গাজার নামে তহবিল সংগ্রহ, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পৌঁছায় কি?

ইসরায়েলি আগ্রাসনে ‘গাজা’ এখন ধ্বংসস্তূপ। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ এ নগরী বহুদিন ধরে পরিচিত বিশ্বের বৃহত্তম কারাগার হিসেবে। গত দেড় বছরে ইসরায়েলি বাহিনীর বোমা, গুলি আর অবরোধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে আছে অসংখ্য শিশু।

ইসরায়েলি আগ্রাসনে ‘গাজা’ এখন ধ্বংসস্তূপ। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ এ নগরী বহুদিন ধরে পরিচিত বিশ্বের বৃহত্তম কারাগার হিসেবে। গত দেড় বছরে ইসরায়েলি বাহিনীর বোমা, গুলি আর অবরোধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে আছে অসংখ্য শিশু। অবরুদ্ধ এ নগরে এখন দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি চললেও ত্রাণ কিংবা অন্য কোনো মানবিক সহায়তা প্রবেশ করতে দিচ্ছে না ইসরায়েলি বাহিনী। গাজায় প্রবেশ নিষিদ্ধ জাতিসংঘের ত্রাণও। গত জুনে গাজায় ত্রাণসহায়তা নিয়ে গিয়েছিলেন বিখ্যাত জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থুনবার্গ। কিন্তু তার সে প্রচেষ্টাও সফল হয়নি।

এমন পরিস্থিতিতে গাজাবাসীর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বানে নগদ অর্থ ও ত্রাণ সংগ্রহ চলছে বাংলাদেশে। কয়েক বছর ধরে চলে আসা এ তৎপরতা সম্প্রতিক সময়ে জোরালো হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গাজাবাসীকে সহায়তা করার জন্য নগদ অর্থ তুলছে। কেউ কেউ নগদ অর্থের পরিবর্তে খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী সংগ্রহ করছে। ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষ বিনা প্রশ্নেই নিজেদের অর্থ অনেক ব্যক্তি ও সংস্থার হাতে তুলে দিচ্ছেন। তবে বাংলাদেশ থেকে সহায়তার নামে উত্তোলিত এ ‘সাহায্য’ গাজায় আদৌ পৌঁছাচ্ছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সংগৃহীত নগদ অর্থ বা ত্রাণসহায়তা গাজায় পৌঁছাতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ ধরনের অনুমোদন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অনুমোদন না নেয়ায় এসব অর্থ অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে কিনা সেটি নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

গাজাবাসীর পাশে দাঁড়াতে নগদ অর্থ ও ত্রাণ সংগ্রহ করছে বাংলাদেশে অবস্থিত ফিলিস্তিন দূতাবাসও। বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) মাধ্যমে দূতাবাসটি নগদ সহায়তা গ্রহণ করছে। দূতাবাসের মাধ্যমে সংগৃহীত এসব ত্রাণসহায়তা গাজার মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে তা নিয়েও বিতর্ক আছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলছেন, ‘গাজা এখন পুরোপুরি বিধ্বস্ত ও অবরুদ্ধ নগরী। সেখানে জাতিসংঘের ত্রাণও পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ত্রাণ সেখানে কোনোভাবেই পৌঁছানো সম্ভব নয়।’

বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদানও প্রায় একই তথ্য জানিয়েছেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রথম দিন থেকেই আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, গাজার নামে তহবিল সংগ্রহ অগ্রহণযোগ্য। যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ত্রাণ সংগ্রহ করছেন, অবিলম্বে তা বন্ধ করুন। বর্তমান পরিস্থিতিতে গাজায় ১০ শতাংশ ত্রাণও প্রবেশ সম্ভব নয়।’

