সরকারের রাজস্ব, ঋণ ও বাজেট বাস্তবায়নের পরিসংখ্যান প্রকাশে ধীরগতি

দীর্ঘ বিরতি তৈরি হয়েছে বাজেট বাস্তবায়ন ও সরকারের আর্থিক পরিস্থিতির মাসিক তথ্য প্রকাশেও। অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগ থেকে মাসিক আর্থিক প্রতিবেদন এবং মাসিক রাজস্ব-সামষ্টিক অবস্থান প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

প্রতি মাসে সরকার কী পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করছে, সে তথ্য প্রকাশ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বাজেট বাস্তবায়নের মাসভিত্তিক অগ্রগতি ও সরকারি ঋণের প্রান্তিকভিত্তিক হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে অর্থ বিভাগ। অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের প্রান্তিকভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সামষ্টিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এসব তথ্য কিছুটা বিলম্বে হলেও নিয়মিত বিরতিতে প্রকাশ করা হচ্ছিল। কিন্তু কয়েক মাস ধরে এসব পরিসংখ্যান প্রকাশে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস—জুলাই ও আগস্টের রাজস্ব আহরণের তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি এনবিআর। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি মাসের পরিবর্তে প্রান্তিক ভিত্তিতে ভ্যাট জমা ও রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেয়ায় অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

মাসভিত্তিক রাজস্ব আহরণের তথ্য প্রকাশের দায়িত্ব এনবিআরের গবেষণা ও পরিসংখ্যান বিভাগের। এ বিভাগের মহাপরিচালক শামীমা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে শামীমা আক্তার জানান, এনবিআর চেয়ারম্যান বর্তমানে বিদেশে রয়েছেন। তিনি দেশে ফিরলে রাজস্ব আহরণের পরিসংখ্যান প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হবে।

এদিকে গতকাল অনু‌ষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এন‌বিআরের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তিন মাস (ত্রৈমাসিক) অন্তর ভ্যাট রিটার্ন ও কর জমা দেয়ার যে সুবিধা দেয়া হয়েছিল, তা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর ফলে আগের মতো প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল এবং প্রদেয় কর পরিশোধ করতে হবে।

দীর্ঘ বিরতি তৈরি হয়েছে বাজেট বাস্তবায়ন ও সরকারের আর্থিক পরিস্থিতির মাসিক তথ্য প্রকাশেও। অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগ থেকে মাসিক আর্থিক প্রতিবেদন এবং মাসিক রাজস্ব-সামষ্টিক অবস্থান প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সাধারণত কোনো মাসের তথ্য প্রায় তিন মাস পর প্রকাশ করা হতো। তবে সর্বশেষ মাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে ২০২৫ সালের অক্টোবরের তথ্যের ভিত্তিতে। এরপর আর কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। একইভাবে মাসিক রাজস্ব-সামষ্টিক অবস্থান প্রতিবেদন সর্বশেষ প্রকাশ করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তথ্যের ভিত্তিতে। এর পর থেকে এ প্রতিবেদনও আর প্রকাশিত হয়নি।

সরকারের ঋণের তথ্য প্রকাশেও বিলম্ব দেখা যাচ্ছে। অর্থ বিভাগের ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ সর্বশেষ চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিক পর্যন্ত সরকারের ঋণের তথ্য প্রকাশ করেছে। জুন প্রান্তিকের তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পাশাপাশি সরকারের তিন বছরের মধ্যমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশল (এমটিডিএস) প্রতিবেদন সর্বশেষ প্রকাশ করা হয়েছিল ২০২৪ সালের জুনে। গত অর্থবছরে এমটিডিএস প্রতিবেদন প্রতি বছর প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও এখন পর্যন্ত নতুন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। সরকারের ঋণ ধারণক্ষমতা পরিবীক্ষণ (ডিএসএ) প্রতিবেদন প্রকাশেও দীর্ঘ বিরতি রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের তথ্যের ভিত্তিতে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। এরপর আর নতুন কোনো ডিএসএ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত প্রান্তিক ভিত্তিতে দেশের বৈদেশিক ঋণসংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিক পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। জুন প্রান্তিকের তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সামষ্টিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এসব তথ্য প্রকাশে বিলম্বের বিষয়টি নতুন নয়। বাংলাদেশের সরকারি আর্থিক পরিসংখ্যানের সময়োপযোগিতা ও প্রকাশের ব্যবধানের ক্ষেত্রে ‘সি’ রেটিং দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘ডেটা অ্যাডিকুয়েসি অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে এ রেটিং দেয়া হয়। আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বার্ষিক ভিত্তিতে সরকারের বাজেট ও সরকারি ঋণের তথ্য প্রকাশ করে। সরকারের মাসিক আর্থিক তথ্য প্রকাশে প্রায় তিন মাসের বিলম্ব রয়েছে। পাশাপাশি প্রান্তিক ভিত্তিতে প্রকাশিত তথ্য আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে আরো সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে বাজেট-বহির্ভূত ইউনিট ও স্থানীয় সরকারের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি সরকারের পুঞ্জীভূত সম্পদের তথ্য প্রকাশেরও পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার পর থেকে সংস্থাটির কাছে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও পরিসংখ্যান সরবরাহ করে আসছিল বাংলাদেশ। তবে বর্তমানে ওই ঋণ কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, আইএমএফ কর্মসূচির অধীনে থাকাকালে নির্দিষ্ট সময় পরপর তথ্য সরবরাহ ও প্রকাশের যে আন্তর্জাতিক চাপ ছিল, কর্মসূচির বাইরে আসার পর তা কিছুটা কমেছে। গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশে সাম্প্রতিক ধীরগতির পেছনে এটিও একটি কারণ হতে পারে।

সামষ্টিক অর্থনীতির এসব জরুরি তথ্য প্রকাশে এমন ধীরগতির বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অর্থনৈতিক চালচিত্র সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। উন্নয়ন ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সরকার জনগণের জন্যই পরিচালনা করে। আবার উন্নয়ন প্রকল্পের বড় একটি অংশের অর্থ আসে জনগণের দেয়া কর থেকে। ফলে অর্থনীতি কোন দিকে যাচ্ছে, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কী অবস্থায় রয়েছে—এসব তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা সরকারের দায়িত্ব।’

একই সঙ্গে যারা এসব তথ্য নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ করেন কিংবা গণমাধ্যমে প্রতিবেদন তৈরি করেন, তাদের জন্যও নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে বলে মত প্রকাশ করেন ড. ফাহমিদা খাতুন।

সরকার নিয়মিত তথ্য প্রকাশে অভ্যস্ত হলে এর মাধ্যমে তাদের জবাবদিহিতাও বাড়ে উল্লেখ করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা শুধু আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নয়, নিয়মিত তথ্য সরবরাহের মাধ্যমেও নিশ্চিত করা সম্ভব। এতে শেষ পর্যন্ত সরকারই উপকৃত হয়। সরকারের দক্ষতা বাড়ে এবং জনগণের জন্য দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এক ধরনের দায়বদ্ধতা তৈরি হয়।’

আরও