আকাশপথে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরি সম্ভব

কেএম মুজিবুল হক

চেয়ারম্যান, টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড

বর্তমানে আমাদের ট্রানজিট যাত্রী সংখ্যা ৫ শতাংশেরও কম। আমাদের ৯৫ শতাংশ ভ্রমণই পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট। এসব যাত্রীকে সাময়িকভাবে এ দেশে রেখে কানেক্টিভিটি দেয়ার ব্যবস্থা আমরা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি।

থার্ড টার্মিনাল চালু হলে আমরা ২০ থেকে ২৪ মিলিয়ন যাত্রী এবং পাঁচ লাখ টন কার্গো পরিবহনের সক্ষমতা অর্জন করতে পারব। এখন আমাদের ভাবতে হবে, কীভাবে সে সক্ষমতা কাজে লাগানো যায়।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাত ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিমান ভ্রমণ এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি প্রয়োজনীয়তা। দ্রুত, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও সহজ উপায়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার জন্য বিমান যোগাযোগ এখন অপরিহার্য। সড়ক ও রেলের মতো বিমান চলাচলকে মানুষের জন্য সহজলভ্য করতে হবে।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আগামী ১৫ বছরের একটি রোডম্যাপ রয়েছে। এ রোডম্যাপ বাস্তবায়নে একটি কৌশলগত কমিটি ও স্টিয়ারিং কমিটি থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে দেশের এভিয়েশন বাজারের আকার ৫-৬ বিলিয়ন ডলার। পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে সেটিকে ১৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। বর্তমানে আমাদের বাজারের প্রায় ২২ শতাংশ দেশীয় এবং প্রায় ৭৭ শতাংশ বিদেশী এয়ারলাইনসের দখলে। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার বিমান ভ্রমণ বাবদ বিদেশে চলে যাচ্ছে।

বিমান খাতে আমাদের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। সেখান থেকে আমরা কতটা আয় করছি, সেটিও ভাবতে হবে। বর্তমানে জিডিপিতে এভিয়েশনের অবদান দশমিক ৮ শতাংশ। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এ খাতের সম্ভাবনাকে আরো বড় পরিসরে কাজে লাগানো।

আমরা পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের ঠিক মধ্যস্থলে অবস্থান করছি। ঢাকা থেকে উড়ালপথের দূরত্ব হিসাব করলে দেখা যায় ২, ৪, ৮ ও ১১ ঘণ্টার দূরত্বে কোটি কোটি মানুষ পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাতায়াত করছে। প্রতি বছর প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ যাত্রী আমাদের আকাশসীমার আশপাশ দিয়ে যাতায়াত করে। কেবল জিসিসি (গালফ) দেশগুলো থেকে আসিয়ান (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) অঞ্চলগুলোর মধ্যেই বছরে প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ যাত্রী চলাচল করে। বাংলাদেশ এ দুই অঞ্চলের ঠিক মাঝখানে সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে। আমরা এ যাত্রীদের ঢাকায় এনে সাময়িক বিরতি (ট্রানজিট) দিয়ে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা অন্যান্য গন্তব্যে পাঠাতে পারি।

বর্তমানে আমাদের ট্রানজিট যাত্রী সংখ্যা ৫ শতাংশেরও কম। আমাদের ৯৫ শতাংশ ভ্রমণই পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট। এসব যাত্রীকে সাময়িকভাবে এ দেশে রেখে কানেক্টিভিটি দেয়ার ব্যবস্থা আমরা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। অথচ আমাদের নতুন টার্মিনালে বছরে ৫০ লাখ ট্রানজিট যাত্রীসেবার সক্ষমতা থাকবে। এ সক্ষমতাকে আমরা কীভাবে কাজে লাগাব, তা এখনই পরিকল্পনা করতে হবে।

আমাদের নতুন টার্মিনালে অনেক আধুনিক সুবিধা রয়েছে। কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। যেমন পার্কিং, রানওয়ে এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। তবে এগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। আমাদের সামনে সমাধানের সুযোগ রয়েছে।

বিদেশী এয়ারলাইনসের পাশাপাশি শক্তিশালী দেশীয় এয়ারলাইনস প্রয়োজন। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ বিমানবন্দরের পাশে একটি সমন্বিত সুবিধা তৈরির চেষ্টা করছে। সেখানে শপিং মল, হোটেলসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকবে। কিন্তু আমাদের এমন সুবিধাও দরকার, যেখানে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ ট্রানজিট যাত্রীরা থাকতে পারবেন।

দ্বিপক্ষীয় এয়ার সার্ভিস এগ্রিমেন্ট এর আওতায় বাংলাদেশের পক্ষে ৮৩০টি ফ্লাইটের রাইটস থাকলেও আমরা ব্যবহার করছি মাত্র ৩২৯টি। অর্থাৎ ৫০১টি স্লট আমরা অব্যবহৃত রেখেছি। এভিয়েশন সেক্টরে স্লট অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো যেখানে একটি স্লটের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করে, সেখানে আমাদের প্রাপ্ত স্লটগুলো খালি পড়ে থাকছে। সময়মতো এগুলো ব্যবহার না করলে এ খাতে আমরা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ব।

বর্তমানে ঢাকার বিমানবন্দরে প্রতিদিন ৩০০-৩৫০টি বিমান ওঠানামা করে। এর মধ্যে প্রায় ১৫০টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট। এত বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলও প্রয়োজন। কারণ এটি পুরো বিমান চলাচল ব্যবস্থার একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করে। টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম ও স্লট ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো গেলে দিনে ৫০০-৬০০টি ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে। ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে ৩০-৪০ মিনিট ও ওয়াইড-বডির ক্ষেত্রে ৫০-৬০ মিনিটের মধ্যে টার্নঅ্যারাউন্ড করা সম্ভব।

এখানে আমার একটি প্রস্তাব হলো এয়ারলাইনসকে সরাসরি ভর্তুকি না দিয়ে রুটকে ভর্তুকি দেয়া। যেমন কোনো রুটে কর ১০ শতাংশ কমিয়ে দেয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশে বাজেট এয়ারলাইনস চালু হলে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের জন্য বিমান ভ্রমণ আরো সহজলভ্য হবে। আমাদের প্রবাসী কর্মী যদি ২০ ডলারের পরিবর্তে ১০ ডলারে ভ্রমণ করতে পারেন, তাহলে তিনি বছরে একবারের পরিবর্তে দুবার দেশে আসতে পারবেন। এর সুফল দেশের অর্থনীতিতেই ফিরে আসবে।

বর্তমানে প্রায় ৪৫টি উড়োজাহাজ রয়েছে। আগামী ১০ বছরে এ সংখ্যা প্রায় ২০০-তে পৌঁছতে পারে। তখন এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কোথায় হবে? পাইলট, প্রকৌশলী ও অন্যান্য দক্ষ জনবল কোথা থেকে আসবে? এসব বিষয়ে এখন থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে। কক্সবাজারকে এভিয়েশন জ্ঞান কেন্দ্র ও পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। আগামী ১০ বছরে বিশ্বে বিপুলসংখ্যক পাইলটের প্রয়োজন হবে। তাই সেখানে এভিয়েশন স্কুল, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সিমুলেটর সুবিধা তৈরি করা যেতে পারে।

আরও