এতে অন্তত ৩ লাখ ৪০ হাজার পরিবারের সদস্য সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গতকাল প্রকাশিত আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আইওএমের ডিসপ্লেসমেন্ট ট্র্যাকিং ম্যাট্রিক্স (ডিটিএম) এবং মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রজেক্টের (এমএমপি) নতুন বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমেরিকা মহাদেশে, মধ্য আমেরিকা হয়ে উত্তরমুখী (যুক্তরাষ্ট্রের দিকে) অভিবাসন যাত্রা ২০২৪ সালের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। ইউরোপে সামগ্রিকভাবে অভিবাসীদের পৌঁছানোর হার কমলেও অভিবাসনের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। সেখানে সিরীয়দের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশী নাগরিকরাই এখন আগত অভিবাসীদের মধ্যে বৃহত্তম গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।
২০২৫ সালে আইওএম ইউরোপগামী সমুদ্রপথে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজের ঘটনা রেকর্ড করেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৩০ জন মারা গেছেন ভূমধ্যসাগরীয় পথে এবং ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি প্রাণ হারিয়েছেন পশ্চিম আফ্রিকা থেকে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জগামী আটলান্টিক রুটে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরে সমুদ্রযাত্রার সময় গত বছর প্রায় ৯০০ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে, যাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা শরণার্থী।
কাজের সন্ধানে প্রতি বছরই অবৈধ পথে ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গল পাড়ি দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করছেন হাজার হাজার বাংলাদেশী। এ কাজে জড়িত মানব পাচার চক্রটি পশ্চিম বলকান অঞ্চল ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। যেখানে যুক্ত আছে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারীরা। অনেকে গন্তব্যে পৌঁছতে পারলেও বেশির ভাগ অভিবাসনপ্রত্যাশীর ভাগ্যে নেমে আসে নির্মম পরিণতি। আইওএমের ডিটিএম পরিসংখ্যান বলছে, অনিয়মিত পথে ২০২৫ সালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন ২৪ হাজার ৩১৮ বাংলাদেশী।
ডিটিএম সরাসরি ফিল্ড মনিটরিং এবং সরকারি তথ্যের মাধ্যমে অভিবাসন পথ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। আর এমএমপি দাপ্তরিক রেকর্ড এবং মিডিয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করে। প্রতিবেদনগুলো যৌথভাবে দেখিয়েছে, কীভাবে মূল ভূখণ্ডের পরিস্থিতি এবং নীতিগত পরিবর্তন অভিবাসন যাত্রাকে নতুন রূপ দিচ্ছে, যেখানে অনিরাপদ অভিবাসনের মানবিক মূল্য ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। আইওএমের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ বলেন, ‘সংঘাত, জলবায়ুর চাপ এবং নীতি পরিবর্তনের কারণে রুটগুলো পরিবর্তিত হলেও ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।’
২০২৫ সালের গ্লোবাল ওভারভিউ অব মাইগ্রেশন রুটস দেখায়, কিছু অঞ্চলে অভিবাসী পৌঁছানোর সংখ্যা কমে আসা মানেই অভিবাসনের চাপ কমে যাওয়া নয়। বরং কঠোর আইন প্রয়োগ, সংঘাত এবং পরিবেশগত চাপের কারণে প্রতিষ্ঠিত পথগুলোর পরিবর্তে নতুন ও বিপজ্জনক পথ বেছে নেয়া হচ্ছে।
‘হর্ন অব আফ্রিকা’ রুট দিয়ে সৌদি আরবের দিকে অভিবাসন ২০২৪ সালের তুলনায় কিছুটা কমলেও ২০২৩ সালের তুলনায় বেশি। তবে দক্ষিণ ইথিওপিয়ায় শ্রম চাহিদার পরিবর্তনের কারণে পূর্ব আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার দিকে অভিবাসীদের প্রবাহ বছরের শেষের দিকে বেড়েছে।
বর্তমানে সীমান্ত সহযোগিতা বাড়ায় পশ্চিম আফ্রিকান আটলান্টিক রুট ব্যবহার করে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিন্তু যাত্রাগুলো এখন আগের চেয়ে দীর্ঘ, ঝুঁকিপূর্ণ এবং ভৌগোলিকভাবে আরো বিস্তৃতি হচ্ছে।
ডিটিএমের তথ্য বলছে, সীমান্ত এলাকাগুলোয় হাজার হাজার অভিবাসী আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা এবং সুরক্ষার সীমিত সুযোগ নিয়ে আটকা পড়ে আছেন। একই সময়ে প্রত্যাবাসন ও স্থানান্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় পরিষেবাগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়া আরো জটিল হয়ে উঠছে।
আইওএম স্পষ্টভাবে বলেছে, অভিবাসনের সংখ্যা কমে যাওয়া মানেই যাত্রা নিরাপদ হওয়া নয়। জীবন বাঁচাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপে বিনিয়োগ বাড়ানো অপরিহার্য।