ঢাকা থেকে ভারতের কলকাতা ও নিউ জলপাইগুড়ি রুটে নিয়মিত চলাচল করে আন্তঃদেশীয় মৈত্রী ট্রেন। ডলারের দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে এ রুটে আবারো ভাড়া বাড়িয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ নিয়ে কভিডের পরের দুই বছরে ট্রেনের ভাড়া পঞ্চমবারের মতো বাড়ানো হলো। গত ১৫ জুন থেকে যাত্রীদের বর্ধিত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এ অবস্থায় আন্তঃদেশীয় মৈত্রী ট্রেনে যাত্রী কমতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভ্রমণকারীরা।
যাত্রীরা জানান, ঢাকা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার বেশির ভাগ মানুষ আন্তঃদেশীয় মৈত্রী ট্রেনে যাতায়াত করেন। মৈত্রী ট্রেন সপ্তাহে শুক্র, শনি, রবি, মঙ্গল ও বুধবার সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশন থেকে কলকাতার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে যাত্রীরা বলছেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে দফায় দফায় ভারতগামী ট্রেনের ভাড়া বাড়াচ্ছে। ভাড়া বাড়াতে বাড়াতে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে ট্রেনের ভাড়া বাসের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এটি বিমানের ভাড়ার কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছে। এ অবস্থায় আন্তঃদেশীয় ট্রেনগুলোয় যাত্রী কমতে পারে।
যাত্রীদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক রুটে আবারো ট্রেনের ভাড়া বাড়ানোর মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে বাস-মালিকদের সুবিধা করে দিচ্ছে রেলওয়ে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে ট্রেন ভ্রমণে অনীহা তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আন্তঃদেশীয় মৈত্রী, মিতালী ও বন্ধন—এ তিনটি ট্রেন বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলাচল করে। এর মধ্যে শুধু মিতালী এক্সপ্রেস ট্রেনের এসি সিটের ভাড়া ছাড়া বাকি প্রতিটি ট্রেনের মোট ভাড়ার ওপরে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ১ হাজার টাকা ট্রাভেল ট্যাক্স অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল আন্তঃদেশীয় মৈত্রী ট্রেন বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে চলাচল শুরু করে। কভিডের সময় ট্রেন চলাচল দুই বছর বন্ধ ছিল। ২০২২ সালের ২৯ মে আবারো ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা রুটে মৈত্রী এক্সপ্রেস চলাচল শুরু করে। ২০২২ সালের ২৩ মে মৈত্রী ট্রেনের ভাড়া বাড়ায় রেলওয়ে। সেটি ২৪ মে থেকে কার্যকর হয়। ওই সময় দেখা যায়, মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের এসি সিট (কেবিন) ভাড়া ৩ হাজার ৬০৫ টাকা এবং এসি চেয়ারের ভাড়া ২ হাজার ৫৭০ নির্ধারণ করা হয়। ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর ডলারের দাম বাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করে দ্বিতীয় দফায় ভাড়া বাড়ানো হয়। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। ওই সময় দেখা যায়, এসি কেবিনের ভাড়া ৪ হাজার ১৯৫ টাকা এবং এসি চেয়ারের ভাড়া ২ হাজার ৯৬৫ নির্ধারণ করা হয়। ২০২৩ সালের ৬ জুন আবারো ডলারের দাম বাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করে আন্তঃদেশীয় তিনটি ট্রেনের ভাড়া তৃতীয় দফায় বাড়ানো হয়। ওই বছরের ১ জুলাই থেকে তা কার্যকর করা হয়। ওই সময় মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের এসি কেবিনের ভাড়া ৪ হাজার ৭৯৫ টাকা এবং এসি চেয়ারের ভাড়া ৩ হাজার ৫৩০ নির্ধারণ করা হয়। চতুর্থ দফায় অর্থাৎ ওই বছরের ৫ অক্টোবর ডলারের দাম বাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করে ট্রেনের ভাড়া বাড়ানো হয়। ১০ নভেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। ওই সময় ভাড়া বাড়িয়ে এসি কেবিন ৪ হাজার ৯০০ টাকা এবং এসি চেয়ার ৩ হাজার ৬০০ নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৫ জুন থেকে কার্যকর হয়েছে নতুন ভাড়া। এটিও ডলারের মূল্য বাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের এসি কেবিনের ভাড়া ৫ হাজার ১০৫ টাকা এবং এসি চেয়ারের ভাড়া ৩ হাজার ৭৩৭ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ শহরের আন্তঃদেশীয় মৈত্রী ট্রেনে চলাচলকারী যাত্রী বিমল কুমার দাস বলেন, ‘আমরা বয়স্ক মানুষ, একটু আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য ট্র্রেনকে বেছে নিয়েছি। কিন্তু ভারতে যাওয়ার ট্রেনের ভাড়া বেশ কয়েকবার বাড়ানো হয়েছে। সবসময় ডলারের দাম বাড়ার কথা বলা হয়। ভাড়া বাড়াতে বাড়াতে এমন পর্যায়ে গেছে, ট্রেনের ভাড়া এখন বাস ভাড়ার দ্বিগুণ হয়েছে। এটি এখন বিমান ভাড়ার কাছাকাছি পৌঁছেছে। যাদের টাকা-পয়সা কম তারা বাসে এবং যাদের টাকা বেশি তারা বিমানে যেতে আগ্রহী হবেন। এ কারণে রেলওয়ে যাত্রী হারাতে পারে।’
শহরের বাসিন্দা অসীম কুমার মণ্ডল বলেন, ‘আরামদায়ক এবং নির্বিঘ্ন ভ্রমণে আমরা ট্রেন বেছে নিয়েছি। কোনো কারণ ছাড়াই দফায় দফায় ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। এখন কলকাতায় ট্রেনে যাওয়া-আসা করতে ১০ হাজার টাকার বেশি লাগবে। বাসে যেতে-আসতে লাগে ৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে বিমানে আপ-ডাউনে লাগে ১৫-১৮ হাজার টাকা। সিঙ্গেল ট্রিপে ৭ হাজার ৫০০-৯০০০ টাকা লাগে। এ কারণে মানুষ ট্রেন ভ্রমণে নিরুৎসাহিত হবে। ডলারের দাম বাড়ার সঙ্গে ট্রেনের ভাড়া সমন্বয় করা চলে না। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও ট্রেনের ভাড়া কিন্তু বাড়ে না। ভারত এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। দেশটিতে ডলার বা তেলের দাম বাড়লেও ট্রেনের ভাড়া কখনো বাড়ানো হয় না। অথচ আমাদের দেশে ডলারের দাম বাড়ানোর কথা বলে কয়েকবার ভাড়া বাড়ানো হলো।’
তবে ভাড়া বাড়িয়ে বাস মালিকদের সুবিধা করে দিচ্ছে রেলওয়ে—বিষয়টি অস্বীকার করে রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও) শাহ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্তঃদেশীয় ট্রেনের ভাড়া কখনো বাড়ানো হয়নি। ডলারের দাম বাড়ার কারণে বাংলাদেশ ও ভারত একসঙ্গে বসে ভাড়া সমন্বয় করেছে। এর আগেও ভাড়া সমন্বয় করা হয়েছে।’