চট্টগ্রামের ‘মতিঝিল’খ্যাত আগ্রাবাদ একসময় ছিল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করপোরেট ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টম হাউজ ও সরকারি কার্যভবনকে ঘিরে পাকিস্তান আমলে গড়ে ওঠা এ এলাকায় ছিল দেশী-বিদেশী ব্যাংক, বহুজাতিক কোম্পানি, শিল্পগোষ্ঠী, শিপিং ও বীমাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়। এক দশক আগেও এখানে অফিস স্পেস পাওয়া ছিল কঠিন এবং প্রতি বর্গফুটের ভাড়া উঠেছিল ১০০-১৫০ টাকায়। এখন সেই আগ্রাবাদের বহু ভবনের ফ্লোর খালি পড়ে আছে। কার্যালয় সরিয়ে নিচ্ছে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। নিত্য খোঁড়াখুঁড়ি, জলাবদ্ধতা, যানজট, হকারের দখল, অপ্রতুল ফুটপাত ও দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণেই মূলত বাণিজ্যিক গুরুত্ব হারাচ্ছে এলাকাটি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পিত উন্নয়নের অভাব এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয়হীন কর্মকাণ্ডে আগ্রাবাদের অবকাঠামো ক্রমেই নাজুক হয়ে পড়েছে। বর্ষায় জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনা। এমনকি বৃষ্টি না থাকলেও জোয়ারের পানিতে অনেক সড়ক ডুবে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে হকারদের ব্যবসা, উন্মুক্ত ড্রেন, বৈদ্যুতিক তারের জঞ্জাল এবং বিভিন্ন সংস্থার অব্যাহত খোঁড়াখুঁড়ি। ফলে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ আগ্রাবাদ থেকে নিজেদের কার্যালয় সরিয়ে নিচ্ছে।
একসময় আগ্রাবাদে ফাইজার, গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন, জেমস ফিনলে, ডানকান ব্রাদার্স, শওয়ালেসের মতো বহুজাতিক ও আন্তর্জাতিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ছিল। এইচএসবিসিসহ বিভিন্ন দেশী-বিদেশী ব্যাংকেরও গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় ছিল এলাকায়। চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীও প্রধান কার্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে আগ্রাবাদকে অগ্রাধিকার দিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পিএইচপি ফ্যামিলি, এসএ গ্রুপসহ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী তাদের প্রধান কার্যালয় সেখান থেকে সরিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা, শিপিং ও ওষুধ কোম্পানির কার্যালয়ও অন্যত্র চলে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, একসময় আগ্রাবাদের অফিস স্পেসের চাহিদা এতটাই বেশি ছিল যে নতুন ভবন নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গেই ভাড়া হয়ে যেত। চট্টগ্রামের সবচেয়ে উঁচু ভবনগুলোর কয়েকটিও এ এলাকায়। কিন্তু এখন এসব ভবনের অনেক ফ্লোর খালি পড়ে আছে। কিছু ভবনে প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা ভাড়ায়ও অফিস স্পেস পাওয়া যাচ্ছে।
দ্য চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা এখন হকার পল্লীতে পরিণত হয়েছে। বর্ষা কিংবা গ্রীষ্ম—দুই সময়েই এখানে কয়েক ফুট পানি উঠে যায়। একসময় এখানে চট্টগ্রামসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট গ্রুপগুলোর প্রধান কার্যালয় এবং ৭০-৮০টি বিদেশী বড় কোম্পানির কার্যালয় ছিল। অবকাঠামোগত দৈন্যদশার কারণে তারা আগ্রাবাদ থেকে অফিস গুটিয়ে নিয়েছে।’
নগর প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উদাসীনতায় আগ্রাবাদ একটি অপরিকল্পিত মার্কেটপ্লেসে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন এ ব্যবসায়ী নেতা। তিনি বলেন, ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক স্থাপনায়ও বিদেশী প্রতিনিধি, ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সভা-সেমিনার আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। দেশের প্রধান বন্দরনগরীর এ বাণিজ্যিক এলাকাকে আধুনিক করা না গেলে চট্টগ্রামের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা আগ্রাবাদের এ সংকটকে সামনে এনেছে। সেখানকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে গত ৯ জুলাই ইতালির একটি টেক্সটাইল যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যবসায়িক কর্মশালার আয়োজন করে সিসিসিআই। এতে ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো উপস্থিত ছিলেন। ব্যবসায়ী নেতারা জানান, রাষ্ট্রদূত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আসার সময় এর সামনে প্রায় তিন ফুট পানি জমে ছিল। একই সঙ্গে হকারের দখল ও ভাঙাচোরা সড়কের কারণে তীব্র যানজটে তাকে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করতে হয়।
