মাদারীপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিরুদ্ধে নিম্নমানের সরকারি পাটের বস্তা ব্যবহার করে টরকী নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। ২ কোটি টাকা ব্যয়ে এ বাঁধ নির্মাণের চার মাসের মধ্যেই পাটের বস্তা পচে গিয়ে বালি ও সিমেন্ট পানিতে গলে যাওয়ার অভিযোগ এলাকাবাসীর। তবে পাউবোর কর্মকর্তা বলছেন, সরজমিন মেয়াদোত্তীর্ণ নিম্নমানের ও সরকারি অন্য দপ্তরের পাটের বস্তা বাঁধে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মাদারীপুর পাউবো সূত্রে জানা গেছে, জেলার কালকিনি উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত আড়িয়ালখাঁ নদের শাখা নদী টরকী নদীর তীরে (স্থানীয়ভাবে পালরদী নামে ডাকা হয়) বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। এসব পয়েন্টের মধ্যে গুরুত্ব বিবেচনায় আলীনগর ইউনিয়নের ফাঁসিয়াতলা এলাকার দুটি স্থানে অন্যান্য রাজস্ব খাত (এনডিআর) প্রকল্পের আওতায় তীর রক্ষা বাঁধ দেয়া হয়। এর মধ্যে পশ্চিমচর ফাঁসিয়াতলা এলাকায় ২০০ মিটার এলাকা ৯০ লাখ টাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনাইডেট ব্রাদার্স ও ফাঁসিয়াতলা এলাকায় ১৯০ মিটার এলাকা ৮২ লাখ টাকায় নির্মাণকাজের জন্য সার্বিক ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে পাউবোর চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী ইউনাইটেড ব্রাদার্স বালি ও সিমেন্টমিশ্রিত ১২ হাজার জিও বস্তা ও ১৩ হাজার পাটের বস্তা এবং সার্বিক ইন্টারন্যাশনাল ১১ হাজার ৪০০ জিও বস্তা ও ১৮ হাজার পাটের বস্তা দ্বারা নদীভাঙন ঠেকাতে তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে।
সরজমিনে দেখা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে উৎপাদিত পাটের ব্যবহৃত পুরনো বস্তা সংগ্রহ করে নদীর তীর রক্ষা বাঁধে ব্যবহার করেছে। এসব পাটের বস্তা তিন মাসেই পচে নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো কোনো বস্তা পানিতে ভিজে ছিঁড়ে গেছে। বস্তার ভেতরে থাকা বালি ও সিমেন্ট বের হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধ নির্মাণের সময় তারা সঠিক নিয়মে বস্তায় বালি ও সিমেন্ট মেশাতে বললেও ঠিকাদারের লোকজন বেশি মুনাফার লোভে তা করেনি। গত জুনেই তড়িঘড়ি করে নিম্নমানের পাটের বস্তা দিয়ে নির্মাণকাজ শেষ করে বিল তুলে নিয়ে যায় তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা মরিয়ম বেগম বলেন, ‘আমাগো গাঙের পাড়ে পাডের বস্তায় নরমাল বালি ও কম সিমেন্ট দিয়ে বস্তা ভরে নদী বানছে। এখন তিন মাস যেতে না যেতেই বস্তা তো ছিঁড়ে গেছে। উন্নতমানের নতুন বস্তা দিয়ে কাজ করা হলে এক বছরেও এ বাঁধের বস্তার কিছু হইতো না।’
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী তানভীর ইসলাম বলেন, ‘টরকী নদীর তীর রক্ষা বাঁধে কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি। বাঁধ নির্মাণকাজের সময় টাস্কফোর্সের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে গুণগত মান যাচাই করার পরে তা দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়।’
মাদারীপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সানাউল কাদের খান বলেন, ‘আমি নিজে সরজমিনে গিয়ে দেখব। যদি নিম্নমানের সরকারি অন্য দপ্তরের পাটের বস্তা ব্যবহার করে নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয় তাহলে এসব বস্তার বিল কেটে নেয়া হবে।’
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ‘এই নদীর বাঁধের সব বস্তাই সরকারি খাদ্য অফিসের পুরনো পাটের বস্তা। তিন মাসেই বস্তাগুলো পচে নষ্ট হয়ে গেছে। পুরো কাজটি যদি জিও ব্যাগ ব্যবহার করে করত তাহলে এত সহজে নষ্ট হতো না। জিও ব্যাগ না ফেলে তো কম দামের পাটের বস্তা ফেলে টাকা লুটপাট করা হয়েছে। আমরা গাঙ পাড়ের মানুষ। বাঁধ যদি না টেকে, তাহলে আমাগো বাড়িঘরই নদীতে খেয়ে ফেলবে।’