বাংলাদেশে যেসব প্রতিষ্ঠান গাজায় সহায়তার জন্য অর্থ সংগ্রহ করছে তার মধ্যে রয়েছে মাস্তুল ফাউন্ডেশন, বাসমাহ ফাউন্ডেশন, হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (এইচসিএসবি), আল-আযহার জাকাত অ্যান্ড চ্যারিটি হাউজ প্রভৃতি। আবার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়াসহ অনেকে ব্যক্তি পর্যায়ে গাজায় সহায়তার জন্য অর্থ সংগ্রহ করছেন। এর বাইরে স্থানীয় পর্যায়ে মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানেও গাজায় সহায়তার জন্য নগদ অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে সংগঠন ও ব্যক্তি পর্যায় থেকে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। গাজায় ত্রাণসহায়তা পাঠানোর জন্য দেয়া হচ্ছে বিজ্ঞাপন। কিছু কিছু সংগঠন তাদের ওয়েবসাইটেও সহায়তা গ্রহণের ব্যবস্থা রেখেছে। ২০২৪ সাল থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় খাদ্য, পানি, ওষুধ আর চিকিৎসাসহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে বলে নিজেদের ফেসবুক পেজে উল্লেখ করেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মাস্তুল ফাউন্ডেশন। গাজায় সহায়তার দাবি করেছে এইচসিএসবি নামের আরেকটি সংগঠনও। সংগঠটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘মিসরে শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের প্রায় ১ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে এ সংগঠন। সংগঠনের ছয় সদস্য মিসর সফর করে সহায়তা পৌঁছে দিয়েছেন।’

বেশ কিছুদিন ধরেই ‘গাজার পাশে দাঁড়ান’ শিরোনামে ফেসবুকে প্রচারণা চলাচ্ছেন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া। অর্থের বিনিময়ে বারবার বুস্ট করা ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আজ তারা খাবার পাচ্ছে না, ইনশা আল্লাহ খুব শীঘ্রই তাদের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ হবে। যার যা সামর্থ্য আছে আমাদের ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়ান। অর্থ কালেকশন চলছে...।’

গাজায় সহায়তা পাঠানো বিষয়ে জানতে চাইলে আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ কাজটি আমরা দীর্ঘদিন ধরে করে আসছি। গত শুক্রবারও আমরা ৯ লাখ টাকা পাঠিয়েছি।’ অবরুদ্ধ গাজায় কীভাবে সহায়তা পাঠাচ্ছেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘গাজায় যাওয়ার অনুমতি আমাদের নেই। আমাদের একজন প্রতিনিধি মিসরে গিয়ে সেখানকার কিছু ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি করেছেন। মিসরীয় ছাড়াও কিছু আরব ব্যবসায়ী, যাদের গাজায় যাওয়ার অনুমতি রয়েছে, তাদের মাধ্যমে আমরা সহায়তা পাঠাই। ওই ব্যবসায়ীরা ছাড়া গাজায় সহায়তা পাঠানোর আর কোনো পথ নেই।’

কী ধরনের সহায়তা পাঠান জানতে চাইলে এ অধ্যাপক বলেন, ‘আমরা সরাসরি কোনো অর্থসহায়তা করি না। ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে আমরা যতটা পারি গাজাবাসীকে খাদ্যসহায়তা দেয়ার চেষ্টা করি।’ বাংলাদেশের অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান গাজায় সহায়তার নামে প্রতারণা করছে এমন অভিযোগ সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কিছু জানি না।’

বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের যেকোনো দেশে অর্থ পাঠাতে হলে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে কোনো অর্থ পাঠানো হলে সেটি অবশ্যই পাচার হিসেবে গণ্য হবে। ফিলিস্তিনে সাহায্য পাঠানোর জন্য এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন নেয়নি। অবরুদ্ধ গাজায় কীভাবে ত্রাণ পাঠানো হচ্ছে, সেটিও আমার বোধগম্য নয়।’ ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে গাজার জন্য সহায়তা চাওয়াকে ‘ফাঁদ’ বলেই মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ মুখপাত্র।

দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনের গাজায় অবরোধ ও হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েলি বাহিনী। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের অভ্যন্তরে নজিরবিহীন এক হামলা করে হামাস। এরপর গাজার ওপর সর্বাত্মক বোমা হামলা শুরু করে ইসরায়েল। টানা প্রায় দুই বছর ধরে নেতানিয়াহু বাহিনী গাজায় নৃশংসতা চালাচ্ছে। এতে উপত্যকাটির অর্ধলাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) নামের বিতর্কিত একটি সংস্থার ত্রাণ কেন্দ্র থেকে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে হত্যার শিকার হয়েছে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি। গাজায় জিএইচএফের ত্রাণ কেন্দ্রগুলো পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। উপত্যকায় টানা ১১ সপ্তাহের অবরোধের পর গত ২৬ মে কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি। শুরু থেকেই সংস্থাটির কার্যক্রমের সমালোচনা করে আসছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। জিএইচএফের দেয়া খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত কার্যক্রমের বাইরে বর্তমানে গাজায় কোনো ত্রাণ প্রবেশের সুযোগ নেই। এমনকি জাতিসংঘের ত্রাণও উপত্যকাটিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ রয়েছে।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক শরণার্থী সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন, চার মাসের বেশি সময় ধরে তারা মিসর ও জর্ডানে প্রায় ছয় হাজার ট্রাক খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুদ করে রেখেছেন। কিন্তু ইসরায়েলের অনুমতি না পাওয়ায় সেগুলো এখনো গাজায় প্রবেশ করতে পারেনি।

ইসরায়েলের অবরোধের আগে সাহায্য সংস্থাগুলো গাজায় প্রতিদিন প্রায় ৬০০ ট্রাক ত্রাণ পাঠাতে পারত। ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান ফিলিপ লাজ্জারিনি গত মে মাসে বলেছিলেন, ‘এ ত্রাণ দিয়ে উপত্যকাটির বাসিন্দাদের কেবল ন্যূনতম চাহিদা পূরণ হতো।’

গাজার নামে বাংলাদেশে যেসব ত্রাণ তৎপরতা চলছে, সেগুলো বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক এ রাষ্ট্রদূত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক বছরের বেশি সময় ধরে গাজা কার্যত অবরুদ্ধ। উপত্যাকাটিতে এ মুহূর্তে জাতিসংঘের ত্রাণ প্রবেশও পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্য কোনো দেশ, সংস্থা কিংবা ব্যক্তির ত্রাণ পাঠানোর গল্প বিশ্বাসযোগ্য নয়। বাংলাদেশে যারা গাজার নামে ত্রাণ বা অর্থ সংগ্রহ করছে, তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।’

এম হুমায়ুন কবির আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে ফিলিস্তিনের যে দূতাবাস রয়েছে, সেটিও গাজার প্রতিনিধিত্ব করে না। কারণ ২০০৬ সাল থেকে গাজার ওপর ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের কোনো কর্তৃত্ব নেই। গাজার ওপর যে সরকারের কর্তৃত্বই নেই, সে সরকারের নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে পাঠানো ত্রাণ কীভাবে গাজায় পৌঁছাবে, সেটিও বোধগম্য নয়। ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি গোটা মুসলিম বিশ্বই সহানুভূতিশীল। কিন্তু এ সহানুভূতিকে পুঁজি করে কেউ যাতে প্রতারণা করতে না পারে, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।’

বহু বছর ধরে গাজায় ত্রাণ তৎপরতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে ছিল তুরস্ক ও কাতার। ইসরায়েলি অবরোধের কারণে এ দুটি দেশের ত্রাণ কার্যক্রমও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সংবাদ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অবরুদ্ধ থাকায় অনেক দিন ধরেই ইসরায়েলের অনুমতি ব্যতীত গাজা থেকে কারো বের হওয়া অথবা সেখানে প্রবেশের সুযোগ নেই। গাজায় ত্রাণ পৌঁছানোর প্রধান মাধ্যম মিসর সীমান্তের রাফা ক্রসিং। এটিও দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ত্রাণসহায়তা প্রবেশের ক্ষেত্রে ইসরায়েল যতটুকু অনুমতি দেয়, ঠিক ততটুকুই প্রবেশ করতে পারে। ইসরায়েলের অনুমতি ছাড়া কারো পক্ষেই গাজায় ত্রাণসহায়তা দেয়ার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যক্তি পর্যায়ে তহবিল সংগ্রহ বন্ধ করা উচিত। সংগ্রহ করলে সেটা ঢাকার ফিলিস্তিন দূতাবাস অথবা আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। যদিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরনের সহায়তা দিয়ে থাকে কিনা আমার জানা নেই। যেহেতু ব্যক্তি পর্যায়ের উদ্যোগে অর্থসহায়তা গাজায় যাওয়ার কোনো প্রচলিত পথ নেই, তাই এসব সংগৃহীত অর্থ অন্যভাবে বা অন্য পন্থায় ব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। কাজেই সর্বাত্মকভাবে এ পদ্ধতি বন্ধ করে যে পন্থায় পাঠানো যেতে পারে তা অবলম্বন করা উচিত।’

