জলবায়ু রূপান্তরের এ সময়ে পরিবেশ রক্ষায় পরস্পর সংযুক্ত ও সমন্বিত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কান্ট্রি ডিরেক্টর চিংফেং ঝাং।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক আয়োজনের প্যানেল আলোচনায় আজ তিনি এসব কথা বলেন।
চিংফেং ঝাং বলেন, পরিবেশ রক্ষায় কতগুলো সমন্বিত পদেক্ষপ নিতে হবে। সড়কের সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকতে হবে; শহরের খালগুলোকে কার্যকর রাখতে হবে, পয়ঃবর্জ্য শোধন ও সুনির্দিষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে; এবং কৃষির জন্য উর্বর মাটি ও নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। নদী পুনরুদ্ধার করতে হলে উৎসমুখেই দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নদী অববাহিকা, শহর ও উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে যুক্ত করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে নির্মাণের পাশাপাশি তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও অর্থায়ন নির্দিষ্ট থাকবে।
তিনি বলেন, এডিবির ২৫ কোটি ডলারের ‘উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহনশীলতা প্রকল্প’ বিশ্বের ২২টি শহরে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলাশয় পুনরুজ্জীবন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। অভিযোজন এবং পরিবেশগত সেবা কীভাবে একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে, এ প্রকল্প তার একটি বাস্তব উদাহরণ।
এডিবির এ কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেন, বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু সহনশীলতার অর্থ হলো বিগত কয়েক দশকের অর্জন রক্ষা করা এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা। নিম্নভূমি বেষ্টিত এই বদ্বীপ এলাকা, ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি এবং মৌসুমি বৃষ্টির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা ও তীব্র দাবদাহের মতো দুর্যোগের প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। একটি ছোট্ট ভূখণ্ডে প্রায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ মানুষের বসবাসের ফলে এই ঝুঁকিগুলো একসঙ্গে আমাদের খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানকে হুমকির মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে এগুলো জমি ও নাগরিক সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে; যা মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে, দারিদ্র্যকে গভীরতর করছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করছে।
তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশে বার্ষিক গড় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত অভ্যন্তরীণ অভিবাসীর সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ১ কোটি ৩৩ লাখে। সেজন্য সহনশীলতার কথা মাথায় রেখে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে। ধারাবাহিক উদ্যোগ কী ধরনের সাফল্য এনে দিতে পারে, বাংলাদেশ তা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে, ১৯৭০ সালের পর থেকে ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুর হার শতগুণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। একটি সহনশীল অর্থনীতি গড়ার ক্ষেত্রেও আমাদের একই ধরনের দৃঢ়সংকল্প নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার প্রধান চালিকাশক্তি করা উচিত বলেও মনে করেন এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর। তিনি বলেন, আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আমাদের ব্যবসা ও সরকারি অর্থায়নকে মূল্যের অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট যা আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। ছাদের সৌরবিদ্যুৎ (রুপটপ সোলার), শক্তিশালী গ্রিড, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গ্যাসের অপচয় কমানোর মাধ্যমে আমরা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাও সুদৃঢ় করতে পারি। বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে স্বচ্ছ নীতিমালা, নির্ভরযোগ্য অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা এবং অর্থায়নযোগ্য প্রকল্প প্রয়োজন। এডিবি ২০ কোটি ডলারের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে এই রূপান্তরে সহায়তা প্রদান করছে।
তিনি আরো বলেন, নীতিগত প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তব বিনিয়োগ ও ফলাফলে রূপান্তর করা দরকার। এডিবি ‘জলবায়ু-সহনশীল অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কর্মসূচি’র প্রথম দুই ধাপে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে সহায়তার জন্য ৮০ কোটি ডলার অনুমোদন করেছে। তবে এর সঠিক বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সক্ষম প্রতিষ্ঠান, নিখুঁত প্রকল্প প্রস্তুতি, স্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া এবং কার্যকর পরিবেশগত সুরক্ষার ওপর। আইনের সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক প্রয়োগ পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, রিসাইক্লিং এবং সহনশীল কৃষি-ব্যবসায়ে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে।
এডিবি বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে সবসময় প্রস্তুত বলেও জানান চিংফেং ঝাং। তিনি বলেন, সরকারের নেতৃত্বাধীন ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ’র মাধ্যমে আমরা সমন্বয় জোরদার করতে পারি এবং বিনিয়োগ উপযোগী প্রকল্প তৈরি করতে পারি। সরকারি ও সহজ শর্তের অর্থায়ন যেন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়, পাশাপাশি তা যেন বেসরকারি মূলধন আহরণেও সাহায্য করে। বাংলাদেশ যখন কপ-৩১ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী জলবায়ু অর্থায়নের দাবির পেছনে স্পষ্ট বিনিয়োগ অগ্রাধিকার এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফলের রূপরেখা থাকা উচিত। আমাদের চূড়ান্ত সাফল্য হবে বিষমুক্ত বাতাস ও পরিষ্কার পানি, উর্বর মাটি, নিরাপদ সমাজ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সেই ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এবং তার অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে এডিবি সব সময় প্রস্তুত।