশীদারদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা আমরা দূর করছি। কারণ আমরা অংশীদারদের সুযোগ দিতে চাই—এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
সম্প্রতি আমি এয়ার এশিয়া পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। এয়ার এশিয়া পরিদর্শনে গিয়ে তাদের উড়োজাহাজ ও পরিচালনা পদ্ধতি দেখেছি—কীভাবে তারা ২৫ মিনিটের মধ্যে একটি উড়োজাহাজ প্রস্তুত করে ফেলে, কীভাবে তারা কম খরচে টিকিটের ব্যবস্থা করে। এসব অভিজ্ঞতা আমি গ্রহণ করছি। আমরা বাংলাদেশে এ বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে চাই। আমাদের উড়োজাহাজ নষ্ট হলে ঠিক করতে ভারত অথবা সিঙ্গাপুরে পাঠাতে হয়। তারপর আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নিয়ম মানতে হয়।
সিভিল এভিয়েশন আইনগুলো এমনভাবে সংশোধন করতে হবে, যাতে স্টেকহোল্ডারদের জন্য ভালো হয়। বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী হিসেবে আমি তা করব। এয়ারলাইনসে বিনিয়োগ সহজীকরণের লক্ষ্যে বিধিমালা তৈরিতে অংশীজনদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া বিমানের জটিল যন্ত্রাংশ রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জটিলতা নিরসনে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
আমরা ক্ষমতায় এসে একটি ভঙ্গুর এবং বিশৃঙ্খল এভিয়েশন খাত পেয়েছি। চারিদিকে যাত্রী হয়রানির অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। আমাদের সরকারের অন্যতম লক্ষ্য এ হয়রানি লাঘব করা। কনভেয়ার বেল্টে ছেঁড়া লাগেজ পাওয়া যেত, লাগেজ আসতে সময় লাগত দেড় থেকে ২ ঘণ্টা। সেগুলো কিন্তু এ কিছুদিনেই অনেক সমাধান হয়েছে। আমরা কর্মীদের শরীরে ক্যামেরা (বডি ক্যামেরা) যুক্ত করেছি। তিন-চারদিন আগে আমি নিজে পরিদর্শন করে নির্দেশনা দিয়েছি—যখন যাত্রীদের দরজা খুলবে, কার্গোর দরজাও একসঙ্গে খুলতে হবে। একদিকে যাত্রী নামবে, অন্যদিকে কার্গো নামবে, যাতে ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে সব লাগেজ বেল্টে চলে আসে। এরপর খবর নিলাম—এখন বেল্ট থেকে লাগেজ নিতে ৪০ মিনিটের বেশি সময় লাগে না।
আমরা এমন কিছু কাজ নতুন করে শুরু করেছি, যা আগের সরকার বাতিল করেছিল। তাদের সেই বাতিলের সিদ্ধান্তে আমাদের প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হতো। জাপানি কনসোর্টিয়ামকে বাতিল করার সিদ্ধান্তটি ছিল সত্যিই ধাক্কা দেয়ার মতো একটা সংবাদ। এ ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার কেন আমরা নষ্ট করব? আগের রাজনীতিবিদদের মাথায় এটি ছিল না। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনা করে তা পুনর্বহাল করেছেন।
আমাদের এটা নেই, ওটা নেই, রানওয়ে নেই, কেন প্লেন কিনছেন, টাকার অপচয়!—এ কথাগুলোর মধ্যে কিন্তু সত্যতা আছে। কিন্তু আমরা সেগুলো ঠিক করব। আমাদের ইতিবাচকভাবে ভাবতে হবে। সবকিছুই করা সম্ভব। এখন এ বিমানবন্দর থেকে আমরা ১২ মিলিয়ন যাত্রী যাতায়াত করাতে পারি। থার্ড টার্মিনাল যখন পুরোপুরি চালু হতে যাচ্ছে, তখন ২৪ মিলিয়ন বা তারও বেশি যাত্রী যাতায়াত করতে পারবে। আমার আশা এটি আরো বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ মিলিয়ন হবে, যার ফলে আন্তর্জাতিক এয়ারক্রাফট বাংলাদেশে আরো বেশি আসবে। আমরা আমাদের বিমানের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করব। বাজেট এয়ারলাইনস নিয়ে আমরা এরই মধ্যে আলোচনা করেছি। এমনকি এভিয়েশন খাতের স্বনামধন্য ব্যক্তি মিস্টার টনি ফার্নান্দেজের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে আগামী নভেম্বরে আসছেন। তিনি এখানেই এমআরও স্থাপন করবেন, বাজেট এয়ারলাইনস চালু করবেন। প্রয়োজন হলে—যদি এখানকার এয়ারক্রাফট সামলানো না যায়—আমরা একটি নতুন এয়ারপোর্টের কথা চিন্তা করব।
পর্যটন শিল্পকে সমৃদ্ধ করার জন্য আমরা এরই মধ্যে নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। পিপিপি মডেল, যৌথ উদ্যোগ মডেল এবং যেগুলো আমরা চালাতে পারছি না, সেগুলো বেসরকারি খাতকে দিয়ে সচল করা হবে।
আমরা অনেক উদ্যোগ হাতে নিয়েছি, তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময়ের প্রয়োজন। আপনারা অন্য দেশের উদাহরণ দেখতে পারেন, যেখানে অল্প কয়েকটি প্লেন থেকে শুরু করে আজ বিশাল বহর হয়েছে। কারণ সেখানে এভিয়েশন খাত নিয়ে অহেতুক টানাটানি করা হয়নি। আমাদের এখানে সংশয়-সন্দেহের প্রবণতা বেশি। আমি ধন্যবাদ জানাই ইউএস-বাংলাকে, তারা ২১টি বোয়িং নিয়ে এসেছে, সামনে হয়তো আরো কিনবে। আমাদের জাতীয় বিমান সংস্থাকেও শক্তিশালী করতে চাই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী চান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন খাত একটি উচ্চতর মাত্রায় উঠুক। আমরা এ অগ্রযাত্রায় সবার সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।