এটি তার প্রথম লড়াই নয়। গত বছরও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। এক বছরের ব্যবধানে আবারো একই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরো বেশি শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
জ্বর ও নানা শারীরিক জটিলতা বাড়তে থাকায় পরিবারের সদস্যরা শেষ পর্যন্ত তাকে বরগুনার বেতাগী থেকে নিয়ে আসেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ছেলের শয্যার পাশেই বসে থাকা তার মা বলেন, ‘গত বছরও আমার ছেলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল। এবার আবারো হলো। আমাদের এলাকায় রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো নয়। অনেক জায়গায় ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে, কোথাও কোথাও দিনের পর দিন পানি জমে থাকে। এসব কারণেই মশার উপদ্রব বেড়েছে। তাই আমাদের ওখানে মানুষ বারবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে।’
একই চিত্র পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির তরুণ মুরসালিনের ক্ষেত্রেও। ডেঙ্গুর থাবায় হাসপাতালের শয্যায় থাকতে হচ্ছে তাকে। পৌর শহরের বাসিন্দা হলেও এলাকায় কখনো নিয়মিত মশক নিধন কিংবা পরিচ্ছন্নতা অভিযান চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ তার। মুরসালিন বলেন, ‘আমাদের ওখানে মশা বেশি। কখনো ওষুধ দিয়ে মশা নিধন করতে দেখিনি।’
পলাশ কিংবা মুরসালিনের মতো প্রতিদিনই অসংখ্য ডেঙ্গু রোগী ভিড় করছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোয়। দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে এসে নানামুখী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) গত বছরের জরিপে দেখা গেছে, বরিশাল বিভাগের অধিকাংশ বাড়িতেই এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি রয়েছে। ভৌগোলিক, সামাজিক ও পরিবেশগত কারণকে ডেঙ্গু বিস্তারের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে প্রশাসনের সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বরিশাল বিভাগে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ১৯ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং প্রাণ হারায় ৪৫ জন। ওই বছর বরগুনাকে ঘোষণা করা হয়েছিল ‘ডেঙ্গুর হটস্পট’। চলতি বছর বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৩৭১-এ পৌঁছেছে। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের। অথচ জুন পর্যন্ত এ বিভাগে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬২৯। অর্থাৎ, শুধু জুলাইয়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৭৪২ জন। আর এবার সংক্রমণের চিত্র বদলে সবচেয়ে বেশি রোগী মিলছে পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলায়।
স্বাস্থ্য বিভাগের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরে আক্রান্ত হয়েছেন ৯০৪ ও ঝালকাঠিতে ৭৯৫ জন। এছাড়া বরিশাল জেলায় ৪৬৪ জন, বরগুনায় ৩৭৯, পটুয়াখালীতে ৩৬৯, ভোলায় ১৩৯ ও পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলতি বছরে ভর্তি হয়েছে ১৯৩ জন। বিভাগে ছয়জনের মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে এ হাসপাতালে।
সর্বশেষ ৩০ জুলাই পিরোজপুরের কুড়িয়ানা এলাকার বাসিন্দা হালিমা বেগম (৫০) বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর আগে ২৬ জুলাই একই হাসপাতালে মারা গেছেন ঝালকাঠি সদর উপজেলার পোনাবালিয়া এলাকার রুপালী (২৬)। ঝালকাঠি হাসপাতালে মারা গেছে পুরাতন বাগানবাড়ী এলাকার নয় বছর বয়সী সুমাইয়া। আর ২৫ জুলাই বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার ভৈরবপাশা এলাকার বাসিন্দা মুন্নি খানম (৩৫)। এ নিয়ে গত সপ্তাহে বরিশালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আব্দুল মুনায়েম সাদ বলেন, ‘বর্ষাকালে ডেঙ্গু রোগী বাড়া স্বাভাবিক। রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিট চারটি থেকে ছয়টিতে উন্নীত করা হয়েছে। পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড না থাকলেও প্রতিটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু কর্নার চালু রয়েছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের (ভারপ্রাপ্ত) পরিচালক ডা. লোকমান হাকিম বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার বেড়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে বাসাবাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেয়ার বিষয়ে আরো সচেতন হতে হবে।’