সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর

নির্বাচনের আগেই একীভূত হবে শরিয়াহভিত্তিক ৫ ব্যাংক

শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে একটি ব্যাংকে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।

শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে একটি ব্যাংকে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। আর তা জাতীয় নির্বাচনের আগেই হবে এবং এতে কোনো কর্মী চাকরি হারাবেন না বলেও তিনি আশ্বস্ত করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড রুমে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর এ কথা জানান।

গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘নির্বাচনের সঙ্গে ব্যাংক মার্জারের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমরা আশা করব পরবর্তী সরকার এসে এ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তবে নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা না করে কয়েক মাসের মধ্যেই পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক মার্জার করা হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তাদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে প্রয়োজনে শাখাগুলো স্থানান্তর করা হবে। শহরে বেশি শাখা হলে গ্রামে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হতে পারে।’

শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আহসান এইচ মনসুর দেশের ১৪টি বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেন। এ ব্যাংকগুলোর মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল), ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকও রয়েছে। এর প্রথম চারটি ব্যাংকেরই নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম গ্রুপের হাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অডিট ফার্ম দিয়ে পর্ষদ ভেঙে দেয়া ব্যাংকগুলোর অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর) করা হয়েছে। এর মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের নিরীক্ষা করেছে আন্তর্জাতিক অডিট ফার্ম ‘আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াং’ ও ‘কেপিএমজি’। এরই মধ্যে এ ব্যাংকগুলোর একিউআর শেষ হয়েছে।

একিউআর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শরিয়াহভিত্তিক এ পাঁচ ব্যাংকে জমা থাকা আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। আর ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের (বিনিয়োগ) স্থিতি ১ লাখ ৯১ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকাই খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৭৬ দশমিক ৬৯ শতাংশই খেলাপি। এ পাঁচ ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণও ৭৪ হাজার ৫০১ কোটি টাকা বলে নিরীক্ষায় উঠে এসেছে।

গভর্নরের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই ড. আহসান এইচ মনসুর বলে আসছেন, অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে দুর্বল হয়ে পড়া শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে একটি ব্যাংকে রূপান্তর করা হবে। আর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি স্বতন্ত্র ব্যাংক হিসেবে থাকবে। শরিয়াহভিত্তিক বৃহৎ দুটি ব্যাংক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। তিন মাসের মধ্যেই এ ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রধান উপদেষ্টার যুক্তরাজ্য সফরে সঙ্গী হয়েছিলন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরও। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে তিনি কথা বলেন। এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ‘পাচারকৃত সম্পদ উদ্ধারের বিষয়টি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার প্রক্রিয়া। আদালতের চূড়ান্ত রায় ছাড়া এসব অর্থ উদ্ধার সম্ভব নয়। এজন্য সুনির্দিষ্ট তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। আমরা চাই, আদালতের মাধ্যমে যাচাই হোক, আমাদের দাবি কতটা সঠিক। আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই অর্থ উদ্ধারে পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে।’

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে অর্থ ফেরতের পথও খোলা আছে। সেক্ষেত্রে উভয় পক্ষের আইনজীবীরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজবেন। কোন পথে এগোনো হবে, আদালত নাকি এডিআর, সেটি সরকার নির্ধারণ করবে। সরকারের নির্দেশনা পেলেই বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পদ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবে। দেশীয় সম্পদের জন্য দেশের আদালতে এবং বিদেশী সম্পদের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতে মামলা পরিচালনা করতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রস্তুতি চলছে।’

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ‘আমি জীবনের বেশির ভাগ সময় আইএমএফসহ বিদেশের বিভিন্ন সংস্থায় কাজ করেছি। বিদেশে উচ্চ বেতনে চাকরি করেছি। কিন্তু এ মুহূর্তে দেশের বাইরে আমার এক ডলারও নেই। আমি এ বিষয়ে সবাইকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি। আমার ছেলেমেয়েরা সাবালক। তারা কোথায় থাকবে, কী খাবে, কাকে বিয়ে করবে, সেটি তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।’

আরও