একসময় দৈনিক ৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয়েছিল। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে স্থানীয় উৎস থেকে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছিল। বর্তমানে স্থানীয় উৎস থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এর সঙ্গে দুটি এফএসআরইউর মাধ্যমে আমদানি করা এলএনজি থেকে দৈনিক আরো প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট যোগ হচ্ছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে আরো গ্যাসের মজুদ রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে আমরা এখনো নিশ্চিত নই। ২০০৯ সালে আমি যখন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ছিলাম, তখন সরকারকে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, এক বছরের মধ্যে অন্তত ২০ হাজার লাইন-কিলোমিটার সিসমিক জরিপ সম্পন্ন করা উচিত। পুরো স্থলভাগে সিসমিক জরিপ শেষ করা গেলে দেশে গ্যাস আছে কিনা, সে বিষয়ে অন্তত একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেত।
কয়েক দিন আগে আমরা একটি সংবাদে দেখেছি, মিয়ানমার তার দক্ষিণ উপকূলের কাছে ১০০ টিসিএফ গ্যাসের মজুদ পেয়েছে। এর প্রায় ১০ বছর আগে তারা ৩৪ টিসিএফ গ্যাসের মজুদ পেয়েছিল, যা আমাদের টেকনাফের কাছাকাছি এলাকায়। একই সময়ে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশেও ২৯ টিসিএফ গ্যাসের মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে। অথচ গত ১৭ বছরে আমরা বঙ্গোপসাগরে কার্যকর কোনো অনুসন্ধান চালাতে পারিনি।
আমরা যদি স্থলভাগে অনুসন্ধান শেষ করতে পারি এবং বর্তমানে চলমান অফশোর বিডিং রাউন্ড সফল হয়, দরপত্র পাওয়া যায় ও কার্যাদেশ দেয়া সম্ভব হয়, তাহলেও সমুদ্রে গ্যাস আছে কিনা তা নিশ্চিতভাবে জানতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগবে।
গত কয়েক মাসে তরল জ্বালানি নিয়ে আমাদের বেশকিছু বিরূপ অভিজ্ঞতা হয়েছে। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে দেশে এলপিজির সংকট দেখা দিয়েছিল। সে সময় বিইআরসি নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা, কিন্তু বাজারে এলপিজি বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এলপিজির বাজার আরো অস্থির হয়ে ওঠে। জাহাজ পাওয়া যাচ্ছিল না। জাহাজ ভাড়া, বাণিজ্য ব্যয় ও বীমা খরচ—সবই বেড়ে যায়। ফলে ওই সময়ে আমরা জ্বালানি সংকটে পড়ি।
এলপিজি ও ফুয়েল অয়েলের বড় অংশ আমরা হরমুজ প্রণালি হয়ে অথবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানি করতাম। একক উৎসের ওপর এ নির্ভরতার কারণেই আমাদের সমস্যায় পড়তে হয়েছে। সে অভিজ্ঞতা থেকে এলপিজি আমদানির উৎস এখন অনেকটাই বৈচিত্র্যময় করা হয়েছে। আমরা অন্যান্য দেশ থেকেও এলপিজি আনছি। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও একইভাবে বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে।
আমাদের বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গ্রিডভিত্তিক স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট। এর সঙ্গে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরো প্রায় ছয় হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা যোগ করলে মোট উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ। সাধারণত চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ১০ থেকে ২০ শতাংশ, সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত থাকা যুক্তিসংগত। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে এ অতিরিক্ত সক্ষমতা প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে এবং বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। বিদ্যমান চুক্তিগুলো থেকে বেরিয়ে আসা বা সেগুলো সংশোধন করা না গেলে এ আর্থিক চাপ আরো বেশ কিছুদিন অব্যাহত থাকবে।