নড়াইলে মধুমতির তিন কিলোমিটার জুড়ে ভাঙন, শতাধিক বাড়ি নিশ্চিহ্ন

ঝুঁকিতে আরো ৩০০ পরিবার ও প্রাথমিক বিদ্যালয়

উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের আমডাঙ্গা এলাকায় সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নদীর দক্ষিণ পাড়ে কোনো ভাঙন নেই।

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার আমডাঙ্গা গ্রামে তিন কিলোমিটারজুড়ে মধুমতি নদীর ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এবার বর্ষা মৌসুমেই নদীতে চলে গেছে শতাধিক বসতবাড়ি, মসজিদ, কয়েকশ একর ফসলি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরো অন্তত ৩০০ পরিবার। অভিযোগ রয়েছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) অস্থায়ীভাবে বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করলেও তা কোনো কাজে আসছে না। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা।

উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের আমডাঙ্গা এলাকায় সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নদীর দক্ষিণ পাড়ে কোনো ভাঙন নেই। তবে উত্তর পাড়ে যতদূর চোখ যায় ভাঙনের চিহ্ন নদীর পাড়জুড়ে। তীর থেকে আনুমানিক ৩০-৪০ গজ দূরবর্তী পর্যন্ত নদীর মাঝে বিক্ষিপ্তভাবে নারকেল, সুপারি, কলাগাছের অগ্রভাগ তীব্র স্রোতে দোল খাচ্ছে। নদীতে হারিয়ে যাওয়া ভিটেমাটি জনবসতির শেষ চিহ্ন বহন করছে বসতির আঙিনা, আশপাশের এসব গাছপালা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আমডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গ্রামের পাকা সড়কসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। পাউবো বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চালালেও ভাঙনের ব্যাপক ব্যাপ্তির তুলনায় তা নগণ্য।

ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, নদীভাঙনের দৃশ্য মধুমতি পাড়ের আমডাঙ্গা এলাকার মানুষের অতি চেনা। বর্ষা এলেই খরস্রোতা হয়ে ওঠে মধুমতি, বৃদ্ধি পায় ভাঙনের তীব্রতা। বিগত এক দশকের অব্যাহত ভাঙনে শত শত একর ফসলি জমি, অসংখ্য বসতবাড়ি স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে হতদরিদ্র এ জনপদের অধিকাংশ মানুষ আজ নিঃস্ব। তাদের অভিযোগ, চলতি মৌসুমে প্রায় দুই মাসব্যাপী অব্যাহত ভাঙনে সবকিছু নদীতে চলে যাচ্ছে। ভাঙন বাড়লে প্রতি বছরই পাউবো বালির বস্তা ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করে, কিন্তু তা কোনোই কাজে আসে না। সরকারের কাছে স্থায়ী তীর রক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

আমডাঙ্গা গ্রামের ভুক্তভোগী মো. বাপ্পি শেখ জানান, প্রতি বছর ভাঙনের কবলে পড়তে হয় তাদের। গত মৌসুমে আমডাঙ্গা গ্রামের অন্তত ৮০টি বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। চলতি মৌসুমে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ভাঙছে নদী।

গ্রামের অহিদ মুন্সি বলেন, ‘এবারো আমার ভিটা-মাটি নদীতে গিলে খেয়েছে। তিন বছরে আমার বাড়ি দুবার ভেঙেছে। এ বছর আমার মতো এলাকার অন্তত ১০০ পরিবারের বসতভিটা নদীতে চলে গেছে। বারবার পাউবোর কাছে গেলেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কোনো ব্যবস্থা করেনি।’

একই গ্রামের ইনসান মোল্লা জানান, এ বছর নদীতে তার ফসলি জমি ও ঘরবাড়িসহ সবকিছু নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ছেলে-মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে জীবনযাপন করছেন তিনি।

ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মুনছুর মোল্লা বলেন, ‘গত সপ্তাহে এলাকার বড় এক তলাবিশিষ্ট মসজিদটি চোখের সামনে নদীতে চলে গেল। আমরা কিছুই করতে পারলাম না। এখন এলাকার মানুষের নামাজ পড়ার মতো ভালো কোনো মসজিদ নেই।’

দুই মাসে এ গ্রামের হাবিবুর মোল্লা, মুরাদ মোল্লা, সামছুন্নাহার বেগম, রেখা খানম, ইলু ভেন্ডার, শহিদুল মোল্লাসহ অন্তত ১০০ পরিবারের বসতভিটা, গাছপালাসহ ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. সুমন হোসেন বলেন, ‘ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। এর মধ্যে আমডাঙ্গা গ্রামের অবস্থা বেশি খারাপ। গ্রামটি প্রতি বছর ভাঙনের কবলে পড়লেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে তেমন কোনো আগ্রগতি দেখছি না। বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।’ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

নড়াইলের পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুামার সাহা বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে নদীর পানির স্রোতের তোড়ে এলাকাটির ভাঙন তীব্র হয়েছে। ভাঙন রোধে আপৎকালীন অস্থায়ী কার্যক্রম চলছে। এছাড়া আমডাঙ্গা এলাকায় ভাঙন রোধে ১ হাজার ৭০০ মিটার স্থায়ী তীর রক্ষা প্রকল্প প্রণয়ন করে প্রস্তাবনা পাঠনো হয়েছে। প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন হলে এলাকাতে স্থায়ী সমাধান হবে।’

আরও