সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে গতকাল দুপুরে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আইনের অগণতান্ত্রিক ধারাগুলো বাতিল ও পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।
বৈঠকে গণমাধ্যমের সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা, সাংবাদিকদের দায়বদ্ধতা বাড়ানো, অপতথ্য রোধে ফ্যাক্ট চেকের ব্যবস্থা, গণমাধ্যম কমিশন গঠনের আগে আরো বেশি আলোচনা করা, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া হয়রানিমূলক মামলা এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবির এবং সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে বৈঠকে বলা হয়, গণমাধ্যমবিষয়ক আইনগুলো অনেক পুরনো এবং তা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এগুলো বহির্বিশ্বে দেশের গণমাধ্যমের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষ করে পত্রিকা প্রকাশের ঘোষণাপত্রের ফর্ম ‘বি’তে প্রকাশকদের ঘোষণা ও স্বাক্ষর দিয়ে বলতে হয়, ‘আমি, এই মর্মে আরও ঘোষণা করিতেছি যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের পরিপন্থী বা কোনো আপত্তিকর বিষয় আমার উক্ত পত্রিকায় প্রকাশে বিরত থাকিব এবং ১৯৭৩ সনের ছাপাখানা ও প্রকাশনা (ডিক্লারেশন ও রেজিস্ট্রেশন) আইনের সমুদয় নিয়মাবলি মানিয়া চলিতে বাধ্য থাকিব।’ এ ধারাটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে অগণতান্ত্রিক চরিত্র রয়েছে। তাই সম্পাদক পরিষদ ধারাটি বাতিলের দাবি জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে গণমাধ্যম সংস্কারের জন্য গণমাধ্যম কমিশন গঠন অথবা প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার বিষয় সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে বৈঠকে উত্থাপন করা হয়। এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রীকে আগামী জুনের মধ্যে এ-সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে জুলাইয়ের মধ্যেই সরকার যেন একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারে, সে অনুযায়ী উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
অপতথ্য রোধের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সম্পাদকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ বিষয়ে মূলধারার সংবাদপত্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। এজন্য সংবাদপত্রগুলোর ‘ফ্যাক্ট চেকের’ ব্যবস্থা রাখা উচিত। কোনো কোনো সংবাদপত্র ইতিমধ্যে তা শুরুও করেছে।
প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যমের স্বনিয়ন্ত্রিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জোর দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্পাদক পরিষদ আগামী জুলাইয়ের মধ্যে সাংবাদিকদের জন্য একটি ‘কোড অব কনডাক্ট’ বা আচরণবিধি প্রণয়ন ও গ্রহণের উদ্যোগ নেয়ার কথা জানায়।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া হয়রানিমূলক মামলার বিষয়টি তুলে ধরে সম্পাদক পরিষদের কয়েকজন সদস্য বলেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের যথাযথ অনুসন্ধান ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু হয়রানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণসাপেক্ষ অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই প্রচলিত আইন ও স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সম্পাদক পরিষদকে আশ্বস্ত করেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে আলাপ করবেন। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, সরকার গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রক নয়; বরং সহায়ক হিসেবে কাজ করতে চায়। তিনি বিশ্বাস করেন, শক্তিশালী গণমাধ্যম রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য অংশ এবং তার সরকার এ ব্যাপারে আন্তরিকভাবে কাজ করবে।
বৈঠকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান উপস্থিত ছিলেন। সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর, সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, কোষাধ্যক্ষ ও দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ। এছাড়া আরো উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দীন, করতোয়া সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক ও সুপ্রভাত বাংলাদেশ সম্পাদক রুশো মাহমুদ। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
পরে বৈঠক প্রসঙ্গে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর এবং ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। নূরুল কবীর বলেন, ‘আইন-কানুনের মধ্যে যে অগণতান্ত্রিকতার অংশগুলো রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে আমরা প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছি। অনেকগুলো বিষয়ে যে রিভিউ করা দরকার, সেগুলোয় তিনি সম্মত হয়েছেন। বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক মিডিয়া রেজিম গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ে একটি পরামর্শক কমিটি গঠনের বিষয়ে আমরা সম্মত হয়েছি। কমিটিটি জুন মাসজুড়ে কাজ করবে। এরপর জুলাইয়ের কোনো এক সময়ে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। সেই প্রতিবেদনের আলোকে একটি গণতন্ত্রপরায়ণ আইন প্রণয়ন করা হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘অন্য যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতিপূর্ণ চর্চা রয়েছে, সেগুলো থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সরকার যতদিন গণতান্ত্রিক আচরণ করবে, ততদিন সম্পাদকরা তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবেন বলে আমরা আশ্বাস দিয়েছি। তারা এটিকে স্বাগত জানিয়েছেন।’
ত্রুটি-বিচ্যুতির বিষয়ে নূরুল কবীর বলেন, ‘শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা পত্রপত্রিকাই নয়, সমাজের নানা জায়গায় ডিসইনফরমেশন ও মিসইনফরমেশন রয়েছে। এগুলো সমাজের সব অংশকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, এমনকি সাংবাদিকদেরও। এসব থেকে বেরিয়ে এসে পুরো গণমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর জনগণের আস্থা তৈরিতে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে আমাদের মধ্যে একটি সম্মিলিত ঐকমত্য হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীকে একটি তালিকা দেয়া হয়েছে জানিয়ে দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘সেখানে বলা হয়েছে, প্রায় ২৮২ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা রয়েছে এবং এর মধ্যে ৯৪ জন হত্যা মামলার আসামি। আমরা তালিকাটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দিয়েছি। এটি একেবারে সম্পূর্ণ তা বলব না, অসম্পূর্ণও থাকতে পারে। আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে তালিকাটি তৈরি করেছি এবং প্রধানমন্ত্রী তা গ্রহণ করেছেন। তথ্যমন্ত্রীও এ বিষয়ে বলেছেন।’
মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বলেছি যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা এবং এত ধরনের মামলা—এটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য ভালো নয়, এটা সরকারের ভাবমূর্তির জন্যও ভালো নয়।’ প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে কী বলেছেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘উনি খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে এটা গ্রহণ করেছেন এবং বলেছেন, এটা তারা পরীক্ষা করে দেখবেন। এ ব্যাপারে তারা আগ্রহী।’
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করলে তিনি সম্পাদকদের অনুভূতির সঙ্গে একমত পোষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না থাকায় সম্পাদক পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে অভিনন্দন জানিয়েছে।’