২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী যশোর জিলা স্কুল

১২০০ শিক্ষার্থীর আইসিটি শিক্ষায় মাত্র ১০ কম্পিউটার, শ্রেণীকক্ষ সংকটে বসতে হয় গাদাগাদি করে

বড় সংকটের জায়গা হলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়। বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রায় ১২০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু কোনো শাখাতেই আইসিটি শিক্ষকের পদ নেই।

প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যশোর জিলা স্কুল। প্রতিষ্ঠানটি এ অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত। এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে হাজার হাজার শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়; বিজ্ঞান গবেষণা, স্কাউটিং, খেলাধুলা, বিতর্কসহ নানা কর্মকাণ্ডে এ বিদ্যালয়ের সুনাম রয়েছে। কিন্তু নানা সমস্যা ও সংকটে ভুগছে ঐতিহ্যবাহী এ স্কুল। ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষার জন্য কম্পিউটার রয়েছে মাত্র ১০টি। এমনকি স্কুলে আইসিটি শিক্ষকের কোনো পদই নেই। শ্রেণীকক্ষে রয়েছে আসন সংকট। ফলে শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে বসে পাঠ নিতে হয়। এছাড়া সংকট রয়েছে আধুনিক ল্যাব, ডিজিটাল বোর্ড ও শ্রেণীকক্ষে সাউন্ড সিস্টেমের। রয়েছে কর্মচারী সংকটও। ফলে বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত যশোর জিলা স্কুলে চলতি শিক্ষাবর্ষে (২০২৬) ১ হাজার ৯০২ জন ছাত্র পড়াশোনা করছে। প্রভাতি ও দিবা—দুই শিফটে ৫০ জন শিক্ষক পাঠদান করছেন। তবে শিক্ষক সংকট না থাকলেও কর্মচারী সংকট রয়েছে। ১২ জন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। ফলে এত বড় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে শিক্ষকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমানে চারটি ভবনের ২৪টি শ্রেণীকক্ষে ক্লাস চলছে। এর মধ্যে একটি নতুন ১০তলা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। শিক্ষকদের প্রত্যাশা, ভবন নির্মাণ শেষ হলে পর্যাপ্ত ক্লাসরুম ও ল্যাবের অভাব দূর হবে।

বড় সংকটের জায়গা হলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়। বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রায় ১২০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু কোনো শাখাতেই আইসিটি শিক্ষকের পদ নেই। ফলে বাধ্য হয়ে প্রভাতি শাখায় সিনিয়র শিক্ষক (গণিত) রফিকুল ইসলাম ও দিবা শাখায় সিনিয়র শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা) কামরুজ্জামান আইসিটি ক্লাস নিচ্ছেন। তারা এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিলেও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নন। নিজ নিজ বিষয়ের পাশাপাশি তাদের বাড়তি এ ক্লাস নিতে হচ্ছে।

এছাড়া কম্পিউটার ল্যাবটির অবস্থাও ভয়াবহ। প্রায় এক যুগ আগে তৈরি করা ল্যাবে পাঁচটি কম্পিউটার সচল রয়েছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাঁচটি ল্যাপটপ। এ ১০টি কম্পিউটার দিয়েই চলছে ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর আইসিটি ক্লাস। ফলে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কম্পিউটার শিক্ষা গ্রহণ নামমাত্রই হচ্ছে। আবার গ্রন্থাগারিক পদ না থাকায় সারা বছর স্কুলের লাইব্রেরিও তালাবদ্ধ থাকে।

নবম শ্রেণীর ছাত্র আইয়ান মাশারাত চৌধুরী ও ফারহান সাজিদ জানায়, কম্পিউটার ল্যাবে মাত্র ১০টি ল্যাপটপ ও কম্পিউটার রয়েছে। অথচ তারা একসঙ্গে কমপক্ষে ৬০ জন ছাত্র আইসিটি ক্লাস করতে যায়। ফলে হাতে-কলমে শেখা সম্ভব হয় না।

দিবা শাখার আইসিটি ক্লাসের শিক্ষক কামরুজ্জামান জানান, তিনি আইসিটির শিক্ষক নন, তবে প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্লাস নিচ্ছেন। ৬০ জন ছাত্রের একটি ক্লাসের জন্য অন্তত ৩০টি কম্পিউটার দরকার। কিন্তু আছে এর তিন ভাগের এক ভাগ। সেগুলোও অনেক পুরনো। শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে শেখাতে একটি অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাব প্রয়োজন।

অন্যদিকে শ্রেণীকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী থাকায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ৩২টি শাখার অধিকাংশ ক্লাসে ৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। কোনো কোনো ক্লাসে ছাত্রসংখ্যা ৭০-এর অধিক। যেমন প্রভাতি শাখার ষষ্ঠ (খ) শাখায় এ বছর ছাত্র রয়েছে ৭০ জন। শ্রেণীকক্ষ ছোট হওয়ায় ২০-২২টি বেঞ্চে গাদাগাদি করে বসতে হয় ছাত্রদের।

শিক্ষার্থীরা জানায়, স্যাররা সামনে থেকে যা পড়ান, তা পেছনে বসে ঠিকমতো শোনা যায় না। আবার হোয়াইট বোর্ডের লেখাও শেষ বেঞ্চ থেকে বোঝা কঠিন। ক্লাসে ডিজিটাল বোর্ড ও সাউন্ড বক্সের দাবি জানিয়েছে তারা। প্রভাতি শাখার শ্রেণী শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সরকারি অনুপাত ১:৫৫ হলেও ক্লাসরুম ছোট থাকায় শিক্ষার্থীদের বসিয়ে পাঠদান করতে শিক্ষকদের বেগ পেতে হয়।’ ভৌত বিজ্ঞানের শিক্ষক উত্তম কুমার মণ্ডল বলেন, ‘শ্রেণীকক্ষে স্মার্ট বোর্ড, সাউন্ড সিস্টেম এবং কম্পিউটার ও সায়েন্স ল্যাব আধুনিকায়ন করা দরকার।’

নানা সংকট সত্ত্বেও জিলা স্কুল পাবলিক পরীক্ষায় ঈর্ষণীয় ফলাফল ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ২৬৩ জন অংশ নিয়ে ২৬১ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে ১৮২ জন জিপিএ ৫ এবং ৩৪ জন বৃত্তি পেয়েছে। জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় (অষ্টম শ্রেণী) ৯৬ জন অবতীর্ণ হয়ে ৮৪ জন বৃত্তি পেয়ে বোর্ডে সেরা স্থান অর্জন করেছে। আর প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ১১০ জনের মধ্যে ৫৬ জন বৃত্তি পেয়ে জেলায় শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শিক্ষা কার্যক্রমকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তবে জিলা স্কুলসহ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে আইসিটি শিক্ষক বা গ্রন্থাগারিক পদ নেই। এ পদ সৃষ্টি করা জরুরি। এছাড়া আধুনিক ল্যাব, স্মার্ট বোর্ড ও সাউন্ড সিস্টেম পেলে পাঠদান আরো উন্নত হবে।’

যশোর জেলা শিক্ষা অফিসার মো. মাহফুজুল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৫৫ থাকার কথা। জিলা স্কুলের কোনো কোনো ক্লাসে ছাত্র দু-একজন বেশি থাকতে পারে, তবে পাঠদান স্বাভাবিকভাবে চলছে। আর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আইসিটি শিক্ষক বা গ্রন্থাগারিক পদ নেই। এ পদ সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন। এর বাইরে যেসব প্রয়োজন বা ঘাটতি রয়েছে, এ বিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের ‍সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

আরও