অবাধে চলছে কাঠ পাচার

থানচিতে ট্রাকের ভারে সেতু ভেঙে বিচ্ছিন্ন চার এলাকা

বন বিভাগের সূত্র জানায়, কাঠ পরিবহনের ক্ষেত্রে সূর্য অস্ত যাওয়ার পর গাড়ি চলাচলের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

বন বিভাগের দায়িত্বে অবহেলা ও নিয়মিত তদারকির অভাবে বান্দরবানের দুর্গম এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে অবাধে অবৈধ কাঠ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। কাঠ ব্যবসায়ীদের এ বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের খেসারত দিতে হচ্ছে স্থানীয় পাহাড়ি অধিবাসীদের। গত ১৩ আগস্ট সন্ধ্যায় থানচি উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের থানচি-জিনিঅংপাড়া সড়কে অতিরিক্ত কাঠবোঝাই ট্রাকের ভারে ৩৯ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি সেতু ভেঙে পড়ে। এ দুর্ঘটনার পর থেকে অন্তত চার পাড়ার ১৫০ পরিবারের সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জোত পারমিটের নাম ভাঙিয়ে অবৈধভাবে প্রাকৃতিক বনের কাঠ সংগ্রহ করা, কাগজপত্রে ভুয়া তথ্য দেখানো ও সূর্যাস্তের পর আইন ভেঙে বেআইনিভাবে কাঠ পরিবহনের ফলে মানুষ এ দুর্ভোগে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ আগস্ট এলাকাবাসীর বারণ উপেক্ষা করে অতিরিক্ত কাঠবোঝাই একটি ট্রাক সেতুতে উঠলে তা ভেঙে ঙাবিছাং খালে পড়ে যায়। পরের দিন কাঠগুলো সরিয়ে ট্রাকটি উদ্ধার করা হয়। তবে সেতুটি ধ্বংস হওয়ায় জিনিঅংপাড়া, প্রেচিং ম্রোপাড়া, নিংলক ম্রোপাড়া ও মেকং ম্রোপাড়ার বাসিন্দারা সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও রোগীসহ সাধারণ মানুষের যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

বন বিভাগের সূত্র জানায়, কাঠ পরিবহনের ক্ষেত্রে সূর্য অস্ত যাওয়ার পর গাড়ি চলাচলের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু সে নিয়ম ভঙ্গ করে রাতের আঁধারে কাঠগুলো পরিবহন করা হচ্ছিল। পাল্পউড ডিভিশনের মিবাক্ষা রেঞ্জের আওতাভুক্ত এ কাঠগুলো জোত পারমিটের নির্ধারিত বাগানের বাইরে থেকে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা হয়, যা স্থানীয়ভাবে ‘আউট কালেকশন’ নামে পরিচিত।

জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মিবাক্ষা রেঞ্জে বশিহা ত্রিপুরা নামের এক ব্যক্তির নামে আড়াই হাজার ঘনফুট কাঠের জোত পারমিট ইস্যু করা হয়। কিন্তু সরজমিনে এর বাস্তবায়ন করছেন বান্দরবানের মৃত কাজী ইউসুফের ছেলে মো. শহিদুল হক (শহিদ মাস্টার)। অভিযোগ রয়েছে, আয়কর ফাঁকি দিতেই বশিহা ত্রিপুরার নাম ব্যবহার করে এ পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে।

বাগান থেকে কাঠ কেনার বিষয়ে ব্যবসায়ী মো. শহিদুল হক বলেন, ‘আমার মাঝি আলী আকবরের মাধ্যমে চহাই মারমা, মালিরাম ত্রিপুরাসহ স্থানীয় কয়েকজনের কাছ থেকে কাঠ কিনে সংগ্রহ করা হয়। তবে জোত পারমিটটি জিনিঅংপাড়ার মংথোয়াইম্যা রনির নামে রয়েছে বলে দাবি তার।’

৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার শৈখ্যাইঅং মারমা নিশ্চিত করেন, জিনিঅংপাড়ায় বশিহা ত্রিপুরা নামে কেউ নেই। বন বিভাগও এ বশিহা ত্রিপুরার সঠিক অবস্থান জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। জিনিঅংপাড়ার বাগানটির মূল মালিক তিন্দু ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মংথোয়াইম্যা রনি। তবে রনি জানান, ওই এলাকায় বাগান থাকলেও তার নামে কোনো জোত পারমিট করা নেই।

একই অনিয়মের কারণে ২০২১-২২ সাল থেকে মিবাক্ষা ও থানচি রেঞ্জে জোত পারমিট ইস্যু বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার ঘনফুট কাঠ আহরণের শর্তে বন্ধ থাকা রেঞ্জগুলোতে পুনরায় অনুমোদন দেয়া শুরু হয়। এ সময় কেবল সেগুন, গামার ও কড়ই গাছ কাটার নিয়ম করা হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে তার তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।

একই চিত্র দেখা গেছে রুমা উপজেলার রেমাক্রিপ্রাংসা ইউনিয়নের নাইতিং মৌজায়। অভিযোগ রয়েছে, মৌজাটির হেডম্যান (মৌজা প্রধান) শৈহ্লাচিং প্রকাশ বাশৈচিং মারমার নির্দেশে ও কারবারি হাস্তরাং ত্রিপুরার নেতৃত্বে বনের গর্জন, কড়ই, চাঁপা, গুটগুটিয়া ও চাপালিশ গাছ কেটে মজুদ করা হচ্ছে। এসব কাঠ ক্যপুং খাল হয়ে বান্দরবান বন বিভাগের সেকদু রেঞ্জভুক্ত চেমা সোনা খাল দিয়ে বলিপাড়া বাজার ঘাটের বিপরীত দিক হতে সাঙ্গু নদে আনা হয়। এ নৌ রুট দিয়ে পাচার করে রুমা উপজেলার ১ নং ঘাটের অননুমোদিত ডিপোতে জমা করা হয়। সেখান থেকে জোত পারমিটের কাগজে মিলিয়ে বান্দরবান সদরে পাচার করা হয়। জানতে চাইলে এ বিষয়ে জানা নাই বলে মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য ও নাইতিং মৌজার হেডম্যান শৈহ্লাচিং প্রকাশ বাশৈচিং মারমা।

অন্যদিকে বান্দরবান সদর রেঞ্জের সুয়ালক ইউনিয়নে অবৈধভাবে গাছ কাটার খবর দেয়ার পরও বন বিভাগ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সম্প্রতি নিউ গুলশান ও বালাঘাটা এলাকায় টিপির গাড়িতে কাঠ লোড করার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত লোডিং অফিসার কাজী মো. সাইফুল ইসলামের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

মিবাক্ষা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রউফুল ইসলাম খান বলেন, ‘জোত পারমিটটি বশিহা ত্রিপুরার নামে হলেও কাঠ কাটার দায়িত্ব মো. শহিদুল হককে দেয়া হয়েছে। লোকবল সংকটের কারণে সঠিক তদারকি সম্ভব হচ্ছে না।’ তবে আউট কালেকশনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন।

বান্দরবান পাল্পউড প্লান্টেশন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু ইউসুফ জানান, জনবল সংকটের বিষয়টি সত্য। তবে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। সেতু ভাঙার ক্ষতিপূরণ কাঠ ব্যবসায়ীকেই বহন করতে হবে।

বন বিভাগ বান্দরবানের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কাঠ লোডিংয়ের সময় লোডিং অফিসারের থাকা বাধ্যতামূলক। সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার অনিয়মের বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হবে।’

থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ-আল-ফয়সাল জানান, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে মিবাক্ষা রেঞ্জ কর্মকর্তাকে তলব করা হবে। কাঠ অবৈধ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। জনগণের চলাচলের সুবিধার্থে দ্রুত অস্থায়ী কাঠের সাঁকো তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া নতুন স্থায়ী সেতুর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

আরও