পাহাড়ি সংরক্ষিত বনে অস্তিত্ব সংকটে বিরল সাম্বার হরিণ

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের কিছু গহিন জঙ্গলে যেসব বিরল প্রাণী কোনো রকমে টিকে আছে, তার মধ্যে সাম্বার হরিণ অন্যতম।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের কিছু গহিন জঙ্গলে যেসব বিরল প্রাণী কোনো রকমে টিকে আছে, তার মধ্যে সাম্বার হরিণ অন্যতম। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বনাঞ্চলে সাম্বার হরিণের দেখা মিললেও বাংলাদেশে এটি প্রায় বিলুপ্ত হতে চলছে। চামড়ার বাণিজ্যিক চাহিদা থাকায় প্রায় সময় চোরা শিকারিদের কবলে পড়ছে বন্যপ্রাণীটি। এছাড়া বাসস্থানের অবক্ষয়ের কারণে নতুন করে সংকটে পড়েছে সাম্বার।

সাম্বার হরিণ আকারে বেশ বড়, কাঁধ বরাবর উচ্চতা চার ফুটের বেশি। লেজ ছাড়া লম্বায় সাত ফুটের মতো। ঘন বাদামি দেহে কোনো ছোপ নেই, সারা দেহ গাঢ় বাদামি, বেশি বয়সী সাম্বার অনেকটা কালচে। কান বেশ বড়। স্ত্রী হরিণ আকারে পুরুষের চেয়ে কিছুটা ছোট হয়। শুধু পুরুষের শিং থাকে, পাশাপাশি কিছুটা ছড়ানো।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্বার গহিন বনের বাসিন্দা। ঘাস, লতাপাতা, ফলমূল আহার করে। একাকী কিংবা জোড়ায় বিচরণ করতে দেখা যায়। সাধারণত রাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তবে যে বনে বাঘ বা চিতার মতো বড় আকারের শিকারি প্রাণী নেই, তেমন বনাঞ্চলে দিনেও আহারের জন্য বেরিয়ে পড়ে। পানির খোঁজে বহুদূর পর্যন্ত চলাচল করে। শীতকালে পাহাড়ে পানির সংকট থাকে, তখন পানির জন্য পাহাড়ি ছড়ায় ছড়ায় ঘুরে বেড়ায়। অতীতে বাংলাদেশের সব পাহাড়ি বনাঞ্চলে সাম্বারের উপস্থিতি ছিল। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই-একটি খণ্ড বন ছাড়া দেশে এ প্রাণী আর কোথাও দেখা যায় না।

বন্যপ্রাণী গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এমএ আজিজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে সাম্বার হরিণ সংকটাপন্ন। রাঙ্গামাটির কাচালং, পাবলাখালী ও শিজক এলাকায় হরিণের অস্তিত্ব রয়েছে। এছাড়া বান্দরবানের সাঙ্গু, মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনে সাম্বার হরিণ দেখা যায়। বিরল প্রজাতির এ হরিণ গভীর বনে থাকতে পছন্দ করে। সাম্বার হরিণ আকারে বড় হওয়ার কারণে চিত্রা ও মায়া হরিণের চেয়ে শিকারের ঝুঁকি বেশি। চোরা শিকার বন্ধে বন বিভাগকে আরো তৎপর হতে হবে। বিশেষ করে যারা বননির্ভর জনগোষ্ঠী, তাদের নিয়ে কাজ করতে হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১০ মে রাঙ্গামাটির জুরাছড়ি উপজেলার দুর্গম লুলাংছড়ি গ্রাম থেকে একটি সাম্বার হরিণ শাবক উদ্ধার করে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগ। পরে হরিণটি বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে স্থানান্তর করে বন বিভাগ। মূলত বন বিভাগের উদ্ধারের আগের দিন ৯ মে জুরাছড়ি উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী একটি দুর্গম গ্রামের বাসিন্দারা হরিণটি ধরে ফেলেন। পরে বন বিভাগ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে হরিণ শাবকটি উদ্ধার করে।