২০২১ সালেও কভিড সৃষ্ট বৈশ্বিক দুর্যোগের মধ্যে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী নৃশংসতা চালিয়েছিল। সে সময় ঢাকার বারিধারায় ফিলিস্তিনি দূতাবাসে ত্রাণ দিতে বাংলাদেশীদের দীর্ঘ সারি দেখা গিয়েছিল। নানা শ্রেণী-পেশার শত শত মানুষ দূতাবাসটিতে নগদ অর্থ ও ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছিলেন। ওই সময় থেকেই গাজার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে একাধিক ব্যাংক হিসাব এবং বিকাশ, নগদ, রকেট ও উপায়ের নম্বর প্রকাশ করে ফিলিস্তিন দূতাবাস। বিকাশসহ এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর ডোনেশন লিস্টে এখনো ফিলিস্তিন দূতাবাসের নাম রয়েছে। যদিও গাজার নামে সংগৃহীত এসব তহবিলের কতটা উপত্যকায় পৌঁছাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ তৈরি হয়েছে।

গাজা উপত্যকার মানবিক সংকটকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তহবিল সংগ্রহের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ঢাকার ফিলিস্তিন দূতাবাস। দেশটির রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গাজা উপত্যকার নামে অনেক ব্যক্তি, সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান অর্থ সংগ্রহ এবং সেগুলো গাজায় পৌঁছে দিচ্ছে বলে দাবি করছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য হলো বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। আমাদের প্রাপ্ত তথ্যমতে, খুব ভালো ব্যবস্থাপনা হলেও মোট সংগ্রহকৃত অর্থের ১০ শতাংশের বেশি গাজায় পৌঁছায় না। অধিকাংশ সহায়তাই ইসরায়েলের নিষেধাজ্ঞার কারণে আটকে থাকে।’

ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান আরো বলেন, ‘কিছু সংগঠন স্বল্প পরিসরে সহায়তা বিতরণের ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে তারা সহানুভূতির জায়গা থেকে অনলাইনে আরো অর্থ সংগ্রহ করে। ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রথম দিন থেকেই আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, গাজার নামে তহবিল সংগ্রহ অগ্রহণযোগ্য।’

তবে গাজায় সহায়তা পাঠানোর ক্ষেত্রে দূতাবাস তার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেন এ রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব গাজার জনগণের পাশে দাঁড়ানো। আমরা সেটাই করছি, বিভিন্ন পরিবারের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছি, তবে সেগুলোর ভিডিও প্রচার না করে। কারণ নাগরিকদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা আমাদের কাছে অগ্রাধিকারের বিষয়।’

ফিলিস্তিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সবাইকে অনুরোধ জানিয়ে ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান বলেন, ‘বাংলাদেশের যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান গাজার নামে তহবিল সংগ্রহ করছে, তাদের প্রতি আমার আহ্বান হলো এ কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করুন। এ অসাধারণ দেশের মানুষ গাজার জন্য আনুষ্ঠানিক সহায়তা তহবিলে বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করেছেন। কেউ যদি গাজার নির্দিষ্ট কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার বা ব্যক্তিকে সহায়তা পাঠাতে চান, তাহলে তারা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আমরা সেই সহায়তা এ তহবিল থেকে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করব। গাজার সংকটে বাংলাদেশের জনগণের ভূমিকা ও উদারতা ফিলিস্তিনিদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

আরও