মিরসরাই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১ আসন। অতীতের নির্বাচনগুলোতে একাধিকবার আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তবে কোনো নির্বাচনেই আসনটিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর জয়ের রেকর্ড নেই। উপজেলা বিএনপির মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে দ্বন্দ্ব থাকলেও নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল নেতাকর্মীরা এখন ঐক্যবদ্ধ। নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকায় জামায়াতের জন্য এক ধরনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। জয়ের আশায় নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণাও চালাচ্ছেন দলটির প্রার্থী। কিন্তু ভোটাররা বলছেন, আসনটিতে জয় পেতে হলে বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে জামায়াত প্রার্থীকে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৬৭৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৯৯ হাজার ৮৫৯ জন আর নারী ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮১১ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন চারজন। পোস্টাল ব্যালট রেজিস্ট্রেশন করেছেন ৬ হাজার ৫৭২ জন। এ আসনে মোট ভোট কেন্দ্র থাকবে ১০৬টি। এর মধ্যে মিরসরাই থানার ৪৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ২১টি ঝুঁকিপূর্ণ। আর জোরারগঞ্জ থানার ৫৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নুরুল আমিন চেয়ারম্যান, জামায়াতে ইসলামীর অ্যাডভোকেট ছাইফুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অ্যাডভোকেট ফেরদৌস আহমদ চৌধুরী, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের রেজাউল করিম, জাতীয় পার্টির সৈয়দ শাহাদাৎ হোসেন, মুসলিম লীগের শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী ও জেএসডির একেএম আবু ইউসুফ।
বিগত নির্বাচনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমানে সমান লড়াই করেছে। জামায়াতে ইসলামী ছিল অনেক পিছিয়ে। এবার আওয়ামী লীগ মাঠছাড়া হওয়ায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে জামায়াত।
তবে নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের সমীকরণ ঘুরিয়ে দিতে পারে তরুণ ও নারী ভোটাররা। কারণ এবার ১৮-৩৩ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৭২ জন। এছাড়া নারী ভোটার রয়েছেন প্রায় অর্ধেক। জয়-পরাজয়ে তরুণ ও নারীরা বড় ভূমিকা রাখবেন।
এদিকে বিএনপির মধ্যে দীর্ঘসময় ধরে গ্রুপিং থাকলেও নির্বাচন সামনে রেখে নেতা-কর্মীরা এখন ঐক্যবদ্ধ। দলটির নেতারা বলছেন, এবারের নির্বাচনে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবেন দলের প্রার্থী।
উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আজিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি থেকে এবার ত্যাগী নেতাকে মনোনয়ন দিয়ে দল সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতদিন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় আমরা বিভক্ত ছিলাম। ধানের শীষের প্রার্থীকে জয়ী করতে এখন আমরা নুরুল আমিনের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ এবং সুসংগঠিত। মিরসরাইয়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানে আমাদের প্রার্থী বিজয়ী হবেন বলে আশা রাখি।’
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নুরুল আমিন চেয়ারম্যান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচন সামনে রেখে দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী একসঙ্গে কাজ করছেন। এর আগে কোনো প্রার্থীর পক্ষে শতভাগ ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার নজির নেই। দীর্ঘ ১৭ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। এবার ভোট দিতে সবাই মুখিয়ে আছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষের বিজয় হবে ইনশা আল্লাহ।’
বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীও সুসংগঠিত হয়ে মাঠে নেমেছেন। তাদের কর্মী বাহিনীর পাশাপাশি নারী কর্মীরাও সমানতালে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
অবশ্য ভোটাররা বলছেন, নির্বাচনী মাঠে বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে জামায়াত প্রার্থীর। তবে নারী ও তরুণদের ভোট যেদিকে ঝুঁকবে তার জয়ের পাল্লা ভারী হবে।
মিরসরাই উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা নুরুল কবির বলেন, ‘মানুষ অতীতে সব দলের ক্ষমতা দেখেছে। কিন্তু মিরসরাই কিংবা দেশের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই এবার সবাই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট ছাইফুর রহমানকে বিপুল ভোটে জয়ী করে সংসদে পাঠাবে ইনশা আল্লাহ।’
দলটির প্রার্থী অ্যাডভোকেট ছাইফুর রহমান পুরো উপজেলায় বিরামহীন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ পরিবর্তন চায়। পুরো উপজেলায় ভোটারদের কাছ থেকে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, আমরা জয়ী হব ইনশা আল্লাহ। আমি নির্বাচিত হলে টেকসই ও মানবিক উন্নয়নের রোল মডেল মিরসরাই গড়ে তুলব।’
তবে নির্বাচনী অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে বিএনপি প্রার্থী নুরুল আমিন চেয়ারম্যানকে এগিয়ে রাখছেন নির্বাচন ভোটাররা। তারা বলছেন, নুরুল আমিন প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার নির্বাচিত হন। পর্যাক্রমে তিনি ইউনিয়ন পষিদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয়েছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু ভোটারবিহীন ওই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের কাছে পরাজিত হন।