২০২৪ সালের ৭ মার্চ রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার ভাসান্যদম ইউনিয়নে মো. সাইদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি একটি সাম্বার হরিণ ধরে মাংস বিক্রির জন্য জবাই করেন। তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের রাঙ্গিপাড়া বিটের বন কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সাইদুল ইসলামকে আটক করে এবং হরিণের ২৫ কেজি মাংস, মাথা-চামড়াসহ দেহের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সাইদুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ এর ৩৭ ধারায় মামলা হয়। সবশেষ গত শুক্রবার কাপ্তাই উপজেলার কর্ণফুলী নদী থেকে একটি সাম্বার হরিণ উদ্ধার করে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগ। বেলা ২টার দিকে হরিণটি উদ্ধার করা হলেও বিকাল ৫টার দিকে মারা যায়। ২০২১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত তিনটি ঘটনার মধ্যে একটি হরিণকে বাঁচানো গেলেও দুটি প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়েছে।

হরিণ মারা যাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের কাপ্তাই রেঞ্জ কর্মকর্তা ওমর ফারুক স্বাধীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাপ্তাই বিপিডিবির ব্রিকফিল্ড এলাকার উত্তর পাশে গহিন জঙ্গলে কেউ কিংবা কোনো প্রাণী হরিণটিকে শিকার করার জন্য ধাওয়া করে। এক পর্যায়ে হরিণটি বাঁচার জন্য এসে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্প্রিলওয়ে সংলগ্ন নদীতে ঝাঁপ দেয়। খবর পাওয়ার পর হরিণটিকে উদ্ধার করা হয়েছে। হরিণটি আহত অবস্থায় ছিল। পরে বিকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে।’

দক্ষিণ বন বিভাগের কর্ণফুলী রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. আবু কাউসার জানান, ‘আমরা ধারণা করছি বন্য কুকুরের হাত থেকে বাঁচার জন্য হরিণটি পাহাড় থেকে কর্ণফুলী নদীতে ঝাঁপ দেয়। ওই সময় হরিণটি পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। পরে উদ্ধার করে কাপ্তাই রেঞ্জ কার্যালয়ে এনে একজন প্রাণী চিকিৎসক দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। তবে পরবর্তী সময়ে স্ট্রোক করে হরিণটি মারা যায়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর হরিণের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।’

রাঙ্গামাটির কাপ্তাই, বিলাইছড়ি ও বাঘাইছড়ি উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সাম্বার ও মায়া হরিণের উপস্থিতি রয়েছে। তবে চোরা শিকারিদের উৎপাতে বিলুপ্তির পথে হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী।

বন্যপ্রা ণী গবেষকরা বলছেন, রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ির উপজেলার রাইংক্ষ্যং সংরক্ষিত বন, কাপ্তাই উপজেলার সীতা পাহাড়, রাম পাহাড়, কর্ণফুলী রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সাম্বার হরিণ দেখা যায়। এছাড়া বাঘাইছড়ি উপজেলার কাচালং সংরক্ষিত বনেও সাম্বার ও মায়া হরিণের উপস্থিতি রয়েছে। দেশের একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ও নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলার হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপেও চিত্রা ও মায়া হরিণ রয়েছে। আগে সিলেট অঞ্চলে থাকলেও এখন কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্বার হরিণের অস্তিত্ব রয়েছে। তবে এ প্রজাতি এখন বিলুপ্তির পথে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বন্যপ্রাণী গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সুন্দরবন আর নোয়াখালীর নিঝুপ দ্বীপে সাম্বার হরিণ কখনই ছিল না। সাম্বার হরিণ মূলত পাহাড়ি এলাকাগুলোয় বিচরণ করে। এক সময় সিলেট অঞ্চলে সাম্বারের উপস্থিতি ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে সাম্বার হরিণ দেখার কোনো রেকর্ড নেই। কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে কিছু সাম্বার হরিণ টিকে আছে। কিন্তু বিগত সময়ে শিকার, আবাসস্থল নষ্টসহ নানা কারণে বন্যপ্রাণীটি সংকটাপন্ন। সাম্বার হরিণ প্রকৃতিতে বাঁচিয়ে রাখতে শিকার বন্ধে স্থানীয়দের সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা প্রয়োজন।’

আরও