তাছাড়া প্রতি মাসেই বিভিন্ন দূতাবাসের প্রতিনিধি ও বিদেশী ব্যবসায়ী দল চট্টগ্রাম চেম্বারে আসে। কিন্তু আগ্রাবাদের অবকাঠামোগত দুরবস্থার কারণে তাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। এ বিষয়ে সিসিসিআইয়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সিসিসিআই ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) যৌথ উদ্যোগে গত ৩১ আগস্ট ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বেসরকারি খাত উন্নয়নবিষয়ক একটি স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন অনুষ্ঠিত হয়। তবে আগ্রাবাদের যানজট, জলাবদ্ধতা ও সড়ক যোগাযোগের সমস্যার কারণে শুরুতে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারকে ভেন্যু হিসেবে বেছে নেয়া নিয়ে এডিবির আপত্তি ছিল। পরে প্রশাসনের সহায়তায় ওইদিন যানজট ও হকার নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেয়া হলে সেখানে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।’
আগ্রাবাদের গুরুত্বের মূল ভিত্তি চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউজ। পাশাপাশি সরকারি কার্যভবন, জ্বালানি কোম্পানি, বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন, চা বোর্ডের আন্তর্জাতিক নিলাম কেন্দ্র, ব্যাংক, বীমা, শিপিং, লজিস্টিকস, ব্রোকারেজ ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় রয়েছে এখানে। আয়কর, ভ্যাট, সড়ক ও জনপথ, বিএসটিআই, দুর্নীতি দমন কমিশন, কর্মসংস্থান ও জনশক্তি, শিপিং, মার্কেন্টাইল মেরিন, কৃষি সম্প্রসারণ, তুলা উন্নয়ন, পেটেন্ট-শিল্প-নকশা ও ট্রেড মার্কস, বিসিকসহ বহু সরকারি দপ্তরও আগ্রাবাদকেন্দ্রিক।
এত বিপুল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি সত্ত্বেও এলাকার অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি সমন্বিতভাবে। ওয়াসা, সিডিএ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার খোঁড়াখুঁড়িতে সড়কগুলো দীর্ঘদিন ধরে নাজুক। অনেক ড্রেন উন্মুক্ত। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও দুর্বল। বৈদ্যুতিক ও অন্যান্য সেবার তারের জঞ্জালে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বৈদ্যুতিক খুঁটি। নেই পর্যাপ্ত ফুটপাত ও সড়ক পারাপারের নিরাপদ ব্যবস্থা। ফলে অফিস সময়ে যানজট তীব্র আকার ধারণ করে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এখনো পুরনো কাঠামোয় আটকে আছে। হকারের পসরা, পার্কিং ও পথচারীর চাপ মিলিয়ে দিনের বড় সময় সড়কে যানবাহনের গতি কমে আসে। জলাবদ্ধতার সঙ্গে উন্মুক্ত ড্রেনও তৈরি করছে নিরাপত্তা ঝুঁকি। এসব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে সমাধান না হওয়ায় আগ্রাবাদে নতুন করে অফিস স্থাপনের আগ্রহ কমছে।
আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকাকে ঘিরে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নৈরাজ্য চলেছে বলে নিজেই অভিযোগ তুলেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের দ্বিতীয় প্রধান বাণিজ্যিক এলাকায় পরিকল্পিত কোনো উন্নয়ন হয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এ ধরনের নৈরাজ্য দূর করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ এলাকায় নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা, ড্রেনেজ উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নে সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে নিয়ে কাজ করা হবে।’