কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরের ঘিঞ্জি ঝুপড়িতে যখনই একা থাকেন ১৭ বছর বয়সী রহিমা (ছদ্মনাম), তখনই তার দু’চোখ ভিজে ওঠে। তবে এই কান্না কেবল স্বামীর মারধরের যন্ত্রণায় নয়, বরং সেই স্কুলের জন্য যা একসময় তার একমাত্র শান্তির জায়গা ছিল। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে বাবাকে হারানোর পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা এই কিশোরীর স্বপ্ন ছিল শিক্ষিকা হওয়ার। কিন্তু গত জুনে যখন স্কুলের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেল, তখন মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল রহিমার শৈশব। স্কুল বন্ধ হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাকে বিয়ে দেয়া হয়। এখন তার দিন কাটে এক বদ্ধ ঘরে, স্বামীর নির্যাতন আর দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে।
রহিমার এ গল্পটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর বিদেশী অনুদান হ্রাসের ফলে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে থাকা ১২ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে, বিশেষ করে শিশুদের জীবন এখন চরম বিপর্যয়ের মুখে।
চলতি বছর ট্রাম্প প্রশাসনের নেয়া বিদেশী অনুদান কমানোর সিদ্ধান্তের ফলে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে হাজার হাজার শিক্ষা কেন্দ্র ও যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, এই অর্থ সংকটের কারণে তারা তাদের শিক্ষা কার্যক্রমের প্রায় ২৭ শতাংশ অর্থায়ন হারিয়েছে এবং অন্তত ২ হাজার ৮০০ স্কুল বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র তার মোট বাজেটের মাত্র ১ শতাংশ বিদেশী সহায়তায় ব্যয় করলেও, সেই সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর। দ্য ল্যানসেট–এ প্রকাশিত এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, এই তহবিল কাটছাঁটের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে, যার মধ্যে ৪৫ লাখের বেশি শিশু।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে বিয়ের দিনে মুশরোফাকে তার স্বামীর ঘরে যাচ্ছেন তার বাবা। ছবি- এপি
স্কুলগুলো শিশুদের জন্য কেবল শিক্ষাকেন্দ্র ছিল না, বরং তা ছিল পাচারকারী ও অপরাধী চক্র থেকে বাঁচার এক নিরাপদ আশ্রয়। ইউনিসেফ জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের মধ্যে শিশু অপহরণের ঘটনা গত বছরের তুলনায় চার গুণ বেড়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৫৬০টি শিশু অপহরণের শিকার হয়েছে। এছাড়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোতে শিশুদের নিয়োগের হার আট গুণ বেড়েছে, যেখানে ৮১৭ জন শিশুর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
ইউনিসেফ কিছু তহবিল পুনর্বিন্যাস করে আংশিকভাবে স্কুল চালু করতে পারলেও, বহু এনজিওর স্কুল এখনও বন্ধ। সেভ দ্য চিলড্রেন-এর কক্সবাজারের এরিয়া ডিরেক্টর গোলাম মোস্তফা জানান, ২০২৬ সালের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী সহায়তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। এর ফলে জানুয়ারি থেকে আরো ২০ হাজার শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
রোহিঙ্গা উইমেন অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক শওকত আরা জানান, স্কুল বন্ধ হওয়ার পর শিশুরা রাস্তায় খেলাধুলা করছে। এতে পাচারকারীদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতেও পরিণত হচ্ছে এসব শিশু। ১০ বছরের শিশুরাও কঠোর শ্রমে বাধ্য হচ্ছে, আর ১২ বছর বয়সী মেয়েদের পর্যন্ত যৌনপেশায় ঠেলে দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘অনেক শিশুই এরইমধ্যে হারিয়ে গেছে। কেউ বাল্যবিয়ের ফাঁদে, কেউ পাচারকারীদের হাতে। তাদের আর ফেরানো যাবে না।‘
১০ বছর বয়সী মোহাম্মদ আরফানের দিন শুরু হয় সকাল ৭টায়। যেখানে তার গণিত শেখার কথা ছিল, সেখানে ১৫ কেজি ওজনের একটি কুলার কাঁধে নিয়ে সে সারাদিন আইসক্রিম বিক্রি করে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে তার আয় হয় মাত্র ২০০-৩০০ টাকা। আরফান বলে, ‘আমি যখন কাজ করি তখন নিজেরই লজ্জা লাগে। এখন তো আমার পড়ার সময় ছিল।‘
একই অবস্থা ১৩ বছর বয়সী রহমত উল্লাহর। স্কুলের বেতন জোগাড় করতে সে এখন ড্রেন থেকে প্লাস্টিক কুড়ায়। নোংরা পানিতে কাজ করতে গিয়ে তার চোখে বাঁশ ঢুকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, তবুও টিকে থাকার লড়াই থামেনি তার।
১৩ বছর বয়সী রহমত উল্লাহ। ছবি- এপি
উন্নত জীবনের আশায় পাচারকারীদের হাত ধরে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রবণতা আবারও বাড়ছে। ১৭ বছর বয়সী নূর কায়দা জানান, তার দুই কিশোরী আত্মীয় পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া ১৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ নামে এক কিশোর স্কুল বন্ধ হওয়ায় হতাশ হয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছিল। কিন্তু দালাল ও পাচারকারী গোষ্ঠীর হাতে পড়ে সে। তার বাবা মহিব উল্লাহ ধারদেনা করে ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছেলেকে মুক্ত করলেও, ছেলে এখন বিদেশের মাটিতে নিখোঁজ। মহিব উল্লাহ বলেন, ‘স্কুল খোলা থাকলে ছেলেটা আমার পাশেই থাকত।‘
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, বর্তমান অর্থায়নে তারা কেবল আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত খাদ্য রেশন সরবরাহ করতে পারবে। রেশন কমে যাওয়ার আতঙ্কে অনেক পরিবার মরিয়া হয়ে বিপজ্জনক পথ বেছে নিচ্ছে। ইউএনএইচসিআর-এর মতে, এ বছর সমুদ্রপথে পালানো ১ হাজার ৩৪০ জন রোহিঙ্গার এক-তৃতীয়াংশই নিখোঁজ বা মৃত।
বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য শিক্ষা ছিল শুধু বই নয়—ছিল নিরাপত্তা, স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের একমাত্র ভরসা। সেই দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, একটি পুরো প্রজন্মকে আজ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।