একদিকে তুরাগ নদ আর অন্যদিকে টঙ্গী খাল। এর তীরঘেঁষা রাজধানীর বৃহৎ এলাকা উত্তরা। তিন দশক আগেও দিয়াবাড়ি, বাইলজুড়ি, ফায়দাবাদ ও কালাদিয়া খালসহ ছোট-বড় অনেক খাল প্রবাহিত ছিল এখানে। উত্তরার বড় অংশ ছিল প্লাবনভূমি। সরকারের ভুল পরিকল্পনায় একে একে ভরাট হতে থাকে খাল-বিল-প্লাবনভূমি, এমনকি নদীর অংশও। গত তিন দশকে সরকারি-বেসরকারি আবাসন প্রকল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের ফলে বদলে গেছে উত্তরার ভূমির চিত্র। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সুপারিশ সত্ত্বেও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়নি সরকার।
সম্প্রতি উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভয়াবহ যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনার পর আলোচনায় এসেছে উত্তরার ভূমি ব্যবহার বদলে যাওয়ার বিষয়টি। প্রশ্ন উঠেছে, ফ্লাইং জোনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন কীভাবে পাওয়া গেল। এছাড়া উত্তরায় আরো যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বড় বড় অবকাঠামো আর আবাসন প্রকল্পের অট্টালিকা গড়ে উঠেছে এসবের অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে উঠে এসেছে আলোচনায়।
নগর গবেষকরা বলেন, স্বাধীনতার আগে ঢাকার জন্য বিমানবন্দর ছিল তেজগাঁওয়ে। স্বাধীনতার পর ১৯৮০ সালে কুর্মিটোলায় বিমানবন্দর স্থানান্তর করা হয়। তখন উত্তরা ছিল ছোট ছোট কয়েকটি গ্রামে বিভক্ত। পুরো এলাকা ছিল পানির নিচে। বিমানবন্দর ছিল উঁচু এলাকায়। বিমানবন্দরের জন্য চারপাশে পানি থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা। সে হিসেবে কুর্মিটোলা উপযুক্ত জায়গা ছিল। কিন্তু ’৯০-এর দশকে ঢাকা রক্ষাবাঁধ বা বেড়িবাঁধ নির্মাণের পর থেকে বদলে যেতে থাকে এলাকার চিত্র। এখানে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলে। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে সরকারি আরো আবাসন প্রকল্প গড়ে ওঠার পাশাপাশি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হতে থাকে এ এলাকায়। এসব আবাসন ও অবকাঠামো পুরোটাই নির্মাণ হয়েছে প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করে। যে কারণে উত্তরার মতো আবাসিক এলাকায় বিভিন্ন দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়েছে অনেক বেশি।
উত্তরার প্রাকৃতিক জলাধার ভরাটের ক্ষেত্রে রাজউকের দুর্বলতা বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘রাজউকের প্রধান তিনটি কাজ হলো নগর পরিকল্পনা, উন্নয়ন এবং উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করা। ১৯৯৫ সালে রাজউক যে প্ল্যান করেছে সেখানে ঢাকার ভূমি ব্যবহার সুনির্দিষ্ট করা ছিল। উত্তরা তখন প্লাবনভূমি হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু ২০১০ সালের ড্যাপে সে প্লাবনভূমির অনেকটাই ভরাট হয়ে গেছে। ২০২২ সালের ড্যাপে আরো ভরাট হয়ে যায়। ভরাট হয়েছে দুইভাবে। রাজউক নিজেই তার পরিকল্পনার ব্যত্যয় করে বিভিন্ন আবাসন নির্মাণ করেছে। অন্যদিকে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ না করে বড় বড় অবকাঠামো, ভবন নির্মাণ হতে দিয়েছে। এখনো যদি রাষ্ট্র উদ্যোগী হয়, যেটুকু জলাভূমি আছে সেটা রক্ষা করা সম্ভব। এজন্য রাষ্ট্রকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ক্যান্টনমেন্ট ও গুলশান সার্কেলের অধীন ২০টির বেশি বড় খাল রয়েছে, যেগুলো উত্তরার প্লাবনভূমির সঙ্গে মিশেছে। এর মধ্যে অনেক খাল উত্তরার মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে। খালগুলো হলো বাইলজুরি খাল, ফায়দাবাদ খাল, জোয়ার সাহার কালদিয়া খাল, কালিদিয়া খাল, জুমাই খাল, মোসাইদ খাল, বাওথার তলনা খাল, ঢেলনা খাল, ভাটারা খাল, জোয়ার সাহারা খাল, দেওয়ান পাড়া খাল, আমাইয়া খাল, গুলশান লেক, নির্নিচক খাল, ভাটুরিয়া খাল, ছোট পলাশিয়া খাল, পলাশিয়া খাল, চামুর খান খাল, উজানপুর খাল, গোবিন্দপুর খাল।
নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে এসব খাল ও প্লাবনভূমি কারা দখল করেছে সে ব্যাপারে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরার দিয়াবাড়ি খাল দখল করে নির্মাণ হয়েছে বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি)। বিইউএফটি ছাড়াও উত্তরা ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাসও নির্মাণ হয়েছে খাল ভরাট করে। তুরাগের নিশাতনগর এলাকার দিয়াবাড়ি খালের প্রায় ছয় বিঘা জমির ওপর ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিইউএফটি। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি আরো অনেক প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো নির্মাণের ফলে উত্তরার প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ধীরে ধীরে ভরাট হতে থাকে।
