সুন্দরবনের প্রান্তে শাকবাড়িয়া নদীর পানি তখন ভাটায় অনেকটাই নেমে গেছে। নদীর পাড়ে বিস্তৃত কাদার চর, আর ওপারে জেগে আছে সবুজ সীমান্ত। নৌকাযোগে সেই বনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছেন ৪০ বছর বয়সী সুরঞ্জন রপ্তান। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে ভেষজ চিকিৎসা করছেন তিনি। বন থেকে পাতা, শিকড় আর গাছের ছাল সংগ্রহ করে তৈরি করেন নানা ভেষজ ওষুধ।
সুরঞ্জন এ বিদ্যা শিখেছেন তার বাবার কাছ থেকে, আর তার বাবা শিখেছিলেন দাদার কাছ থেকে। কোনো বই বা লিখিত নথি নয়—বছরের পর বছর দেখে, শুনে ও চর্চার মধ্য দিয়ে কোন গাছ কোথায় পাওয়া যায়, কোন অংশ কীভাবে সংগ্রহ করতে হয় এবং তা কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেই জ্ঞান প্রবাহমান থেকেছে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তনের দরুন এখন সেই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার প্রাকৃতিক উপাদানগুলোই ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে।
সুরঞ্জনের চোখে সুন্দরবন আর আগের মতো নেই। বনের এ পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্ট ধরা পড়ে ঔষধি উদ্ভিদের অপ্রাপ্যতায়। ২০০৯ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র আগে বন এত ঘন ছিল যে অনেক এলাকার মাটিতে সূর্যের আলো পৌঁছাত না। এরপর ধীরে ধীরে বন পাতলা হতে শুরু করে। ২০১৫-১৬ সালের দিকে এ পরিবর্তন আরো মারাত্মক রূপ নেয়, কঠিন হয়ে পড়ে পরিচিত ঔষধি গাছ খুঁজে পাওয়া। যে নির্দিষ্ট গাছটি সুরঞ্জন খুঁজছেন, আগেরবার এসেও সেটি পাননি; তার আশঙ্কা—গাছটি হয়তো ওই এলাকা থেকে চিরতরে হারিয়েই গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমাগত বাড়তে থাকা লবণাক্ততা এ সংকটকে আরো তীব্র করছে। ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে সুন্দরবনের জোয়ারের পানিতে লবণের পরিমাণ প্রতি হাজার লিটারে ২১ থেকে বেড়ে ৩৩ গ্রামে পৌঁছেছে। একই সময়ে মাটির লবণাক্ততা বেড়েছে ৩১ শতাংশ। ফলে সুন্দরীসহ বনের বেশ কিছু প্রজাতি কমছে, কোথাও কোথাও বাইন গাছও ফুল ফোটানো বন্ধ করে দিয়েছে। স্বভাবতই ঔষধি গাছগুলোও আর সহজে মিলছে না।
সুরঞ্জন অবশ্য গাছ সংগ্রহের সময় যতটা সম্ভব যত্নশীল থাকেন। গাছের পুরো অংশ উপড়ে না ফেলে প্রয়োজন অনুযায়ী কেবল পাতা বা লতা কাটেন, যাতে তা আবার বাড়তে পারে। ছাল তোলার সময়ও খেয়াল রাখেন যেন কান্ডের ভেতরের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কিন্তু প্রকৃতির এমন রুক্ষ পরিবর্তনের সামনে মানুষের এ সতর্কতা বড্ড অসহায়। সুরঞ্জনের ভাষায়, আগে জোয়ারের সময় বনের উঁচু জায়গাগুলো ডুবত না। এখন অতিরিক্ত লবণাক্ত পানিতে সেই উঁচু এলাকাগুলোও তলিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে গাছ মারা যাচ্ছে।
রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স ও প্ল্যান্ট ব্রিডিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আবদুর রহিমের মতে, লবণাক্ততা ধীরে ধীরে বনের উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের স্বাভাবিক ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। লবণসহিষ্ণু গাছগুলো কোনোভাবে টিকে থাকলেও কবিরাজদের ব্যবহৃত সংবেদনশীল ঔষধি উদ্ভিদগুলো দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
এর সরাসরি প্রভাব দেখা যায় বাইন ফুলের মৌসুমেও। সুরঞ্জনের চাচা চাপল রপ্তান বুনো মধু সংগ্রহ করেন। তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, এ বছর বাইন গাছে একটি ফুলও ফোটেনি; ফলে মিলেনি বাইন ফুলের মধু। বনে বছরের পর বছর যাতায়াত করা মানুষদের কাছে এটি শুধু মধুর সংকট নয়, বরং পরিচিত প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হওয়ার অশুভ ইঙ্গিত।
এ পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ভেষজ চিকিৎসকদের জীবিকাতেও। ২০ বছর আগে সুরঞ্জনের বাড়িতে প্রতিদিন রোগীর ভিড় লেগেই থাকত, যা এখন একেবারেই কমে গেছে। একদিকে ঔষধি গাছের আকাল, অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক, আধুনিক চিকিৎসক ও ওষুধের দোকানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া—সব মিলিয়ে তরুণ প্রজন্ম এখন আধুনিক চিকিৎসার দিকে বেশি ঝুঁকছে। তবে দরিদ্র ও দুর্গম অঞ্চলের বহু মানুষের কাছে কবিরাজ এখনো সহজলভ্য এবং নির্ভরযোগ্য একটি আশ্রয়। তবে কয়রার স্থানীয় বাসিন্দা দীপা মণ্ডলের কাছে সুরঞ্জন সেই ভরসারই নাম। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তিনি প্রথমেই সুরঞ্জনের দ্বারে যান। কারণ শহরে গিয়ে ভালো চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে মোটা অঙ্কের অর্থ লাগে, ক্লিনিকও বেশ দূরে। বেসরকারি চিকিৎসার পরামর্শ ফি-এর সঙ্গে যুক্ত হয় ওষুধ ও যাতায়াতের বাড়তি ব্যয়।
সব ছাপিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ধরে রাখার মতো মানুষের সংখ্যা দিন দিন ফুরিয়ে আসছে। ৬৫ বছর বয়সী আরেক ভেষজ চিকিৎসক প্রভাত সারদার দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে এ পেশায় আছেন। তার দাদাও এ পেশায় ছিলেন; কিন্তু নিজের পর এই ধারা অব্যাহত রাখার মতো কাউকে তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। একসময় যে ঔষধি গাছগুলো হাতের কাছেই পাওয়া যেত, এখন তার অনেক কিছুই সংগ্রহ করতে হয় দূর-দূরান্তের জেলা বা নার্সারি থেকে। তার ঝুলিতে থাকা শুকনো পাতার সংগ্রহও আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। প্রভাতের উদ্বেগ এখন নিজের পেশার চেয়ে রোগীদের নিয়ে—বন থেকে ভেষজ উপাদান হারিয়ে গেলে একদিন হয়তো তাদের দেয়ার মতো কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।
ভেষজ চিকিৎসকদের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হচ্ছে শতবর্ষের ভেষজ জ্ঞানও। প্রভাত সারদারের স্মৃতিতে থাকা আশপাশের অনেক ভেষজ চিকিৎসক আজ আর বেঁচে নেই, তাদের শিষ্যরাও ভিন্ন পেশায় ছিটকে গেছেন। সুরঞ্জনের হিসাব মতে, তার বাবার সময়ে কয়রায় প্রায় ৮ থেকে ১০ জন ভেষজ চিকিৎসক সক্রিয় ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে মাত্র তিনজন টিকে আছেন। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তিনি কেবল নিজের এক ভাগনেকেই এ কাজে আগ্রহী দেখছেন। সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্যানুযায়ী, বরগুনার ভেষজ চিকিৎসক ১৮ দশমিক ৫ শতাংশের বয়সই ষাটোর্দ্ধ এবং তাদের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশের ক্ষেত্রে পারিবারিকভাবে এ বিদ্যা শেখার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সারদার নাসির উদ্দীনও নিজ পরিবারে এ রূপান্তর প্রত্যক্ষ করেছেন। তার দাদা ভেষজ চিকিৎসক ছিলেন, তবে তার বাবা বেছে নিয়েছিলেন অন্য পেশা। শৈশবে বাড়ির আঙিনায় তুলসী ও বাসকের মতো যেসব গাছ হরহামেশাই দেখা যেত, তা এখন অনেক জায়গা থেকেই উধাও। তার মতে, সুন্দরবন ঔষধি উদ্ভিদের এক অশেষ ভাণ্ডার, অথচ বৈজ্ঞানিকভাবে তাদের কার্যকারিতা ও সম্ভাবনা পুরোপুরি অনুধাবনের আগেই অনেক প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে।
কাজেই এই ক্ষতি কেবল কোনো নির্দিষ্ট বন বা চিকিৎসা পদ্ধতির নয়; বরং হারিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় জনপদের বহু প্রজন্মের ইতিহাস, আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক সংস্থাও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, স্থানীয় জ্ঞান এবং জীববৈচিত্র্যের এই ক্ষতিকে জলবায়ু পরিবর্তনের এমন এক ‘অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা কখনোই অর্থের অংকে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
সুরঞ্জন ও প্রভাত—দুই ভেষজ চিকিৎসকের আশঙ্কাই এক: তাদের প্রজন্মের প্রস্থানের সঙ্গেই হয়তো হারিয়ে যাবে এই ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাজ্ঞান। এ প্রেক্ষাপটে ড. নাসির উদ্দীনের খেদোক্তিটিই সত্য হয়ে দেখা দেয়—‘একজন অভিজ্ঞ ভেষজ চিকিৎসকের মৃত্যু মানে আস্ত একটি লাইব্রেরি পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া।’
তা সত্ত্বেও হাল ছাড়েননি সুরঞ্জন। বাবার লাগানো শতাধিক ঔষধি গাছের বাগান আইলার নোনা পানিতে ভেসে গেলেও, এখন তিনি বাড়ির উঠানে প্লাস্টিকের টবে নতুন করে চারা রোপণ করছেন। ২ হাজার লিটারের একটি ট্যাংকে জমাচ্ছেন বৃষ্টির পানি। কোনো কোনো গাছের ডাল শুকিয়ে গেছে, পাতাগুলো কুঁকড়ে ছোট হয়ে এসেছে, তবু প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে রোপণ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। যদি বর্ষায় লবণাক্ততা কিছুটা কমে, তবে গাছগুলো টিকে যাবে—এই এক চিলতে আশা নিয়েই তার পথচলা।