বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর দপ্তর, জনসংযোগ দপ্তর ও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে জানা গেছে, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত গত সাড়ে ছয় বছরে অন্তত ১৬ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এগুলোর মধ্যে অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের বাইরে বিভিন্ন মেস, ছাত্রাবাস ও ভাড়া বাসায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক উচ্চ প্রত্যাশা, সম্পর্কের টানাপড়েন, ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা ও একাকিত্ব শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
সর্বশেষ গত ১০ জুন বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকার ‘আয়েশা টাওয়ার’ নামের একটি ছাত্রাবাস থেকে ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমানের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর কিছুদিন আগেই গণিত বিভাগের এক শিক্ষার্থী প্রকাশ্যে বিষাক্ত পদার্থ পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এসব ঘটনা ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফিরোজ কবীরের মরদেহ ক্যাম্পাসসংলগ্ন আমজাদের মোড় এলাকার একটি মেস থেকে উদ্ধার করা হয়। এরপর ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর পটুয়াখালীতে নিজ বাড়িতে মারা যান নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী দেবজ্যোতি বসাক পার্থ। ২০২১ সালের ৩০ জানুয়ারি নগরীর মির্জাপুর এলাকার একটি আবাসিক ছাত্রী হোস্টেল থেকে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মোবাসসিরা তাহসিন ইরার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এসেছিল বলে সে সময় পুলিশ জানিয়েছিল। একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ইমরুল কায়েস নিজ বাড়িতে মারা যান। ২০২২ সালে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে একাধিক শিক্ষার্থীর। ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ইশতিয়াক মাহমুদ পাঠান নিজ বাসায় মারা যান। ৯ এপ্রিল প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সোহাগ খন্দকার নীলফামারীর সৈয়দপুরে নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেন। ১৩ মে ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া তাবাসসুম নিজ ঘরে মারা যান। মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশা ও বিষণ্নতার কথা লিখেছিলেন তিনি। ৬ জুন নাট্যকলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জান্নাতুল মাওয়া দিশার মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। একই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর বিয়ের তিন মাসের মাথায় অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছন্দা রায় মারা যান।
২০২৩ সালের ১৯ জানুয়ারি চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাইমা আরাবী ইভা অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরদিন ২০ জানুয়ারি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। একই বছরের ৮ জুন লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. তানভীর ইসলাম রিতুর মরদেহ বিনোদপুর এলাকার একটি মেস থেকে উদ্ধার করা হয়। তার পড়ার টেবিল থেকে একটি চিরকুট উদ্ধারের কথা জানা যায়। ১০ সেপ্টেম্বর শহীদ শামসুজ্জোহা হলের একটি কক্ষ থেকে সমাজকর্ম বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফুয়াদ আল খতিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফিশারিজ বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. সিফাতুল্লাহর মরদেহ ক্যাম্পাসসংলগ্ন মেহেরচণ্ডী এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ১২ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন মির্জাপুর এলাকার একটি আবাসিক ভবন থেকে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সোনিয়া সুলতানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় তার কক্ষ থেকে কয়েকটি চিরকুট উদ্ধারের কথা জানানো হয়।
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর বিনোদপুরের লেবুবাগান এলাকার একটি মেস থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী লামিসা নওরীন পুষ্পিতার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী জুবাইদা ইসলাম ইতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। মেহেরচণ্ডী এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আত্মহত্যার বড় একটি অংশ ঘটেছে ক্যাম্পাসের বাইরে মেহেরচণ্ডী, মির্জাপুর, বিনোদপুর ও আমজাদের মোড় এলাকার মেস ও ছাত্রাবাসগুলোতে। হলের বাইরে অবস্থান করার কারণে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন আচরণগত পরিবর্তন, বিষণ্নতা কিংবা মানসিক সংকটগুলো শিক্ষক বা সহপাঠীদের নজরের বাইরে থেকে যায়। ফলে সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের সময়মতো শনাক্ত করা ও তাদের দ্রুত প্রয়োজনীয় মানসিক বা প্রশাসনিক সহায়তা দেয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের গত ছয় অর্থবছরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেবাগ্রহীতার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে সেবা নিয়েছিলেন ২৩২ জন, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সে সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭৩ জনে। চিকিৎসকদের মতে, সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে বিষণ্নতা, প্যানিক ডিজঅর্ডার, ওসিডি ও সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। এর মূলে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেমস ও পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি, মাদক সেবন, একাকিত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক অধ্যাপক মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব বণিক বার্তাকে বলেন,"‘শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার পেছনে সামাজিক, মানসিক ও আর্থিক বিভিন্ন কারণ জড়িত। প্রেম বা সম্পর্কজনিত টানাপড়েন, পারিবারিক কলহ, আর্থিক সংকট ও একাকিত্ব থেকে বিষণ্নতার সৃষ্টি হয়। অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের আত্মহত্যার ঘটনা দেখেও অনেকে প্রভাবিত হতে পারে।’" তিনি শিক্ষার্থীদের পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক রাখার এবং দীর্ঘ সময় বিষণ্নতা অনুভব করলে অবিলম্বে মানসিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়ার আহ্বান জানান।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান জানান, মেসে থাকা বা হলে থাকার সঙ্গে আত্মহত্যার সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও মেসে একাকিত্ব বেশি থাকে। শিক্ষার্থীদের সুস্থ রাখতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে।