অস্বাস্থ্যকর আবাসনে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিতে মাঠপর্যায়ের বেশিরভাগ পুলিশ সদস্য

চারদিকে ঝোপঝাড়। ভবনের পাশেই জমে আছে পানি। মানুষ হাঁটলেই ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে মশা। পুরনো ভবনের ভেতরে বোর্ড দিয়ে ভাগ করা ছোট ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে বাস করছেন শাহবাগ থানার পুলিশ সদস্যরা। মশার উপদ্রব এতটাই তীব্র যে দিন-রাত মশারির ভেতরে থাকতে হয় তাদের।

শুধু শাহবাগ থানা নয়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ আবাসনে বসবাস করছেন মাঠপর্যায়ের বেশিরভাগ পুলিশ সদস্য। চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে এমন আবাসন ব্যবস্থা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে এ রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, পুলিশে বর্তমানে সব মিলিয়ে কনস্টেবল পদে রয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজারের মতো। এর সঙ্গে নায়েক, এএসআই, এসআই মিলিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় দুই লাখ সদস্য। এ পুলিশ সদস্যরা মূলত সরাসরি মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে কেউ কেউ থানায় যুক্ত থাকেন, কেউ আবার থাকেন রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে। বর্তমানে বাহিনীর মোট সদস্যের মধ্যে ১০ শতাংশের মতো আবাসন সুবিধা পান। বাকিরা থাকেন নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায়।

গতকাল সরজমিনে দেখা যায়, শাহবাগ থানার মূল স্থাপনার মাঝ দিয়ে একটি সরু রাস্তা ধরে এগোলেই পুলিশের অস্থায়ী আবাসন ব্যবস্থা। পুরনো একতলা ভবনের মধ্যে বোর্ড দিয়ে করা ছোট ছোট খোপের মতো স্থানে মানবেতর জীবন যাপন করছেন পুলিশ সদস্যরা। সেখানে থাকা চৌকিগুলোতে মশারি টানানো। চৌকির সঙ্গে রশি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে পুলিশ সদস্যদের পোশাক। দীর্ঘ ডিউটির পর কোনো কোনো পুলিশ সদস্য এসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। এ ব্যারাকে শৌচাগার রয়েছে একটি। তবে সেখানে পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। গোসল করার জন্য ব্যারাকের সামনে ঝোপের মধ্যে একটি পাকা স্থান রয়েছে। সেখানেই গোসল করেন পুলিশ সদস্যরা। সেখানে থাকা কল থেকে পানি নিয়ে শৌচাগার ব্যবহার করতে হয়। অস্থায়ী এ ব্যারাকে রয়েছে নামাজ আদায়ের স্থান। সেখানেও থাকেন পুলিশ সদস্যরা। মশার যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে সেখানকার মেঝেতেও সারি সারি বিছানায় মশারি টানানো।

দীর্ঘ ডিউটি শেষে ব্যারাকে ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন পুলিশ কনস্টেবল ইয়াকুব। তিনি বলেন, ‘এখানে পানির সমস্যাটা প্রকট। এছাড়া মশা তো আছেই। এখানে এক মুহূর্তও মশারি ছাড়া থাকা যায় না। বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতে মশার উপদ্রব মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছায়।’

নামাজের স্থানের মেঝেতে থাকেন কনস্টেবল শাহরিয়ার। তিনিও ইয়াকুবের মতো পানি ও মশার সমস্যার কথা জানান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন পুলিশ সদস্য বলেন, ‘এখানে এত কম জায়গার মধ্যে থাকতে হয় যে পরিবারের সঙ্গে মোবাইলফোনে কথা বলাও যায় না। একজনের কথা আরেকজন শুনে ফেলেন। ন্যূনতম প্রাইভেসি রক্ষা করাও সম্ভব হয় না।’

শুধু শাহবাগ থানার এ ব্যারাকই নয়, সারা দেশেই মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের আবাসনের চিত্র প্রায় একই ধরনের। বিশেষ করে যেসব থানা ভাড়া বাসায় কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেখানে কর্মরত মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের আবাসন ব্যবস্থা আরো অস্বাস্থ্যকর। ডিএমপির ভিআইপি প্রটেকশন ব্যারাকেও পুলিশ সদস্যদের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে হয়। কাউকে থাকতে হয় সিঁড়ির নিচেও। আর ভবনে যাদের জায়গা হয় না, তাদের থাকতে হয় খোলা আকাশের নিচে তাঁবু করে। সামান্য বৃষ্টি হলেই তাঁবুতে পোকামাকড়ের উপদ্রব শুরু হয়। এতে অনেক পুলিশ সদস্য ডেঙ্গু ছাড়াও আক্রান্ত হন নানা ধরনের রোগব্যাধিতে।

