রাজধানীর প্রগতি সরণি ও আশপাশ এলাকায় উন্নয়নকাজের খোঁড়াখুঁড়িতে ব্যাহত হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল। কোথাও সড়কের বড় অংশ ঘিরে রাখা হয়েছে, কোথাও ফুটপাত ও সার্ভিস লেন খুঁড়ে তৈরি করা হয়েছে গভীর নালা। পথে রাখা নির্মাণসামগ্রী, ধুলাবালি ও দীর্ঘ যানজটে প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাচ্ছেন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, যাত্রী, চালক ও এলাকাবাসী। স্বাভাবিক সময়ে যে পথ পাড়ি দিতে ২৫-৩০ মিনিট লাগে, সেখানে বাসে এখন দেড়-দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে; কোনো কোনো দিন আরো বেশি।
সরজমিনে দেখা গেছে, বীর উত্তম রফিকুল ইসলাম এভিনিউয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে প্রগতি সরণির কুড়িল পর্যন্ত প্রায় আট কিলোমিটার সড়কজুড়ে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কোথাও পাতাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১-এর ইউটিলিটি স্থানান্তর, কোথাও ঢাকা ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপনের কাজ চলছে। হোসেন মার্কেট, উত্তর বাড্ডা, শাহজাদপুর, নতুনবাজার, বারিধারা জে-ব্লক ও যমুনা ফিউচার পার্কসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, ফুটপাত ও সার্ভিস লেনের একাধিক অংশ খুঁড়ে রাখা হয়েছে।
ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিমানবন্দর, কুড়িল, নতুনবাজার, বাড্ডা, রামপুরা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও পূর্বাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। সড়কের দুই পাশে তিনটি করে লেন থাকলেও নির্মাণকাজের কারণে কোথাও কোথাও এক পাশে মাত্র একটি লেন দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। ফলে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও রিকশাকে একই সংকীর্ণ জায়গা দিয়ে চলতে হচ্ছে। ব্যারিকেডের পাশে খননযন্ত্র দিয়ে কাজ চলার সময় যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে, বাড়ছে যাতায়াতের সময়।
সংশ্লিষ্ট এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, ফুটপাত ও সার্ভিস লেনের অবস্থাও নাজুক। ঢাকা ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপনের জন্য বারিধারা জে-ব্লক, ভাটারা থানার সামনের মাদানী এভিনিউ থেকে প্রগতি সরণিতে প্রবেশের বিভিন্ন মুখ এবং আমেরিকান দূতাবাসসংলগ্ন এলাকায় গভীর নালা খোঁড়া হয়েছে। কোথাও বাঁশ ও লোহার ঠেকনা, কোথাও টিনের বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে নির্মাণস্থল। নালার ভেতরে পাইপ ও কালো কেবল, চারপাশে সিমেন্টের বস্তা ও কংক্রিটের টুকরা পড়ে থাকতে দেখা যায়। কোথাও জমে আছে কালচে ময়লা পানি ও আবর্জনা।
সরজমিনে আরো দেখা যায়, নির্মাণসামগ্রী ও গর্তের কারণে ফুটপাতের অবশিষ্ট অংশ অনেক জায়গায় এতটাই সরু যে পাশাপাশি দুজনের হাঁটাও কঠিন। বাধ্য হয়ে পথচারীদের যানবাহনের কাছঘেঁষে চলতে হচ্ছে। কোনো কোনো গর্তের ওপর ইস্পাতের পাত বসানো হলেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। আবার সড়কের বিভাজক সরিয়ে স্টিলের অস্থায়ী বেষ্টনী বসানোয় কোথাও নির্ধারিত স্থান দিয়ে রাস্তা পার হওয়া যাচ্ছে না। বৃষ্টির পানি জমে থাকা কয়েকটি গর্তে মশার লার্ভাও দেখা গেছে।
