খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

কেবল নামেই ক্যান্সার বিভাগ মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ক্যান্সার রোগীদের অন্যতম প্রধান ভরসা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

শুধু খুলনা বিভাগই নয়, বরিশাল ও রাজশাহী থেকেও প্রতিদিন অসংখ্য রোগী আসে এখানে। কিন্তু জনবল, অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংকটে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, খুলনা মেডিকেলের গুরুত্বপূর্ণ এ বিভাগে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা না থাকায় দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। শুধু আউটডোরে চিকিৎসা নিয়েই ফিরে যেতে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টকর ও ব্যয়বহুল।

রোগী ও তাদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, নানা দুর্ভোগের মধ্যে এখানে ক্যান্সার রোগীদের অত্যাবশ্যকীয় কেমোথেরাপি সেবার সংকট প্রকট। ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে কেমোথেরাপি বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে পাওয়া গেলেও খুলনা মেডিকেলে গুনতে হয় মোটা অংকের টাকা। এছাড়া এখানকার কর্মরত চিকিৎসকদের অধিকাংশই বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় রোগীদের সেখানে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আল মাসুম খান বলেন, ‘খুলনা মেডিকেলের ক্যান্সার বিভাগ শুধু নামেই চলছে, কাঙ্ক্ষিত সেবা নেই। এ বিভাগে কর্মরতরা একই স্থানে দীর্ঘদিন চাকরি করায় একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। কমিশন বাণিজ্যের কারণে সরকারি সেবার চেয়ে তারা বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালগুলোতে রোগী পাঠাতে বেশি মনোযোগী।

অবশ্য চিকিৎসকদের বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এড়িয়ে প্রায় ১০ বছরেরও বেশি সময় একই স্থানে কর্মরত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. মুকিদুল হুদা দাবি করেন, তার বিভাগে আটজন চিকিৎসক এবং ২৪ জন লোকবল রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। প্রয়োজনীয় লোকবল, অবকাঠামো ও মেশিনপত্র সংকটের পরও বছরে তারা প্রায় দুই হাজার রোগীকে সেবা দিচ্ছেন।

বংশগত, পরিবেশগত ও কিছু জীবনাচরণের কারণেই ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এ অঞ্চলে ঊর্ধ্বমুখী। তবে ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যাই আমরা বেশি পাচ্ছি। আমাদের নিজস্ব ইনডোর নেই। যে কারণে এখানে রোগী ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। তার পরও জটিল কিছু ক্ষেত্রে রোগীদের হাসপাতালের অন্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। ব্লাড ক্যান্সার বাদে অন্য রোগীদের এখানে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে।

চিকিৎসক মুকিদুল বলেন, ‘প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটর (রেডিওথেরাপি) মেশিনটি দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে বাক্সবন্দি অবস্থায় ভবনের প্রবেশমুখে ফেলে রাখায় যন্ত্রটির মেয়াদ শেষ হয়ে কার্যত এখন তা লোহা-যন্ত্রাংশে পরিণত হয়েছে। ২০১১ সালে কেনা মেশিনটি ২০১২ সালের মে মাসে এখানে পৌঁছলেও তা স্থাপন করা যায়নি। মেশিনটি স্থাপন না হওয়ায় এখানকার রোগীদের ঢাকা বা দেশের বাইরে যেতে হচ্ছে।’

মেশিনটি স্থাপন না হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মেশিনটি কেনার সময় অবকাঠামোগত প্রস্তুতি না থাকার বিষয়টি জেনেও তখন তা উপেক্ষা করা হয়। প্রয়োজনীয় সুরক্ষিত বাংকারই নির্মাণ করা যায়নি। বাংকার নির্মাণের জন্য প্রায় ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও ভবনে বাংকার করার সুযোগ না থাকায় সেই অর্থ ফেরত যায়।

তবে আশার কথা হচ্ছে, হাসপাতালের বর্তমান ক্যান্সার চিকিৎসা ভবনের পাশেই বিভাগীয় ক্যান্সার হাসপাতালের নির্মাণকাজ চলমান। প্রকল্পের আওতায় দুটি বেজমেন্টসহ ১৫ তলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এখানে ৪৫০টি শয্যা চালু হবে। এর মধ্যে ১৮২টি শয্যা ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য এবং বাকিগুলো হৃদরোগ ও কিডনি চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হবে।

গণপূর্ত ও স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগের পৃথক তিনটি ইউনিট চালুর প্রেক্ষাপটে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পে হাসপাতালের বহির্বিভাগের পেছনে ২৩ হাজার ২৫০ দশমিক ৪৬ বর্গমিটার জমি নির্ধারণ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ভবন নির্মাণের জন্য এমবিপিএল ও এসএনবিপিএল (জেভি) ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গণপূর্ত বিভাগের চুক্তি হয় ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর। ২৮০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২২টি প্যাকেজে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে।

গণপূর্ত বিভাগ খুলনা-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান বলেন, ‘নানা কারণে প্রকল্পের কাজ শেষ হতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে, মেয়াদ বেড়েছে। তবে বর্তমানে দ্রুতগতিতে কাজ এগোচ্ছে। প্রকল্পের মূল ভবন নির্মাণের অবকাঠামোগত কাজের ৯৫ শতাংশেরও বেশি সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’

সার্বিক বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক কাজী আইনুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালে জনবল সংকটসহ নানা সমস্যা রয়েছে। সেই ৫০০ শয্যার জনবল দিয়েই এখনো কার্যক্রম চলছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি রোগী থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি ২০২৫ সালের আগস্টে যোগদানের পর সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

আইনুল আরো বলেন, ‘২০১২ সাল থেকে হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগের লিনিয়ার এক্সিলারেটর (রেডিওথেরাপি) মেশিনটি বাক্সবন্দি অবস্থায় থাকায় ক্যান্সার রোগীদের সেবা কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহলকে আমরা অনেকবার জানিয়েছি।’

আরও