দেশের নদীভাঙন কবলিত জেলাগুলোর মধ্যে গাইবান্ধা একটি। নদ-নদীবেষ্টিত চারটি উপজেলায় ১৬৫টি চর ও দ্বীপ চর রয়েছে। বিগত নির্বাচনগুলোয় নদীভাঙন রোধে টেকসই ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে সেটি পাননি চরের বাসিন্দারা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চরাঞ্চলে প্রার্থীদের যাতায়াত বেড়েছে। সভা-সমাবেশে দিচ্ছেন বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি। তবে এবার আশ্বাস নয়, বাস্তব পরিকল্পনা চান জেলা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র আর যমুনার চরের মানুষ।
তারা বলছেন, চরাঞ্চলে ভোটের রায় নির্ভর করছে বিজ্ঞানসম্মত= নদী খনন, ভাঙন রোধ আর ব্রহ্মপুত্র নদে সেতু কিংবা টানেল নির্মাণের ওপর। ভোটের সময় এলেই আলোচনায় আসে উন্নয়ন। কিন্তু চরাঞ্চলের মানুষের কাছে উন্নয়ন মানে কোনো স্লোগান নয়, এটি টিকে থাকার প্রশ্ন। চরে বসবাসকারী মানুষের ভোট ভাবনায় এবার স্পষ্ট তিনটি দাবি—চরকেন্দ্রিক কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা, বিজ্ঞানসম্মত নদী খনন, ভাঙন রোধ আর ব্রহ্মপুত্র নদে সেতু কিংবা টানেল।
চরাঞ্চলের ভোটাররা বলছেন, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তা নদ-নদীবেষ্টিত গাইবান্ধার সাধারণ মানুষের কাছে এবারের নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীভাঙন রোধ ও চরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের অবহেলিত উন্নয়ন। প্রতি বছর নদীভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো মানুষ। ফলে এবার ভোটাররা এমন প্রার্থীই বেছে নিতে চান, যিনি এসব সমস্যার স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান দিতে পারবেন।
চরের বড় একটি অংশ পড়েছে সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলা নিয়ে গঠিত গাইবান্ধা-৫ আসনে। সেখানে ভোটার রয়েছেন ৩ লাখ ৮৫ হাজার ২৬১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৯২ হাজার ২৭৭ ও নারী ১ লাখ ৯২ হাজার ৯৮১ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন তিনজন।
ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর দুই পাড়ের মানুষ বছরের পর বছর ধরে ভাঙা গড়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি। সামর্থ্যবানরা বসতভিটা সরিয়ে নিতে পারলেও অসচ্ছলরা অন্যের জমিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
গাইবান্ধা-৫ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফারুক আলম সরকার তার উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নদীর তীর সংরক্ষণের মাধ্যমে নদীকে মানুষের অভিশাপ নয়, আশীর্বাদে পরিণত করা হবে। চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।’
ব্রহ্মপুত্রের অর্ধশতাধিক চরে বছরে প্রায় দুই লাখ টনের বেশি বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চরাঞ্চলে নেই উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, হাসপাতাল কিংবা মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নাজুক; অধিকাংশ চরে নেই কোনো পুলিশ ফাঁড়ি। নদের কিছু কিছু স্থানে বাঁধের প্রতিরক্ষাকাজ শুরু হলেও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বাকি অংশগুলোয় প্রতি বছরই দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ ভাঙন। টেকসই বাঁধ ও নদী শাসন পরিকল্পনার অভাবেই এ দুর্ভোগ বছরের পর বছর চলছে।
ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামের আব্দুল মমিন মিয়া বলেন, ‘আমরা যারা চরে বাস করি, তারা সবসময় অবহেলিত। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা নদীভাঙন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। ক্ষমতায় যেই আসুক নদীভাঙন রোধ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে।’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে এ আসনে নির্বাচন করছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা ওয়ারেছ আলী। তিনি জানান, নির্বাচিত হলে নদীভাঙন রোধের পাশাপাশি চরাঞ্চলে পশুপালন কেন্দ্র, পুলিশ ফাঁড়ি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া বালাসী থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত টানেল বা সেতু নির্মাণ এবং ট্যানারি ও জুট মিল স্থাপনের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
আসনটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন আলহাজ নাহিদুজ্জামান নিশাদ। নদীভাঙনকে সাঘাটা-ফুলছড়ি এলাকার অস্তিত্বের সংকট উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়, বরং বাঁচা মরার প্রশ্ন। আমি নির্বাচিত হলে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনায় স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং ভাঙনকবলিত পরিবারদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেব।’
এছাড়া চরাঞ্চলের কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক করতে কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার, হিমাগার ও সরাসরি বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। প্রতিটি বড় চরে পুলিশ ফাঁড়ি, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা চালুর কথা জানান। পাশাপাশি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত প্রশাসন, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চরাঞ্চলকে আলাদা উন্নয়ন অঞ্চলে রূপান্তরের পরিকল্পনাও রয়েছে তার।