ভারত পাকিস্তান নেপালের চেয়ে বাংলাদেশে সুষম খাবারের ব্যয় বেশি

‘আগে দুপুরের খাবারে মাছ কিংবা ডিম আর সবজি থাকত, এখন শুধু ভাত আর আলু দিয়ে দিন চলে যায়’—বলছিলেন রংপুরের দিনমজুর আব্দুল মান্নান। বাজারে গিয়ে তিনি এখন আগের মতো সহজে ডিম বা মাছ কিনতে পারেন না।

‘আগে দুপুরের খাবারে মাছ কিংবা ডিম আর সবজি থাকত, এখন শুধু ভাত আর আলু দিয়ে দিন চলে যায়’—বলছিলেন রংপুরের দিনমজুর আব্দুল মান্নান। বাজারে গিয়ে তিনি এখন আগের মতো সহজে ডিম বা মাছ কিনতে পারেন না। কারণ যে খাদ্যপণ্যের দাম ভারতে বা নেপালে তুলনামূলকভাবে সহনীয়, বাংলাদেশে তা নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

মানবদেহকে সুস্থ ও সবল রাখা, বৃদ্ধি, শক্তি উৎপাদনসহ রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সুষম বা স্বাস্থ্যকর খাবার অতি প্রয়োজনীয়। তবে এসব খাদ্যের প্রতিবছরই মূল্য বাড়ছে দেশে। বর্তমানে এ ব্যয় ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ইরান, মালদ্বীপের চেয়ে বেশি। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে কেবল শ্রীলংকা ও ভুটানে কিছুটা বাড়তি দামে এসব খাদ্য কিনতে হয়।

সুষম খাবার গ্রহণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রতিদিন ব্যয় করতে হয়েছে ৪ দশমিক ৪৯ ডলার। ভারতে এ ব্যয় ছিল ৪ দশমিক শূন্য ৭ এবং পাকিস্তানে ৩ দশমিক ৯৫ ডলার। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি এফএওর পাশাপাশি তৈরি করেছে জাতিসংঘের আরো চার সংস্থা—আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফ।

সুষম খাদ্যের ক্রয়ক্ষমতার সক্ষমতা (পার্চেজিং পাওয়ার প্যারিটি বা পিপিপি) অনুসারে এ ব্যয় হিসাব করা হয়েছে। আর সুষম খাদ্য গ্রহণের খরচ বলতে বোঝানো হয়—একজন ব্যক্তির দৈনিক ২ হাজার ৩৩০ কিলোক্যালরি শক্তির চাহিদা পূরণ করে এমন খাদ্যের জন্য স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য এবং সবচেয়ে সাশ্রয়ী খাবার কেনার ব্যয়কে।

এফএওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বে জনপ্রতি দৈনিক সুষম খাবার কেনার পেছনে ব্যয় হয় ৪ দশমিক ৪৬ ডলার। নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় এ ব্যয় হয় ৪ দশমিক ৪১ ডলার। নিম্নমধ্য আয়ের দেশগুলোয় ৪ দশমিক ৪৮ ডলার ছিল। উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে সুষম খাবারের জনপ্রতি দৈনিক ৪ দশমিক ৮৩ ডলার খরচ করতে হয়। ৪ দশমিক ২২ ডলার ব্যয় হয় উচ্চ আয়ের দেশগুলোয়। দক্ষিণ এশিয়ার নয়টি দেশের মধ্যে কেবল আফগানিস্তানের ব্যয়ের তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি এফএও। বাকি দেশগুলোর মধ্যে এ ব্যয়ে তৃতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। সুষম খাবারের জনপ্রতি দৈনিক সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় ভুটানে, ৫ দশমিক ৯৬ ডলার। শ্রীলংকায় ৫ দশমিক ১৬ ডলার ব্যয় হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম ব্যয় পাকিস্তানে, ৩ দশমিক ৯৫ ডলার। বাংলাদেশের তুলনায় যা অনেকটাই কম। নেপালে ৪ দশমিক ২০, মালদ্বীপে ৪ দশমিক ৩০ ও ইরানে এ ব্যয় ৪ দশমিক ৩৯ ডলার।

বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে বেশ আলোচিত আফ্রিকার দেশ উগান্ডা। তবে দেশটির চেয়েও সুষম খাদ্যে ব্যয় বেশি এ দেশে। উগান্ডায় সুষম খাদ্যের জন্য একজনকে দৈনিক ব্যয় করতে হয় ৩ দশমিক ৬৫ ডলার। শুধু উগান্ডায় নয়, আফ্রিকার দেশ সুদান, কেনিয়া, সোমালিয়া, কঙ্গো, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতেও বাংলাদেশের চেয়ে কম খরচে সুষম বা স্বাস্থ্যকর খাবার মিলছে।