উত্তরার প্রাকৃতিক জলাশয় ও খালগুলোর দখল ও বিলীন হয়ে যাওয়ার চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশে সরকারের ১০টি প্রতিষ্ঠানকে জলাশয়গুলো পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে বলা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো জেলা প্রশাসন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা ওয়াসা, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ, স্পারসো ও মেট্রো নৌ পুলিশ কমিশনারেট।
গত শুক্রবার উত্তরার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনের সত্যতা পাওয়া যায়। দিয়াবাড়ি খালের একাংশ ভরাট করে দাঁড়িয়ে আছে বিজিএমইএ বিশ্ববিদ্যালয় ও উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই আবদুর রহমান নামে এক মধ্যবয়স্ক জেলে মাছ ধরার সরঞ্জাম মেরামত করছিলেন। তিনি বলেন, ‘দুই দশক আগেও উত্তরার পুরোটা ছিল পানি আর পানি। এখানে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন বর্ষার সিজনে কিছু মাছ পাওয়া যায়। তবে এখন মাছ ধরি তুরাগ নদে। খালে আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না।’
মাইলস্টোন স্কুলের সামনে কথা হয় রিকশাচালক আবুল কালামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই স্কুলটি যেখানে হয়েছে, আগে সেখানে পানি ছিল। এখনো স্কুলের পেছনে পানি আর পানি। ধীরে ধীরে সবকিছু ভরাট হয়ে যাচ্ছে।’
রাজউকের হাত ধরেই জলাশয় ভরাট করে উত্তরার ভূমি ব্যবহার চিত্র বদলে যেতে থাকে বলে মন্তব্য করেছেন ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘১৯৯৫ সালে রাজউক এখানে স্যাটেলাইট আবাসন নির্মাণ করে। তারপর এখানে উত্তরা থার্ডফেজ নির্মাণ করে। এর পর থেকেই উত্তরা ভূমি ব্যবহার প্যাটার্ন বদলে যেতে থাকে। ধীরে ধীরে সরকারি-বেসরকারি আবাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। সর্বশেষ মেট্রো রেলের ডিপো, মেট্রো অফিস এগুলো সব জলাভূমি ভরাট করে করা হয়। রাজউক এক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। এভাবে প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করার কারণে ভবিষ্যতে উত্তরা জলাবদ্ধতার এলাকায় পরিণত হবে। পাশাপাশি বিমানবন্দরের অতি নিকটে হওয়ায় এখানে আরো অনেক ধরনের ঝুঁকি নিয়ে এলাকাবাসীকে বসবাস করতে হবে।’
রাজউকের ভুল পরিকল্পনায় উত্তরার জলাধার ভরাট হওয়ার পর এখানে শুধু নাগরিক জীবনযাত্রাই সংকটে পড়েনি, বরং সংকট আরো বৃহৎ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নগর গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আশির দশকে কুর্মিটোলায় বিমানবন্দর স্থাপন হয়। তখন এখানে এ রকম ঘনবসতি ছিল না। পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনীতি বড় হয়। বড় বিমানবন্দরের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু বিমানবন্দরের রানওয়ের জন্য এখন জায়গা নেই। বিমানবন্দরের আশপাশে বড় জলাশয় থাকা প্রয়োজন যেন জরুরি অবস্থায় সেখানে ল্যান্ড করা যায়। সেটা ছিল উত্তরায়। কিন্তু এখন তা নেই। ফলে দেশে বড় বিমানবন্দর কোথায় নির্মাণ হবে—এটা একটা বড় সংকট তৈরি করে। আমাদের একটা প্রস্তাব ছিল আড়িয়ল বিল অথবা পূর্বাচল। আড়িয়ল বিলে তো পরিবেশগত সমস্যা রয়েছে। আর পূর্বাচল তো এখন আবাসিক জোন হয়ে গেছে। তার মানে আগামীতে বড় বিমানবন্দরের কোনো জায়গা আপাতত দেখা যাচ্ছে না।’
উত্তরার প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষায় গত দুই দশক জোরালো ভূমিকা রেখেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সাবেক প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ। বর্তমানে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং মোহাম্মদ এজাজ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘উত্তরার প্রাকৃতিক জলাধার ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা ভরাটের বিরুদ্ধে আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি তৎকালীন সময়ে রাজউকের এই কার্যক্রম সঠিক হয়নি। অনেক জায়গায় জলাধার ভরাট করে রাজউক প্লট বানিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে। এটা অন্যায় হয়েছে। আমি প্রশাসক হওয়ার পর চেষ্টা করছি বেদখল খাল উদ্ধার করার। ইতিমধ্যে আমরা কনাই নদ উদ্ধার করেছি। আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’
প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষায় অতীত ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে বর্তমানে কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে—জানতে চেয়ে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। এসএমএস পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।