সিএনএনের প্রতিবেদন

পর্যটন মানচিত্রে ব্রাত্য বাংলাদেশ: অপূর্ব নিসর্গ হয়েও কেন পর্যটকহীন

এত এত ঐশ্বর্য থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব পর্যটনে বাংলাদেশ আজও একটি 'ব্ল্যাঙ্ক স্পেস' বা অচেনা রহস্য। পর্যটন বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে মাত্র ৬ লাখ ৫০ হাজার আন্তর্জাতিক পর্যটক এ দেশ ভ্রমণ করেছেন, যা প্রতিবেশী ভারত বা শ্রীলঙ্কার তুলনায় একদমই যৎসামান্য।

দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট একটি দেশ বাংলাদেশ। সুবিশাল ম্যানগ্রোভ বন, পাহাড় আর এর ঢাল বেয়ে সবুজের গালিচা, দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্র, দীর্ঘতম সৈকত- সব মিলিয়ে এক অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ দেশ। কিন্তু এত এত ঐশ্বর্য থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব পর্যটনে বাংলাদেশ আজও একটি 'ব্ল্যাঙ্ক স্পেস' বা অচেনা রহস্য। পর্যটন বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে মাত্র ৬ লাখ ৫০ হাজার আন্তর্জাতিক পর্যটক এ দেশ ভ্রমণ করেছেন, যা প্রতিবেশী ভারত বা শ্রীলঙ্কার তুলনায় একদমই যৎসামান্য।

কেন এ পিছিয়ে পড়া? আর কী-ই বা আছে এ মাটির গভীরে যা বিশ্বকে মুগ্ধ করতে পারে? সম্প্রতি বাংলাদেশের পর্যটনের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন।

নেতিবাচক ধারণা বনাম বাস্তবতা

বন্যা কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা তৈরি পোশাক কারখানার সাফল্যের জন্য বাংলাদেশের নাম বারবার পশ্চিমা বিশ্বের সামনে আসে। ‘নেটিভ আই ট্রাভেল’-এর পরিচালক জিম ও’ব্রায়েন বলেন, অবচেতনে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। আমরা সবসময় নেতিবাচক কারণে দেশটির খবর শুনি।

কিন্তু প্রচারের আড়ালে থাকা দেশটির আসল সৌন্দর্য কেবল তারাই জানেন যারা এখানে পা রেখেছেন। ব্রিটিশ পর্যটক আনন্দ প্যাটেল যখন প্রথম ঢাকায় আসেন, তখন তার চোখে ধরা দিয়েছিল এক বিশৃঙ্খল কিন্তু প্রাণবন্ত শহর। এরপর যখন তিনি নদীবিধৌত বরিশালের দিকে যান, তখন তার অভিজ্ঞতা একদমই পাল্টে যায়। তিনি দেখেন ছোট ছোট নৌকায় ফলমূল ও ফসলে ঠাসা এক অকৃত্রিম ভাসমান বাজার, যা থাইল্যান্ডের কৃত্রিম পর্যটন বাজারের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব ও হৃদয়গ্রাহী।

ভাসমান পেয়ারা বাজার

ঢাকার ‘বিশৃঙ্খলা’ থেকে সুন্দরবনের নিস্তব্ধতা

বাংলাদেশের পর্যটন মূলত বৈচিত্র্যের এক কোলাজ। পর্যটন অপারেটররা এখন বিদেশি পর্যটকদের গতানুগতিক পথের বাইরে নিয়ে যেতে চান:

