৯৬ থেকে ১২২% পর্যন্ত শুল্কের চাপ

প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ফলের দাম সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে

কমিশনের উপস্থাপনা অনুযায়ী, বিদ্যমান কাঠামোয় ফল আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি, ২০-৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর, ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও পণ্যের ধরন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর রয়েছে। সব মিলিয়ে মোট কর-শুল্ক গুনতে হয় ৯৬ দশমিক ১০ থেকে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত।

দেশে আপেল, মাল্টা, কমলা, আঙুর ও খেজুরের বাজার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। এসব ফলের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ৯৫-৯৯ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। অন্যদিকে আমদানি পর্যায়ে মোট কর-শুল্কহার ৯৬ দশমিক ১০ থেকে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত। উচ্চ কর-শুল্ক, শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের সীমাবদ্ধতাকে ফলের উচ্চমূল্য ও বাজার অস্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন।

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি কেজি আপেলের দাম ২৮০-৩৮০ টাকা। অথচ ভারতে এর দাম ১৫০-২২০ টাকা, পাকিস্তানে ১১০-১৭০ ও নেপালে ১৬০-২৪০ টাকা। একইভাবে দেশে মাল্টার দাম কেজিপ্রতি ২৪০-৩২০ টাকা, কমলা ২৫০-৩৫০ ও আঙুর ৩০০-৪৫০ টাকা। যদিও কমিশনের দেয়া দামের চেয়ে আরো বেশি দিয়ে বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে এসব ফল। প্রতিবেশী দেশগুলোয় অবশ্য এর অর্ধেক দামে ফলগুলো পাওয়া যায়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে গতকাল দেশীয় বাজারে ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত ও মূল্য স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থাপনাটি তুলে ধরে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন।

কমিশনের উপস্থাপনায় বলা হয়, বাংলাদেশে বছরে আমদানীকৃত তাজা ফলের চাহিদা প্রায় পাঁচ-ছয় লাখ টন। দেশীয় ফলের বাজারে আপেল ও মাল্টার চাহিদাই প্রায় ৭৭ শতাংশ। অন্যদিকে খেজুরের বার্ষিক চাহিদা প্রায় এক লাখ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টন, যার প্রায় ৬০ শতাংশই ব্যবহার হয় রমজানে। এসব ফল মূলত চীন, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ব্রাজিল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি হয়।

ট্যারিফ কমিশনের উপস্থাপিত তুলনামূলক তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে কেজিপ্রতি কমলার দাম ২৫০-৩৫০ টাকা। ভারতে এর দাম ৯০-১৫০, পাকিস্তানে ৭০-১২০ ও নেপালে ১২০-১৭০ টাকা। আঙুরের দাম বাংলাদেশে ৩০০-৪৫০ টাকা হলেও ভারতে ১৩০-২০০ ও পাকিস্তানে ১০০-১৬০ টাকা। সাধারণ খেজুরের দাম বাংলাদেশে কেজিপ্রতি ২৫০-৪৫০ টাকা। ভারতে তা ১৬০-২৬০ ও পাকিস্তানে ১২০-২০০ টাকায় পাওয়া যায়। তবে তুলনামূলক বাজারদরের এসব তথ্যের ক্ষেত্রে দেশভেদে ফলের জাত, মান, আমদানির উৎস ও বিক্রয় পর্যায়ের পার্থক্য বিবেচনার বিষয় রয়েছে।

দেশের বাজারে এসব ফলের উচ্চমূল্য ও বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার পেছনে তিনটি কারণ তুলে ধরে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। এগুলো হলো তাজা ফলকে জরুরি পুষ্টিপণ্য হিসেবে বিবেচনার পরিবর্তে বিলাসদ্রব্যের শ্রেণীতে রেখে উচ্চ করারোপ, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত বুকিং দরের তুলনায় কাস্টমসে বেশি শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ এবং সীমিত আমদানিকারক, পরিবহন ও বন্দর-সংক্রান্ত জটিলতা ও হিমাগার সংকটের কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা। ফলে আমদানিনির্ভর এসব ফল কয়েক হাত বদল হয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছতে ৩০০-৩৬০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়ে যায়।

কমিশনের উপস্থাপনা অনুযায়ী, বিদ্যমান কাঠামোয় ফল আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি, ২০-৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর, ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও পণ্যের ধরন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর রয়েছে। সব মিলিয়ে মোট কর-শুল্ক গুনতে হয় ৯৬ দশমিক ১০ থেকে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে উচ্চ শুল্কহার ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় আমদানীকৃত ফলের দাম খুচরা পর্যায়ে কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফলে ভোক্তাদেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে চাহিদা কমায় লোকসানের শঙ্কায় অনেক ব্যবসায়ী ফল আমদানি করছেন না। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামীতে সরবরাহ সংকট দেখা দেবে।

এসব কাটিয়ে উঠতে পারলে প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো দামেই ফল বিক্রি সম্ভব বলে মনে করেন বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফআইএ) নেতা শহিদুল ইসলাম জনি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে আপেল, মাল্টা, আঙুর, খেজুরসহ আমদানীকৃত ফলের ওপর শুল্ক-কর অনেক বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোট শুল্ক-কর প্রায় ১২২ শতাংশ পর্যন্ত হয়। পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায়ও শুল্ক অনেক বেশি। উচ্চ শুল্কের কারণে আমদানীকৃত ফলের দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। তবে বর্তমানে মাল্টার বাজারদর বাড়ার কারণ শুধু শুল্ক নয়। চাহিদার তুলনায় আমদানি কমে যাওয়ায় সরবরাহের ঘাটতি দেখা দেয়।’

