ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির যোদ্ধা শরিফ ওসমান বিন হাদির ওপর সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা এবং হত্যা, ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর পরিকল্পিত হামলা, এবং ছায়ানট ভবন ও উদীচী অফিসে অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদ এবং এই সকল সন্ত্রাসী ধ্বংসাত্মক তৎপরতা রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে ৩২ জন নাগরিক সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশের জন্য বিবৃতি প্রদান করেছেন।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এএলআরডি-এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা গণমাধ্যমে বিবৃতিটি পাঠিয়েছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা গভীরতম ক্ষোভ, বিস্ময় ও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশবাসীকে একটি জন-অংশগ্রহণমূলক, উৎসবমুখর এবং স্বচ্ছ নির্বাচন উপহার দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতির অনুসরণে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পরের দিনই ১২ ডিসেম্বর প্রকাশ্য দিবালোকে জনবহুল বিজয় নগরে ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, জুলাই অভ্যুত্থানের বীর যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদির ওপর বর্বরোচিত হামলা করে হত্যা করা হলো। আর পুলিশের রিপোর্ট মতে হত্যার মূল অভিযুক্তরা নিরাপদে দেশ ত্যাগ করে বিদেশে অবস্থান নিয়েছে। এখন বলা হচ্ছে তাদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য পুলিশের কাছে নেই। এটা কেন কিভাবে ঘটেছে তা দেশবাসী সরকারের কাছে জানতে চায়। আমরা ওসমান হাদির হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল অপরাধীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করে বিচারের সম্মুখীন এবং অনতিবিলম্বে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাই।
১৮ ডিসেম্বর গভীর রাতে দেশের অন্যতম দুটি শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলো এবং ইংরেজি ডেইলি স্টারের ওপর পূর্ব পরিকল্পিত হামলা, লুটপাট ও অগ্নি সন্ত্রাসের মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞ এবং একই সময় ছায়ানট ভবনেও হামলা, আগুন লাগিয়ে তার সকল সম্পদ পুড়িয়ে দেয়া এবং সেইসঙ্গে সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত শিশু-কিশোরদের নালন্দা বিদ্যালয়কেও ধ্বংস করে দেবার ধারাবাহিক ঘটনাগুলো দেশের সকল সচেতন নাগরিককে শুধু বিস্মিত, হতবাকই করেনি, তাদের মনে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।
এর পাশাপাশি ময়মনসিংহ জেলার ভালুকায় দীপু দাস নামের এক যুবককে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে নির্মমভাবে হত্যা এবং প্রকাশ্যে তার মরদেহে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, এছাড়াও লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের বাড়িতে বাইরে থেকে তালা মেরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এতে তার ৭ বছরের কন্যা আয়েশা বেগম বিনতি দগ্ধ হয়ে মারা যায়, এছাড়া দুই কন্যাসহ অন্যরাও দগ্ধ হয়েছেন। পাশাপাশি উদীচীর মতো প্রাচীন সাংস্কৃতিক সংগঠনের ওপর হামলা ও অগ্নি সংযোগের ঘটনাগুলো জনমনে এমন ধারণাই স্পষ্ট করে তুলেছে যে, এ সবের কোনো কিছুই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, একের পর এক ঘটনাসমূহ পরস্পর সম্পর্কিত ও পূর্ব পরিকল্পিত। এই পূর্ব পরিকল্পনা দেশ বিদেশের নানা যোগাযোগ মাধ্যমে আগে থেকেই অনেক প্রচার করা হয়েছে। তারপরও সরকারের আইনশৃঙ্খলা ও দেশরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা কার্যত কোনো প্রচার আমলে না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকায় কেন থেকেছেন সেটাই আমাদের জিজ্ঞাসা।
আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই, জুলাই অভ্যুত্থানের যে পটভূমিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পেয়েছিলেন, বিশেষত এই সরকারের প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণের পরে জাতির উদ্দেশে দেয়া তার প্রথম ভাষণে জাতির কাছে যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তার মধ্যে মুক্ত গণমাধ্যম এবং নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল অন্যতম প্রধান। অথচ বিগত কয়েক মাস ধরে নানা ঘটনায় শান্তিপ্রিয় নাগরিক, লোকশিল্পী, বাউলগানের অনুষ্ঠান ইত্যাদির ওপর হামলার পাশাপাশি ভিন্নমতের, ভিন্ন ধর্ম বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অনেক ব্যক্তি ও সংস্থার ওপর প্রকাশ্যে আক্রমণ ও হত্যা পর্যন্ত চলেছে। সে সবের সুরক্ষা দেবার প্রশ্নে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বা কর্মকর্তারা নিষ্ক্রিয়ই শুধু থেকেছেন তাই নয়, এর জন্য জবাবদিহি করারও কাউকে পাওয়া যায়নি। অন্তবর্তী সরকারের এ সব ব্যর্থতার দায় নিয়ে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি করার জোর দাবি আমরা জানাচ্ছি।
