জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট

জনবল ও ওষুধ সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা

জনবল ও ওষুধ সংকটে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। দেশে অগ্নিদগ্ধ রোগীদের প্রধান ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিত এ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।

কিন্তু সে অনুপাতে বাড়েনি চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক জনবল। অনুমোদিত পদের বিপরীতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শূন্য পদ থাকায় বিদ্যমান জনবল দিয়েই বাড়তি চাপ সামাল দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ওষুধ সংকট পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে। ফলে জরুরি সেবা থেকে শুরু করে নিয়মিত চিকিৎসা কার্যক্রম—সব ক্ষেত্রেই তৈরি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ হাসপাতালে না পেয়ে রোগীর স্বজনদের বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা শুরুতে বিলম্ব হচ্ছে এবং ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি হয়ে উঠছে বড় ধরনের চাপ।

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত বার্ন চিকিৎসা কেন্দ্র। গুরুতর দগ্ধ রোগীরা এখানে উন্নত চিকিৎসা পাচ্ছে, যা আগে অনেক ক্ষেত্রে দেশের বাইরে নেয়া হতো। বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনার সময় এটি জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক মাস ধরে হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের সরবরাহ না থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এতে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য চিকিৎসা ব্যয় বহন করা আরো কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব ওষুধ সংগ্রহ করতে না পারায় চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে।

নয় বছর বয়সী বালক নাওল। হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছিল সে। সঙ্গে ছিলেন বাবা শরিফুল হাসান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ছেলের পায়ে গরম তেল পড়ে পুড়ে যায়। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা করাতে নিয়ে আসি। নার্স ও চিকিৎসকরা যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গেই চিকিৎসা দেন। ব্যথানাশক, ব্যান্ডেজ, আনুষঙ্গিক অন্যান্য জিনিসপত্রসহ বেশকিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাসপাতালটির ওষুধ সংকট নিরসনে প্রথমেই প্রয়োজন চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনা। বছরে রোগীর সংখ্যা ও রোগের ধরন বিশ্লেষণ করে আগাম ওষুধ ক্রয় ও মজুদ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বাড়ানো জরুরি, যাতে টেন্ডার জটিলতা বা প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে ওষুধ সরবরাহে বিঘ্ন না ঘটে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সর্বশেষ প্রকাশিত হেলথ বুলেটিন অনুসারে, ২০২৪ সালে হাসপাতালটিতে বহির্বিভাগে মোট চিকিৎসা নেয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ৮৫ হাজার ১৭৯ এবং জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ১৬ হাজার ৫৭১ জন। ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৭৩৫। একই সময়ে হাসপাতালটিতে মোট অস্ত্রোপচার হয়েছে ১১ হাজার ৩০২ জনের। হাসপাতালটির শয্যা সংখ্যা ৫০০। এর মধ্যে শয্যা পরিপূর্ণ থাকার হার (বিওআর) শতভাগ।

অন্যদিকে ২০২৩ সালে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ৭২ হাজার ১৫২ জন। এর মধ্যে জরুরি বিভাগে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেয়া রোগীর সংখ্যা ১২ হাজার ৯১২। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৬ হাজার ৬৫ জন। বছরের পুরো সময়ে হাসপাতালটির সব শয্যাই পূর্ণ ছিল।

রোগী বাড়লেও সে অনুপাতে চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক জনবলের সংখ্যা বাড়েনি। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট ও প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে, হাসপাতালটিতে ৫০০ শয্যার বিপরীতে চিকিৎসকদের জন্য অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৪৬৮। এর মধ্যে পদায়নকৃত পদের সংখ্যা ২৪২ এবং শূন্যপদ রয়েছে ২২৬টি। প্রায় ৫০ শতাংশ পদই শূন্য।

তীব্র সংকট রয়েছে নার্সেরও। নার্সের জন্য মোট পদ ৬৫৬টি। এর মধ্যে নিযুক্ত জনবলের সংখ্যা ৫২৫। তবে নিযুক্ত জনবলের মধ্যে শিক্ষা ছুটিতে আছেন ৬৯ জন। বিভিন্ন হাসপাতালে সংযুক্তিতে কর্মরত ১২ জন, দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ১০ জন এবং মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন ২৫ জন। অর্থাৎ বর্তমানে হাসপাতালটিতে কর্মরত ৪০৯ জন। ফলে জনবল ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৪৭ জনে।

এছাড়া হাসপাতালটিতে আইসিইউ শয্যা রয়েছে ২০টি। প্রতি শয্যার বিপরীতে তিনজন করে অন্তত ৬০ জন নার্স থাকা উচিত। অথচ দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ২৩ জন।

সার্বিক বিষয়ে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট ও প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক মারুফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরেই ওষুধের সংকট রয়েছে। কিছু ওষুধ টেন্ডারের মাধ্যমে বাইরে থেকে আনা হয়। সেগুলো আসতে সময় নিয়েছে। এ কারণে ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। এখানে যারা ইন্টার্ন চিকিৎসক রয়েছেন, তারাও চিকিৎসাকাজে নিয়োজিত। আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেগুলো আমরা সমাধানের চেষ্টা করছি। পাশাপাশি নিজেদের সাধ্যমতো রোগীদের সম্পূর্ণ সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি।’

আরও