  • ঢাকার জীবনধারা: ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ নিয়ে মেগাসিটি ঢাকা। পুরনো ঢাকার অলিগলি, ঐতিহাসিক স্থাপত্য, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে জাহাজ ভাঙার বিশাল কর্মযজ্ঞ আর মানুষের অবিরাম ছোটাছুটি পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আইরিশ পর্যটক গ্যারি জয়েসের ভাষায়, এটি এমন এক শহর যা কখনো ঘুমায় না। চারদিক থেকে দৃশ্য আর শব্দ আপনাকে আক্রমণ করবে— এ এক দারুণ অভিজ্ঞতা!
  • শ্রীমঙ্গলের সবুজ গালিচা: দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মাইলের পর মাইল চা বাগান যেন সবুজ ঢেউয়ের মতো বয়ে গেছে। এখানকার ‘ইকো-ট্যুরিজম’ প্রকল্পে পর্যটকরা সরাসরি আদিবাসীদের সঙ্গে থাকার ও পাহাড় ট্রেকিংয়ের সুযোগ পান।

সিলেটের চা-বাগান

  • বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকত ও সুন্দরবন: ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ কক্সবাজারের সাদা বালুর সৈকত আর ইউনেস্কো স্বীকৃত সুন্দরবনের গহিন অরণ্য। যেখানে নদীপথে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর সময় যেকোনো মুহূর্তে আপনার সামনে হাজির হতে পারে রাজকীয় রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

'ডার্ক ট্যুরিজম' ও ডিজিটাল প্রভাব

আজকাল অনেক ইউটিউবার বা ব্লগার ভিউ পাওয়ার লোভে বাংলাদেশের নেতিবাচক বিষয়গুলো বিশ্বের সামনে তুলে ধরছে। অনেকে বিপজ্জনক ‘ট্রেন সার্ফিং’ (ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ) কিংবা ঢাকার ডাস্টবিন এলাকা বা ‘গার্বেজ সিটি’ দেখিয়ে ভিউ পাওয়ার চেষ্টা করেন। স্থানীয় গাইডরা একে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। তারা চান বিশ্ববাসী বাংলাদেশের পজিটিভ মেন্টালিটি আর আতিথেয়তা দেখুক। পর্যটকদের ইকো ট্যুরিজম আর গ্রামীণ জীবনযাত্রা দেখিয়ে আকৃষ্ট করতে চান তারা।

ঢাকার গাইড কাউসার আহমেদ মিলনের মতে, আমরা গরিব দেশ হতে পারি, কিন্তু আমাদের মনটা অনেক বড়। পর্যটকরা এখানে এসে যে ভালোবাসা পায়, তা অন্য কোথাও পায় না।

বিপজ্জনক ‘ট্রেন সার্ফিং’

রাজনীতি ও নিরাপত্তার মেঘ

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের পথে অন্যতম বড় বাধা হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার ও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলোর খবর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় পর্যটকরা শঙ্কা অনুভব করেন। যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর জারি করা ‘ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি’ বা ভ্রমণ সতর্কতা অনেক সময় সাধারণ পর্যটকদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে অভিযাত্রী বা রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের ক্ষেত্রে এসব বাধা কাজ করে না। তারা এ অকৃত্রিম বাংলাদেশকে দেখার জন্য যেকোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।

‘মাস ট্যুরিজম’ বনাম অকৃত্রিমতা

বাংলাদেশ কি শ্রীলঙ্কা বা থাইল্যান্ডের মতো লাখ লাখ পর্যটক চায়? বেঙ্গল এক্সপেডিশন ট্যুরসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহাদ আহমেদের উত্তরটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি বলেন, সত্যি বলতে, আমরা গণ-পর্যটন বা মাস ট্যুরিজম চাই না। আমরা চাই প্রকৃত ভ্রমণপিপাসুদের, যারা আমাদের সংস্কৃতিকে সম্মান করবে। যদি শ্রীলঙ্কার মতো এখানেও ভিড় লেগে যায়, তবে বাংলাদেশ তার অকৃত্রিমতা হারিয়ে ফেলবে। খাঁটি বাংলাদেশটা তখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

দারিদ্র্য, দূষণ আর অস্থিরতার গল্পের আড়ালে এখানে পাহাড়, নদী আর অসীম সাহসী মানুষের হাসি লুকিয়ে আছে। আর আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সেসব দেখার আমন্ত্রণ জানান তিনি।

আরও