কলকাতায় অভিযান

বন্ধ হোটেল, ভাড়া দ্বিগুণ, বিপাকে বাংলাদেশী পর্যটক ও রোগী

বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা গেছে, গত ৬-২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ চেকপোস্ট দিয়ে ভারতে যাতায়াত করেছেন ১৯ হাজার ৯৫৪ জন দেশী-বিদেশী পাসপোর্টযাত্রী।

ভারতের কলকাতায় আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশীসহ নয়জনের মৃত্যুর পর সেখানকার প্রশাসনিক অভিযানে একের পর এক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশী পর্যটক ও চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীরা। অভিযোগ রয়েছে, আগে থেকে বুকিং করেও কলকাতা পৌঁছে অনেকেই নির্ধারিত হোটেলে উঠতে পারছেন না। থাকার জায়গা খুঁজতে হতে হচ্ছে হয়রান। অন্য জায়গায় হোটেল মিললেও ভাড়া নেয়া হচ্ছে দ্বিগুণ। এতে অনেকে বাধ্য হয়ে কলকাতা ছাড়ছেন। আবার কেউ দেশে ফিরে আসছেন নির্ধারিত সময়ের আগেই। কলকাতার ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, পর্যটক বাড়ার সময়ে হোটেল বন্ধ করে দেয়া তাদের জন্য বড় ধাক্কা। তবে সেখানকার প্রশাসন বলছে, পর্যটকদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না।

বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা গেছে, গত ৬-২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ চেকপোস্ট দিয়ে ভারতে যাতায়াত করেছেন ১৯ হাজার ৯৫৪ জন দেশী-বিদেশী পাসপোর্টযাত্রী। এদের মধ্যে বাংলাদেশী ১৬ হাজার ৭৮৮ জন ও ভারতীয়সহ অন্যান্য দেশের রয়েছেন ৩ হাজার ১৮১ জন। এ সময়ের মধ্যে ভারতে গেছেন বাংলাদেশী ১২ হাজার ৫৩৪ জন, ভারতীয় ফিরে গেছেন ১ হাজার ৫৬২ জন, অন্যান্য দেশের নাগরিক গেছেন সাতজন। অন্যদিকে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছেন ৬ হাজার ২৫৪ জন বাংলাদেশী, ২ হাজার ৮৯ জন ভারতীয় ও আটজন অন্যান্য দেশের নাগরিক।

কলকাতা থেকে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ফিরে আসা বাংলাদেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কলকাতা নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে প্রশাসনের অভিযানে একের পর এক আবাসিক হোটেল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এসব এলাকায় ছোটবড় মিলিয়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ হোটেল রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে গত ১৯ আগস্ট রাত ২টার দিকে অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতা প্রশাসন বিভিন্ন হোটেল ও অতিথিশালায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা শুরু করে। সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে ৯১৯টি আবাসিক হোটেল ও অতিথিশালায় অভিযান চালানো হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৪১টিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও অন্যান্য পরিকাঠামো সঠিক পাওয়া গেছে। বাকিগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা বিধি ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ঘাটতি পাওয়ায় এর অধিকাংশ হোটেলই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে এসব এলাকায় থাকা বাংলাদেশী পর্যটক ও চিকিৎসাপ্রত্যাশীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে নির্ধারিত সময়ের আগে বাংলাদেশে ফিরে আসছেন।

কলকাতার এসব এলাকা বাংলাদেশী পর্যটক ও চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত। কিন্তু শিখা ইনের দুর্ঘটনার পর সে পরিচিত এলাকাই এখন অনেকের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুধু আতঙ্ক নয়, হোটেল সংকটও নতুন করে ভোগান্তি তৈরি করেছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া হোটেল থেকে বের করে দেয়া পর্যটকদের অনেকেই এক হোটেল থেকে আরেক হোটেলে ঘুরছেন। কোথাও নতুন করে থাকার জায়গা পাওয়া গেলেও আগের তুলনায় বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। অনেকে কলকাতায় হোটেলের ব্যবস্থা করতে না পেরে মুকুন্দপুর, আনন্দপুর, বারাসাত, দমদম, জাকারিয়া স্ট্রিটসহ দূরের কোথাও থাকছেন। দেশে ফিরে আসা কয়েকজন যাত্রী জানান, কিছু হোটেল ভাড়া দেড়-দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ হয়রানি ও চাপের মুখে পড়ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, কলকাতার কয়েকটি হাসপাতাল বাংলাদেশী রোগীদের জন্য হোটেল ঠিক করে দেবে বলে প্রচার করলেও সেসব হোটেলে কোনো রোগী বা রোগীর আত্মীয়স্বজন সিট পাচ্ছেন না।

সম্প্রতি কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশন একটি পরামর্শ দিয়েছে। এতে চিকিৎসা বা অন্য প্রয়োজনে কলকাতা ভ্রমণকারীদের আগে থেকেই নিরাপদ হোটেল বুক করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো হোটেলই অগ্রিম বুকিং নিচ্ছে না। ফলে ভিসা থাকা সত্ত্বেও অনেকে ভারতে যেতে পারছেন না শুধু থাকার জায়গা না পাওয়ার কারণে।

ভারতফেরত পাসপোর্টধারী যাত্রী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য পরিবার-পরিজন নিয়ে ১৬ আগস্ট ভারতে গিয়েছিলাম। কলকাতা বড়বাজার এলাকার একটি হোটেলে ছিলাম। ১৯ আগস্ট শিখা ইন হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে কলকাতার আবাসিক হোটেলগুলোতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকায় অধিকাংশ হোটেল বন্ধ করে দিচ্ছে। আমরাও যে হোটেলে ছিলাম, পুলিশ সেটিও বন্ধ করে দিয়েছে। আরো এক সপ্তাহ থাকার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু হোটেলগুলো সিট ভাড়া বাড়িয়ে দেয়ায় নিরাপত্তা ও অর্থ সংকটের কারণে চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখে আগেই দেশে চলে এলাম।’

কলকাতার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, পর্যটক ভিসা চালু হওয়ায় বাংলাদেশীদের সংখ্যা বাড়ার সময় নতুন করে হোটেল বন্ধের ঘটনা তাদের জন্য করোনার পর বড় ধাক্কা। তবে সে দেশের প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পর্যটকদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। অগ্নিনিরাপত্তা বিধি না মানা হোটেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত কয়েক দিনের হিসাব দেখে বোঝা যাচ্ছে, আগের থেকে যাত্রী ফিরে আসার সংখ্যা কিছুটা বেশি। তবে কী কারণে এ সংখ্যা বাড়ছে, সে বিষয়ে আমার কাছে সঠিক তথ্য নেই। দুই দেশের মধ্যে যাত্রী যাতায়াত স্বাভাবিক আছে।’

আরও