উচ্চ মূল্যস্ফীতিতেও কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছে না টিসিবি

অস্থিতিশীল বাজারে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে ভোগ্যপণ্য কেনার সুযোগ পায় জনসাধারণ। নিয়মিত ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনি বিক্রি করলেও বাজার অস্থিতিশীলতার সময় মূল্য নিয়ন্ত্রণের তাগিদে অন্যান্য পণ্যও বিশেষ করে পেঁয়াজ বিক্রি করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি সময়ে সময়ে খাদ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে চালও কম দামে বিক্রি করে

অস্থিতিশীল বাজারে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে ভোগ্যপণ্য কেনার সুযোগ পায় জনসাধারণ। নিয়মিত ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনি বিক্রি করলেও বাজার অস্থিতিশীলতার সময় মূল্য নিয়ন্ত্রণের তাগিদে অন্যান্য পণ্যও বিশেষ করে পেঁয়াজ বিক্রি করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি সময়ে সময়ে খাদ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে চালও কম দামে বিক্রি করে থাকে। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ও প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ‘ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রয় কার্যক্রমের’ পরিধি বাড়ার প্রত্যাশা করছিলেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে টিসিবি ভোজ্যতেল, ডাল ও চালেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছে। 

টিসিবির তালিকায় বর্তমানে সারা দেশে এক কোটি ফ্যামিলি কার্ডধারী রয়েছে। মাসে একবার ভর্তুকি মূল্যে অর্থাৎ ২০০ টাকায় দুই লিটার সয়াবিন তেল, ১২০ টাকায় দুই কেজি মসুর ডাল ও ১৫০ টাকায় পাঁচ কেজি চাল কেনা যায়। তবে তিনটি পণ্যের এ প্যাকেজ থেকে আলাদা করে কেনার সুযোগ নেই। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮ নং ওয়ার্ডের ফ্যামিলি কার্ডধারী নাজমা বেগম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সব জিনিসেরই দাম বেশি। মাসে একবার এখানে আসি, অল্প কিছু জিনিস কম দামে কিনি। তা দিয়ে পাঁচজনের সংসারে ১০ দিনও যায় না। আরো বেশি করে দিলে ভালো হতো। তাছাড়া শুধু তিনটা পণ্যই দিচ্ছে। এর সঙ্গে আর কয়েকটা পণ্য বাড়িয়ে দিলে আমাদের জন্য স্বস্তির হতো।’ 

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মীর হাজিরবাগে টিসিবির ডিলার সিফাত জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী সাইদুর রহমান রুবেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একজন কার্ডধারী মাসে একবারই কেবল পণ্য নিতে পারে। প্যাকেজ করা আছে। এ মাসে তিনটি পণ্যের প্যাকেজ ৪৭০ টাকা। যেখানে তেল দুই লিটার, ডাল দুই কেজি ও চাল থাকছে পাঁচ কেজি। প্যাকেজের বাইরে বিক্রি করার নিয়ম নেই।’

জানতে চাইলে টিসিবির যুগ্ম পরিচালক মো. হুমায়ূন কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টিসিবি সারা বছর তিনটি পণ্য দেয়—তেল, চিনি ও মসুর ডাল। গত জুলাইয়ে আমাদের সঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তরের চাল যুক্ত হয়েছে। আর রমজানে ছোলা দিই। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেয়া হয় পেঁয়াজ। এটি তিন বছর ধরে হচ্ছে। আমরা চাইলেই তো আর পণ্য বাড়াতে পারি না, মন্ত্রণালয় থেকে যেভাবে নির্দেশনা দেয়া হয় সেভাবেই কাজ করতে হয়।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে জুনে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এর আগে মে মাসে দেশে মূল্যস্ফীতির পারদ চড়েছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশে, যা কিনা এক যুগের সর্বোচ্চ। জুলাইয়ে অবশ্য দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ হয়েছে। তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ। আগের মাস অর্থাৎ জুনে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৭৩। চলতি মাসেও খাদ্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। 

ব্যবসায়ীদের দাবি, বৈশ্বিক ভোগ্যপণ্যের বাজারে মূল্যের অস্থিতিশীলতার কারণে আমদানীকৃত পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এজন্য কভিডের প্রাদুর্ভাব থেকে শুরু করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত, বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের ব্যাঘাতসহ নানা কারণকে দায়ী করা হয়েছে। যদিও গত কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম অব্যাহত হারে কমেছে। কোনো কোনো পণ্যের দাম এরই মধ্যে প্রাক-কভিড পর্যায়ে নেমে এসেছে। কিন্তু দেশে উল্টো দাম বাড়ছে প্রায় প্রতিটি পণ্যেরই। আবার অপ্রতুল পণ্যের কারণে উচ্চ এ মূল্যস্ফীতিতে নিম্ন আয়ের মানুষকে স্বস্তি দিতে পারছে না টিসিবির কার্যক্রমও। 

টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনায় মূল চ্যালেঞ্জ পর্যাপ্ত মূলধন সংকট। জরুরি হিসেবে ১ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হলেও তা এখনো অনুমোদন করা হয়নি। ফলে সরবরাহ ঠিক রাখতে টিসিবিকে ৯ শতাংশ সুদে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। আবার পণ্য নেয়ার সময় টিসিবির ডিলারদের ২ শতাংশ হারে সরকারকে আয়কর দিতে হচ্ছে। সে কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে।

বিক্রির জন্য পণ্য বাড়ানোর বিষয়ে টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আরিফুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের চিনি পাইপলাইনে আছে। শিগগিরই এটা শুরু হবে। এদিকে বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে, তাই আমরা স্বল্পমূল্যে এ পণ্যটি দেয়ার বিষয়ে ভাবছি। এরই মধ্যে কাজও শুরু করেছি। পাঁচ কেজি চাল খাদ্য অধিদপ্তর থেকে দেয়া হচ্ছে, সেটি আমরা মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। দুই কোটি লিটার তেল প্রতি মাসে আমরা দিই। আসলে চাহিদার তো শেষ নেই। কম দামে পেলে তো সবাই নিতে চাইবে, আমরা শুধু নিম্ন আয়ের যারা, শুধু তাদের সহায়তা দিতে চাইছি। তবে আমাদের যে পণ্যগুলো আছে সেখানে আসলে পরিমাণে বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই।’ 

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি এখনো দুই অংকের ঘরে যায়নি। তাই এটিকে এখনই উচ্চ মূল্যস্ফীতি বলা যায় না। তবে টিসিবি যদি স্বল্প আয়ের মানুষকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যই দিতে পারত তাহলে ভালো হতো। এখানে অর্থের সংকুলানেরও একটা ব্যাপার আছে। চাইলেই ত বাড়ানো যায় না। শুধু টিসিবি কেন, সরকার আরো অনেকভাবে সাহায্য দিচ্ছে। মাসিক ভাতা দিচ্ছে। আমি আশা করি আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি আবার কমে আসবে।’ 

আরও