মৌলভীবাজারে অবৈধ ইটভাটায় বিপর্যস্ত শিক্ষা কার্যক্রম

হুমকিতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

মৌলভীবাজারের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে ইটভাটা। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদনহীন এসব ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া-ধুলায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা।

মৌলভীবাজারের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে ইটভাটা। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদনহীন এসব ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া-ধুলায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী স্থানীয়রা। পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে কমে গেছে ফসল উৎপাদন। এর মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে রয়েছে ছয়টি ইটভাটা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে থাকা এসব ভাটা বন্ধ করতে পরিবেশ অধিদপ্তর সময় বেঁধে দিলেও কর্ণপাত করছেন না প্রভাবশালী মালিকরা।

পরিবেশ অধিদপ্তর মৌলভীবাজার কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় ৬৭টি ভাটা রয়েছে। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বাতিল করা হয়েছে ১৪টির। অনুমোদনহীন ইটভাটার মধ্যে ছয়টি রয়েছে বড়লেখা উপজেলায়। মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় রয়েছে তিনটি। কমলগঞ্জ রয়েছে চারটি। এছাড়া কুলাউড়া উপজেলার দক্ষিণবাজার এলাকায় একটি।

অবৈধ এসব ইটভাটার মধ্যে স্কুল, কলেজ মাদ্রাসার পাশে রয়েছে ছয়টি ইটভাটা। এর মধ্যে চারটি কমলগঞ্জে। উপজেলার পতনউষার ইউনিয়নের বৃন্দাবনপুর (পালিত কোনা) এলাকায় এসকে ব্রিকস, মুন্সীবাজার এলাকায় এমএমবি ব্রিকস সাবারী ব্রিকস এবং আলীনগর ইউনিয়নের জালালিয়া গ্রামে সেসার্স মহসীন ব্রিকস। বাকি দুটি বড়লেখার কালীমন্দির এলাকায় ষাটমা ব্রিকস এবং সদর উপজেলার আমতৈল ইউনিয়নের অলহা গ্রামে মেসার্স এসএমএ ব্রিকস। ভাটাগুলো পরিবেশের ক্ষতি জনস্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলেছে। চলতি ইট পোড়ানো মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই ভাটাগুলো বন্ধ করতে নির্দেশ দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু নির্ধারিত সময় অতিক্রম হলেও ইট পোড়ানো হচ্ছে ভাটায়।

সরেজমিন কমলগঞ্জের অবৈধ কয়েকটি ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায়, আলীনগর ইউনিয়নের জালালীয় গ্রামে মহসীন ব্রিকসের পাশেই রয়েছে বেগম জেবুন্নেছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ে প্রবেশ পথের দুই পাশে উঁচু করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ইট। স্কুলের দেয়ালঘেঁষে কাঁচা ইট শুকানো হচ্ছে। বিদ্যালয়ের উঠানে শিশুদের খেলার জায়গায় ইটভাটার মাটি ফেলা হয়েছে। নব্বই দশকে যখন বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয় তখন ইটভাটাটি ছিল বেশ দূরে। ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ের পাশের সব জমিতে সম্প্রসারিত হয় ভাটার কার্যক্রম। ফলে বিদ্যালয়কে প্রায় ঘিরে ফেলেছে ভাটাটি।

শিক্ষার্থীরা জানায়, ইটভাটার কয়লা ভাঙার মেশিনের শব্দে তাদের পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটে। ধুলাবালিতে সর্দি-কাশি লেগেই আছে। তাদের অভিযোগ, স্কুলমাঠে তারা খেলতে পারে না। মাঠেই শ্রমিকরা মাটি ফেলে রেখেছেন। নিয়ে কিছু বললে শ্রমিকরা শিশুদের ধমক দেন।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নার্গিস আক্তার বলেন, বিষাক্ত ধুলা-ধোঁয়ার সঙ্গে মেশিনের শব্দে পাঠদান অত্যন্ত কষ্টকর। ভাটাশ্রমিকরা স্কুলের দেয়ালঘেঁষে মলমূত্র ত্যাগ করে পরিবেশ আরো অস্বাস্থকর করে ফেলেছেন। শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনা করে দ্রুত এটি সরানোর দাবি জানান তিনি।

একই অবস্থা উপজেলার পতনউষার ইউনিয়নের বৃন্দাবনপুর (পালিত কোনা) এলাকায়। এখানে ঘনবতিপূর্ণ এলাকা এবং বাহারের পাশেই গড়ে উঠেছে এসকে ব্রিকস। ইটভাটার পাশে রয়েছে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ইটভাটার ১০০ মিটারের মধ্যে রয়েছে আবুল ফজল চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয় আহমদনগর দাখিল মাদ্রাসা এবং বৃন্দাবনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানান, ইটভাটা নিয়ে অভিযোগ করতে করতে তারা এখন আশাহত। ধুলাধোঁয়া তো আছেই, এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত ইটভাটার মাটিভর্তি গাড়ি চলাচলের কারণে এখন এলাকাবাসীর চলাচল কঠিন। রয়েছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

এসকে ব্রিকসের মালিক ইব্রাহিম মিয়া দাবি করেন, আইন মেনেই তিনি ভাটার কার্যক্রম চালাচ্ছেন

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার মৌলভীবাজার জেলা সমন্বয়ক সালেহ সোহেল অবৈধ ভাটা বন্ধ করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর মৌলভীবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক বদরুল হুদা বলেন, জেলায় অবৈধ ১৪ ইটভাকে বিভিন্ন সময় জরিমানা করে বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে থাকা ছয়টি ভাটা বেশি ক্ষতি করছে। এগুলো বন্ধ করতে মালিকদের সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল কিন্তু তারা সরায়নি। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ অধিদপ্তর সদর দপ্তর থেকে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে। তার নেতৃত্বে অচিরেই অভিযান চালিয়ে বন্ধ করা হবে অবৈধ ভাটা।

আরও