বারিধারা কূটনৈতিক অঞ্চল ও যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের সড়কের কিছু অংশে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শেষ হলেও চলাচলে স্বস্তি ফেরেনি। কোথাও মাটি ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও ইটের সলিং দিয়ে সড়ক সাময়িকভাবে চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। তবে এসব অংশ এখনো এবড়োখেবড়ো। যানবাহন চলাচল কিছুটা সম্ভব হলেও ইটের সলিং ও খোলা মাটির ওপর দিয়ে গাড়ি চলায় ছড়িয়ে পড়ছে ধুলাবালি। এতে পথচারী ও এলাকাবাসীকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
দীর্ঘ যানজটের কারণে যাতায়াতে বাড়তি সময় ব্যয়, ফুটপাত বন্ধ থাকায় ঝুঁকি নিয়ে হাঁটা এবং ধুলাবালির মধ্যে চলাচল—সব মিলিয়ে প্রগতি সরণির এ দীর্ঘ অংশ এখন প্রতিদিনের ভোগান্তির পথে পরিণত হয়েছে। সড়ক বিভাজকের মাঝে নতুন রোপণ করা চারাগাছও ধুলায় ধূসর হয়ে আছে।
একই এলাকায় দ্বিতীয় দফায় খোঁড়াখুঁড়ি নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে এলাকাবাসীর। তাদের অভিযোগ, প্রায় এক বছর আগে যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের অংশে এমআরটি লাইন-১-এর ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ করা হয়েছিল। এখন আবার ঢাকা ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপনের জন্য সড়ক খোঁড়া হচ্ছে। ফলে একবার কাজ শেষ হওয়ার পরও একই স্থানে নতুন করে খোঁড়াখুঁড়ি, বেহাল সড়ক ও ধুলাবালির ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলছে না। তাদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকলে একই এলাকায় বারবার সড়ক খোঁড়ার প্রয়োজন কমানো যেত, পাশাপাশি নগরবাসীর দুর্ভোগও এড়ানো সম্ভব হতো।
মালিবাগ থেকে বাসে করে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অফিস করেন রফিকুল ইসলাম ধ্রুব। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিদিন অফিসে যেতে অন্তত ২ ঘণ্টা সময় ব্যয় হচ্ছে, ফিরতে আরো ২ ঘণ্টা। অর্থাৎ রাস্তাতেই চলে যাচ্ছে মূল্যবান ৪ ঘণ্টা। প্রায় প্রতিদিনই অফিসে পৌঁছতে দেরি হচ্ছে। সময় নিয়ে বের হলেও সময়মতো পৌঁছনো যায় না।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (লাইন-১) প্রকল্প পরিচালক মো. সারওয়ার উদ্দীন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমআরটি লাইন-১-এর ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। পাশাপাশি আগামী বছরের শুরু থেকে মূল নির্মাণকাজও শুরু হবে। প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে যানজট কমাতে কয়েকটি ব্যবস্থা বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ, স্টেশন এলাকার বাইরে নির্ধারিত স্থানে বাসস্টপ স্থানান্তর, ৩০০ ফুট সড়ক থেকে বসুন্ধরা হয়ে আফতাবনগর পর্যন্ত বিকল্প সড়কের ব্যবস্থা এবং অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচলের জন্য বিকল্প নেটওয়ার্ক তৈরি করা। এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা গেলে মূল সড়কে যানবাহনের চাপ কমানো সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্মাণকাজের সময় জনভোগান্তি কমানোর জন্য অন্যান্য দেশে যেভাবে বিভিন্ন ধরনের প্রটেক্টিভ মেজার্স (নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা) নেয়া হয়, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ঠিকাদাররাও সেটা করতে ব্যর্থ এবং এক্ষেত্রে আমাদের যারা প্রকল্প ব্যবস্থাপক এবং সংশ্লিষ্ট অথরিটি, তাদের উদাসীনতা আছে। এ বিষয়গুলো আমাদের দ্রুত অ্যাড্রেস করা দরকার; কেননা উন্নয়ন প্রকল্পের নামে একটা দীর্ঘ সময় ধরে নাগরিকদের এ ধরনের ভোগান্তি কখনই কাম্য নয়।’