রাজধানীতে পুলিশের আবাসনের মধ্যে রয়েছে মিরপুর স্টাফ কোয়ার্টার, তিনতলা অফিসার্স কোয়ার্টার্স, সৈনিক ব্যারাক, অফিসার্স মেস, ইস্কাটনে পুলিশ অফিসার্স মেস, ডেমরা পুলিশ অফিসার্স কোয়ার্টার্স ও নীলক্ষেতে ১৫ তলা একটি অফিসার্স কোয়ার্টার। নীলক্ষেতের ভবনটিতে ৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটে পরিদর্শক ও উপপরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা থাকেন। উত্তরা এলাকায় এসপিবিএনসহ আরো কয়েকটি ইউনিটের জন্য বেশ কয়েকটি কোয়ার্টার করা হয়েছে। এছাড়া পুরনো রমনা থানা ভবনের পাশে রয়েছে পাঁচতলা একটি অফিসার্স কোয়ার্টার। রাজারবাগে আছে সাতটি ব্যারাক। এসব ব্যারাকে পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাসহ কনস্টেবলরাও থাকেন।

রাজারবাগ হাসপাতালের পাশে আছে ‘মধুমিতা’ নামে ১৬ তলা একটি অফিসার্স কোয়ার্টার। সেটা বাড়িয়ে এখন ২০ তলা করা হচ্ছে। ভবনটির সব ফ্ল্যাট ১ হাজার ১০০ বর্গফুটের। তার পাশেই ‘তিতাস’ নামে পাঁচতলা একটি অফিসার্স কোয়ার্টার রয়েছে। সেটাও অফিসারদের জন্য বরাদ্দ। এছাড়া রাজারবাগে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নামে আরো তিনটি বহুতল অফিসার্স কোয়ার্টার রয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণভাবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য জনপ্রতি ১০০-৪০০ বর্গফুট জায়গা প্রয়োজন। ক্ষেত্র বিশেষে তা কিছু কমবেশি হতে পারে। তবে তা কোনো অবস্থায়ই ৭০ বর্গফুটের কম নয়। কেননা অনেক বেশি মানুষ কম জায়গায় গাদাগাদি করে থাকলে নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে কোনো স্থানে জনঘনত্ব বেশি হয়ে পড়লে তা ছোঁয়াচে ও দ্রুত সংক্রমণশীল রোগের বিস্তার ঘটানোর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। পাশাপাশি দীর্ঘ ডিউটির পর গাদাগাদি করে থাকার ফলে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মানসিক অবসাদ দেখা দেয়ারও ঝুঁকি থাকে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকলে পুলিশের মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণ হতে পারে। গাদাগাদি করে থাকার কারণে স্ক্যাবিস ও ইউরিনারি ইনফেকশনের মতো রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি থাকে। কোনো স্থানে ধারণক্ষমতার বেশি মানুষ থাকলে ঘরের ভেতরকার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। অক্সিজেনের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকে না, যার প্রভাব শরীরের ওপর পড়ে। প্রভাব পড়তে পারে মানসিক স্বাস্থ্যেও। কোনো একজন কর্মী যখন থাকার জায়গা থেকেই বিরক্তি নিয়ে আসবে, সেটার প্রভাব তার কাজেও পড়বে। শুধু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার কারণে তার কাজও বিঘ্নিত হবে।’

পুলিশের কাছ থেকে ভালো সেবা পেতে সবার আগে তাদের স্বাস্থ্যকর আবাসনসহ মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর ভালো বিশ্রাম না পেলে তার প্রভাব পুলিশের কাজের ওপর পড়ে। এজন্যই সবার আগে পুলিশের জন্য স্বাস্থ্যকর আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা না করলে বাহিনীতে একধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়।’

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুলিশের আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের। এ সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে বেশকিছু পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। সরকারও পুলিশের আবাসন সংকট নিরসনে আন্তরিক।’

আরও