আমদানীকৃত ফলকে বিলাসবহুল আইটেম হিসেবে বিবেচনা করে উচ্চ শুল্কারোপের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা দরকার বলে মনে করেন এ ব্যবসায়ী নেতা। তিনি বলেন, ‘শুল্ক কমিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হলে আমদানিকারকদের জন্য ব্যবসা সহজ হবে এবং ভোক্তারাও তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে ফল কিনতে পারবে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়সীমার মধ্যে এসব ফল নিয়ে আসা সম্ভব হবে।’

বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও ব্যবসায়ীরা জানান, মাল্টার বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ সরবরাহের ঘাটতি। তাদের দাবি, কোনো কোনো সপ্তাহে দেশে মাত্র ১২-২৯ কনটেইনার মাল্টা এসেছে। অথচ স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার মাল্টার প্রয়োজন হয়। উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের জটিলতা এবং আগের চালানে লোকসানের কারণে অনেক ব্যবসায়ী মাল্টা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণ পর্যায়ে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিও রয়েছে বলে জানান তারা।

মাল্টা আমদানিতে এ সময় বিকল্প উৎস খোঁজার তাগিদ দেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। পাশাপাশি দ্রুত এলসি খুলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে ফলটির সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টি পর্যালোচনার কথা জানান।

দেশে আমদানীকৃত অন্যতম আরেকটি ফল খেজুর। এ ফলেও বড় অংকের শুল্ক গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের। ফলে সাধারণ খেজুর বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশে ২৫০-৪৫০ টাকায়। অথচ ভারতে ১৬০-২৬০, পাকিস্তানে ১২০-২০০ ও নেপালে এর দাম ১৮০-২৮০ টাকা। দেশে সাধারণ খেজুরের দাম কিছুটা কম থাকলেও একটু ভালো মানেরগুলো বিক্রি হয় এক হাজার থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়।

আগামীতে চাহিদা বিবেচনায় ব্যবসায়ীদের এখন থেকেই খেজুর আমদানির প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, ‘খেজুরের শুল্কের বিষয়ে চলতি সপ্তাহেই সরকারের সিদ্ধান্ত জানানো হবে। একই সঙ্গে অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু বা শুল্কায়ন মূল্য নির্ধারণে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনেও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন কয়েক দিনের মধ্যে আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করবে।’

শুধু শুল্ক নয়, আমদানিকারকদের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে শুল্কায়ন মূল্য। বিটিটিসির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে যে দামে ফল বুকিং হয়, তার চেয়ে বেশি মূল্য ধরে কাস্টমস শুল্কায়ন করায় আমদানি ব্যয় বাড়ছে। এর সঙ্গে সীমিতসংখ্যক আমদানিকারক ও কোল্ড স্টোরেজের ঘাটতিও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করছে।

বাজারে ফলের দাম বাড়লে সেটি ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপের পাশাপাশি পুষ্টিগুণে ঘাটতি তৈরি করতে পারে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ফলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ও পুষ্টিকর খাদ্যপণ্যে এত উচ্চ করভার ভোক্তার ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে। যেসব ফলের স্থানীয় উৎপাদন খুবই সীমিত, সেগুলোর আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে দেশীয় উৎপাদককে সুরক্ষা দেয়ার সুযোগ নেই, বরং কর বাড়লে আমদানিকারকের ব্যয় বাড়ে, আমদানি কমে এবং সরবরাহ সংকট তৈরি হয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে গিয়ে পড়ে। তাই রাজস্ব আহরণের পাশাপাশি ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা, পুষ্টি ও বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ফল আমদানিতে শুল্ক পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।’

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফলের ওপর ট্যাক্স এত বেশি হলে স্বাভাবিকভাবেই এর চাপ ভোক্তাদের ওপর পড়ে। ফল মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্যের একটি অংশ এবং পুষ্টির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু ও রোগীদের জন্য ফল খুব উপযোগী। কিন্তু ট্যাক্সের কারণে ফলের দাম বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা কেনা কঠিন হয়ে যায়। দেশে ফলের চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু উচ্চ ট্যাক্সের কারণে দামও বাড়ছে, যা অনেকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। তাই ফলের ওপর ট্যাক্স যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কমানো দরকার।’

এদিকে সাপ্লিমেন্টারি ও রেগুলেটরি ডিউটির কারণে অনেক ব্যবসায়ী ফল আমদানি বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানান ঐশী ফ্রুটস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী নাজিম উদ্দিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌বর্তমান সংকটের একমাত্র কারণ অপ্রত্যাশিত ট্যাক্স। আমরা আগে যে এলসিগুলো খুলেছি, সেগুলো পূরণ করছি, কিন্তু নতুন করে এলসি খুলছি না। কারণ আমরা ব্যবসা করার জন্য আমদানি করি, লোকসান দেয়ার জন্য নয়।’

আরও