বাংলাদেশে সুষম খাদ্য বাড়তি ব্যয়ে কিনতে হয় বলে এ থেকে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যাও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অনেক বেশি। দেশের জনসংখ্যার ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ এখনো সুষম খাদ্য থেকে বঞ্চিত রয়েছে। অর্থাৎ ৭ কোটি ৭১ লাখ মানুষ এখনো স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পাচ্ছে না। ৬০ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ ‍সুষম খাবারের সামর্থ্য না থাকা পাকিস্তান অবশ্য এ ক্ষেত্রে শীর্ষে। তৃতীয় স্থানে থাকা শ্রীলংকার ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ সুষম খাবার কেনার সামর্থ্য রাখে না। ভারতে এ মানুষের হার ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় সুষম খাদ্য গ্রহণে সবচেয়ে এগিয়ে মালদ্বীপ। দেশটির মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার থেকে বঞ্চিত। আর ভুটানে এ হার সাড়ে ৪ শতাংশ, নেপালে ২০ ও ইরানে ১৪ শতাংশ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত খাদ্য মূল্যস্ফীতি, পর্যাপ্ত উপার্জনের সুযোগ কম থাকার কারণে সুষম খাদ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের মানুষ। এতে জনস্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ছে এবং বাড়ছে পুষ্টিহীনতার সংখ্যা।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সুষম খাবার শিশু, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধ থেকে শুরু করে কর্মক্ষম সবার জন্যই অতি জরুরি। এ খাবার শক্তির জোগান দেয়। শিশুদের দেহের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। আমাদের দেশের গ্রামীণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখনো কম। সে জন্য খাদ্যের দাম বেশি হলে সেটি বৃহৎ শ্রেণীকে প্রভাবিত করে। ফলে পুষ্টিহীনতাসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়, যা পরে নানা স্বাস্থ্যগত জটিলতা তৈরি করে। এখন ১৮ বছর বয়সী তরুণরাও হার্টের সমস্যায় ভুগছে। এমন অনেক রোগ যেন আমরা দাওয়াত করে আনছি। তাই খাদ্যকে সবার ক্ষয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে।’

২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সুষম খাদ্যের পেছনে বিভিন্ন দেশের মানুষকে দৈনিক কত ব্যয় করতে হয়েছে সেই তথ্যও উঠে এসেছে এফএওর প্রতিবেদনে। তাতে দেখা যায়, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় প্রতি বছরই বাংলাদেশের মানুষকে বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। এমনকি বৈশ্বিক গড় ব্যয়ের তুলনায়ও বেশি খরচ করতে হয়েছে বাংলাদেশের নাগরিকদের। যদিও ২০১৭ সালে বৈশ্বিক জনপ্রতি দৈনিক ব্যয় ৩ দশমিক ১৪ ডলারের চেয়ে বাংলাদেশে ‍কিছুটা (৩ দশমিক শূন্য ৯ ডলার) কম ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আবু তোরাব এমএ রহিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খাদ্যের মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়ানোকে বিপদ হিসেবে দেখা হয়। আমাদের এখানে তা ১২-১৩ শতাংশে ওঠানামা করছে। মানুষের আয়ের ৮০ শতাংশই খাদ্যের পেছনে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে অনেকেই খাদ্যগ্রহণ কমিয়েছে, যা এক ধরনের নীরব দুর্ভিক্ষ। কারণ দুর্ভিক্ষ দেখা যায় কিন্তু কে খাবার কম খাচ্ছে সেটি দৃশ্যমান হয় না। এটি বিভিন্ন সূচক থেকেই বুঝতে হয়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। খাবার কম খেলে মানুষের কার্যক্ষমতা কমে যায়। আর কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া মানে কোনো রোগের প্রথম লক্ষণ।’

দেশে খাদ্য ও পুষ্টির বিষয়টি সবসময় উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে উল্লেখ করে এ পুষ্টিবিজ্ঞানী বলেন, ‘জাতীয়ভাবে সবশেষ ১৯৯৫-৯৬ সালে পুষ্টি জরিপ (নিউট্রিশন সার্ভে) হয়েছিল। এরপর আর হয়নি। বিভিন্ন এনজিও কিছুটা ডাটা দেয় তবে সেগুলো আসল চিত্র তুলে ধরতে পারে না। ফুড এক্সপেন্ডিচার ডাটাও সঠিক চিত্র তুলে ধরতে পারে না। কারণ দেশে ভয়ানক সম্পদের বৈষম্য রয়েছে। এটি দিয়ে সামগ্রিক তথ্য উঠে আসে না। দরকার আলাদা পুষ্টি জরিপ, সেই সঙ্গে এ বিষয়ে নীতি প্রণয়ন করা। পাশাপাশি কাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। তৈরি করতে হবে মানুষের আয়ের পথ।’

খাদ্য ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সুষম খাবার গ্রহণের সক্ষমতা না থাকায় ব্যাপকভাবে প্রভাব পড়ছে শিশুর স্বাস্থ্যে। বর্তমানে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির কারণে ওজন কম থাকার হার ১০ শতাংশ। ভারতে এ হার ১৮ শতাংশ আর পাকিস্তানে ৭ শতাংশ।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘খাদ্যমূল্য বেশি থাকায় দেশের মানুষ পর্যাপ্ত সুষম খাবার পাচ্ছে না। নিম্ন আয়ের মানুষের মাছ, মাংস, ফলমূল কেনার সামর্থ্য কমেছে। আবার যা খাচ্ছি আমরা সেটিও স্বাস্থ্যকর না, খাদ্যে ভেজাল। সরকার পুষ্টিকে সবসময় কম গুরুত্ব দিয়ে আসছে, যা অতি জরুরি। এখানে রাষ্ট্র অনেক দেরি করে ফেলেছে। সুষম খাবার নিশ্চিতে রাষ্ট্রকে পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুষম খাবার সম্পর্কে শিশুদের শেখাতে হবে এবং অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।’

আরও