এমন এক পরিস্থিতিতে যে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে তাকে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর করা কিভাবে সম্ভব হবে সে প্রশ্নই এখন মুখ্য। আমরা তাই দেশের মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সহিংসতা থেকে নিরাপত্তা এবং মুক্ত গণমাধ্যম ও স্বাধীনভাবে সংস্কৃতি চর্চার অধিকারের সুরক্ষা দেবার যে অঙ্গীকারের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পেয়েছিলেন, সেই অঙ্গীকার পূরণের লক্ষ্যে অবিলম্বে নিমোক্ত দাবিগুলো দৃঢ়ভাবে কার্যকর করার আহ্বান ও দাবি জানাচ্ছি।
১) অবিলম্বে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের গ্রেফতার এবং আইনী প্রক্রিয়ায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের বিচার করে প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচারের দাবি জানাচ্ছি।
২) দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলি স্টার এবং ছায়ানট ভবনের ওপর যারা হামলা করেছে দ্রুততম সময়ে তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার ও শাস্তি দিতে হবে।
৩) উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ব্যক্তি শিল্পী, লোকশিল্পী ও গ্রাম বাংলার সংস্কৃতি চর্চার ওপর ‘তৌহিদী জনতা’র নামে হামলা অবিলম্বে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। ইতিমধ্যে যে সব হামলা হয়েছে তার তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৪) একই সঙ্গে সংগঠিত, পূর্ব পরিকল্পিত সকল সহিংস আক্রমণ শক্ত হাতে দমনের দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি আমাদের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বপ্রাপ্ত, বিশেষত গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের উল্লেখিত সহিংসতার সময় ভূমিকা কি ছিল তাও নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
৫) সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং দেশের মানুষের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা সৃষ্টি জোরদার করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে স্ব স্ব অবস্থান থেকে এবং সম্মিলিতভাবে উল্লেখিত সকল বিষয়ে মনোযোগ দেবার অঙ্গীকারে একাত্ম হয়ে কাজ করারও আমরা জোর আহ্বান ও অনুরোধ জানাচ্ছি।
৬) আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয়, জেলা ও গ্রাম পর্যায়ে পর্যন্ত সকল ধর্ম-মত-দল-গোষ্ঠী-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মানুষের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সরকার, সকল প্রধান রাজনৈতিক দলগুলিকে দৃশ্যমান, কার্যকর ও সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। এই উদ্যোগের সঙ্গে নাগরিক সমাজ ও সাধারণ নাগরিকদের সম্পৃক্ত করতে হবে।
মনে রাখা জরুরি, সরকার কিংবা সরকারের অধীনস্ত বাহিনীর প্রধান ও সদস্যরা দেশবাসীর কাছে জবাবদিহি করতে ওয়াদাবদ্ধ। সেই ওয়াদা পূরণ না হলে জনমনে শুধু শঙ্কাই বাড়ে না, অনাস্থাও সৃষ্টি হয়। যা কারোর জন্যই মঙ্গলজনক নয়।‘
এই বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেছেন তারা হচ্ছেন—
১. আনু মুহাম্মদ, অর্থনীতিবিদ, সাবেক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
২. ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআই-বি
৩. রাশেদা কে. চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা
৪. শিরিন পারভীন হক, সদস্য, নারীপক্ষ
৫. ড. শাহদীন মালিক, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
৬. ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অনারারি নির্বাহী পরিচালক, ব্লাস্ট
৭. ড. শহিদুল আলম, আলোকচিত্রী ও লেখক
৮. ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নাট্যকর্মী
৯. শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি
১০. অ্যাডভোকেট তাসলিমা ইসলাম, আইনজীবী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও প্রধান নির্বাহী (ভারপ্রাপ্ত), বেলা
১১. অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১২. অ্যাডভোকেট তবারক হোসেন, সিনিয়র আইনজীব, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১৩. রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৪. ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৫. ড. জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৬. ড. মির্জা তাসলিমা ইসলাম, অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
১৭. পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক
১৮. রেজাউল করিম চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, কোস্ট ট্রাস্ট
১৯. জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ
২০. জবা তালুকদার, সমাজকর্মী
২১. অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান, প্রধান নির্বাহী, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন
২২. মিনহাজুল হক চৌধুরী, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
২৩. সাঈদ আহমেদ, মানবাধিকার কর্মী
২৪. হানা শামস আহমেদ, পিএইচডি গবেষক, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা
২৫. পুরবী তালুকদার, অধিকার কর্মী
২৬. মারজিয়া প্রভা, অ্যাকটিভিস্ট ও সদস্য গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি
২৭. মোশফেক আরা শিমুল, ফাউন্ডার ও নির্বাহী পরিচালক, স্পেস
২৮. ইসাবা শুহ্রাত, গবেষক
২৯. নাফিসা তাসনিম খানম তিশা, প্রকাশনা ও থিয়েটার কর্মী
৩০. জেসমিন দীনা রায়, শিক্ষক
৩১. ফেরদৌস আরা রুমী, লেখক ও অধিকার কর্মী
৩২. ফজিলা বানু লিলি, শিক্ষক, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি