অগ্নিদুর্ঘটনা ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজধানী ঢাকার বেশির ভাগ ভবন। কোথাও আগুন লাগলে বা বড় ভূমিকম্প হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নড়েচড়ে বসে। আবার কিছুদিন পর যেই সেই অবস্থা। মূলত ভবন নির্মাণ ও অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় না আনার কারণেই বাড়ছে নিয়মবহির্ভূত ভবনের সংখ্যা। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল ফাতাহ মামুন
সম্প্রতি ভূমিকম্পের ঘটনার বিল্ডিং কোড নিয়ে কথা হচ্ছে। আমাদের বিল্ডিং কোড এখন কী অবস্থায় রয়েছে? এটা যুগোপযোগী করার কোনো প্রয়োজন আছে?
১৯৯৩ সালে আমাদের দেশে প্রথম বিল্ডিং কোড প্রকাশিত হয়। হাউজ বিল্ডিং ইনস্টিটিউট এটা প্রকাশ করে। এর মেইন কনসালট্যান্ট ছিল বুয়েট। পরবর্তী সময়ে ২০০৬ সালের ১৫ নভেম্বর এটার গেজেট হয়। এরপর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এটার দ্বিতীয় সংস্করণ হয়। তার মানে দাঁড়াল বাংলাদেশে বিল্ডিং কোড দুটি। একটি ১৯৯৩ সালের ও অন্যটি ২০২০ সালের। বিল্ডিং কোড অনেক বিস্তৃত একটি বিষয়। প্রথম অধ্যায়ে বলা আছে, এ কোড কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এ সম্পর্কিত গাইডলাইন। এক্ষেত্রে বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটা করলেই যে রাতারাতি সব বদলে যাবে এমনটা আমার মনে হয় না। আমাদের রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)—এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান আছে। বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের জন্য এগুলোই কিন্তু মূল হাতিয়ার। দ্বিতীয় চ্যাপ্টারে বলা আছে বিল্ডিংয়ের কনস্ট্রাকশন নিয়ে। একেবারে ডিটেইল বলা আছে—কংক্রিটের স্ট্রাকচারের জন্য কী কী করতে হবে। স্টিল স্ট্রাকচারে কী করতে হবে। ব্যাম্বু স্ট্রাকচার সম্পর্কে বলা আছে। তারপর মাটির বিষয়টা বলা আছে। আর ফায়ার বিষয়টাও খুব ভালোভাবে বলা হয়েছে। ইলেকট্রিক্যাল সেফটির বিষয়ও ডিটেইল বলা আছে। প্রধানত তিনটি সেফটি বিল্ডিং কোডে কভার করে। বিল্ডিং সেফটি, ফায়ার সেফটি ও ইলেকট্রিক্যাল সেফটি। ২০২০ সালের বিল্ডিং কোডে গ্রিন বিল্ডিং নিয়েও কিছু কথা বলা হয়েছে। বিল্ডিং কোড আপডেটের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন, বহির্বিশ্বে একটা সাইকেলে বিল্ডিং কোড আপডেট হয়। কোনো দেশে তিন বছর পরপর আবার কোনো দেশে পাঁচ বছর পরপর আপডেট হয়। আমাদের দেশে এ রকম কোনো সাইকেল এখনো নির্ধারণ হয়নি। আমরা ১৯৯৩ সালে একটা করেছিলাম। তারপর ২০২০ সালে আপডেট করেছি। এটা বোধ হয় একটা সাইকেলে নিয়ে আসা উচিত। এখনই একটা কমিটি করা যায়, প্রতি পাঁচ বছর পরপর বিল্ডিং কোড আপডেট করা হবে। এখন তো পাঁচ বছর চলেই গেছে। ২০৩০ সালে পরবর্তী আপডেট করা যেতে পারে।
আমাদের তো ইমারত নির্মাণ বিধিমালা আছে। এ বিধিমালা দিয়েই কি বিল্ডিং কোডের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না?
বিল্ডিং কোড থাকলে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা থাকার প্রয়োজন নেই। বিল্ডিং কোড ডিটেইল। ইমরাত নির্মাণ বিধিমালা এত ডিটেইল না। বরং কোথাও কোথাও বিল্ডিং কোডের সঙ্গে কনফ্লিক্ট করে। এই দ্বৈততা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
কিন্তু রাজউক যখন কোনো অভিযানে যায় তখন তো ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ধরেই অভিযান পরিচালনা করে।
রাজউক এমনটা করে। কিন্তু উচিত হচ্ছে বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা। আবারো বলছি, বিল্ডিং কোড থেকে রাজউক একটা গাইডলাইন তৈরি করতে পারে, সেটা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বা যে নামেই হোক, কিন্তু সেটা কোনোভাবেই বিল্ডিং কোডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না।
তাহলে বিল্ডিং কোড আরো সহজ করার কোনো উদ্যোগ নেয়া যায়?
বিল্ডিং কোড সহজ করার উপায় নেই। এইট হলো ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেকচার আর প্ল্যানারদের জন্য। এখানে সহজ করবে কাদের জন্য? ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য? এখানে তো সব টেকনিক্যাল টার্ম। ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য এটা সহজ করার প্রয়োজন নেই। রাজউকের যারা অথরাইজড অফিসার বা ফিল্ড লেভেলে যারা কাজ করেন তারাও তো দশ বছর আগে পড়ে এসেছেন। নতুন যে চেঞ্জগুলো আসছে তারা কিন্তু টের পায় না। সারা বিশ্বে যেটা হয়, আমি ইন্ডিয়ায়ও দেখেছি, নতুন যে চেঞ্জ আসে, সেটা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হয়।
কোথাও আগুন লাগলে, ভবন ধসে পড়লে রাজউক নড়েচড়ে বসে। প্রশ্ন উঠছে, রাজউকের সামনে দিয়ে নিয়মবহির্ভূত ভবন দাঁড়িয়ে গেল এবং আগুনে শত শত মানুষ মারা গেল, এ জন্য কি রাজউকের চেয়ারম্যান-মেম্বার বা অফিসাররা শাস্তির আওতায় আসবেন না?
ইনস্টিটিউশনাল এথিকস বলে একটা কথা আছে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা গত বছর লস অ্যাঞ্জেলেস সিটিতে গিয়েছিলাম। সিটির যে বিল্ডিং অফিসার আছেন তিনি জানালেন, তার অফিসে পুলিশ ডিডেক্টিভ আছে। কেউ যদি অভিযোগ দেয় যে বিল্ডিং অফিসার দুর্নীতি করেছে, ওই ডিটেক্টিভ সরাসরি পুলিশকে জানিয়ে দেয়। অভিযুক্তকেও জানায় না। ওই অফিসের প্রধানকেও জানায় না। সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্ত সাসপেন্ড হয়ে যায়। আমরা কী দেখেছি, আমাদের দেশে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রাজউকের চেয়ারম্যান বা কোনো কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশনের মেয়র বা নির্বাহী প্রধান, ফায়ার সার্ভিসের কোনো কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে? কখনো হয়নি। পুলিশ কেস করে নাগরিকদের বিরুদ্ধে। বিল্ডিংয়ের মালিক বা যারা বিল্ডিং ভাড়া নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা করে। ভবন নির্মাণে যদি কোনো ত্রুটি থাকে তাহলে তো বড় দোষী রাজউকের ইন্সপেক্টর, রাজউক অথরাইজড অফিসার, সিটি করপোরেশনের অফিসার যিনি ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছেন, হোল্ডিং নম্বর দিয়েছেন, ফায়ার সার্ভিসের অফিসার যিনি বলেছেন কোনো অগ্নিঝুঁকি নেই। এ তিনজন অফিসার দায়িত্বপ্রাপ্ত। আমাদের দেশে যে এত ঘটনা ঘটছে, সব জায়গায় সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করা হচ্ছে। কোনো সরকারি অফিসারকে কি এখন পর্যন্ত আইনের আওতায় আনা হয়েছে? বিল্ডিংটা হয়তো কোনো থার্ড পার্টি বানাচ্ছে। কিন্তু এটা ঠিকমতো হচ্ছে কিনা এ বিষয়ে তো রাজউকের অথরাইজড অফিসার, সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং বা ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুকারী অফিসার এবং ফায়ার অফিসারের দেখার দায়িত্ব। তাদের দায়িত্বে যদি কোনো ঘাটতি থাকে, সঙ্গে সঙ্গে এ অফিসারদের নামে পুলিশ কেস করে তাদের সাসপেন্ড করতে হবে। কোনো ঘটনা ঘটার পর সেখানে ব্যানার টাঙিয়ে দিয়েই রাজউকের কাজ শেষ নয়। রেগুলার মনিটরিং করতে হবে।