কর্তৃত্ববাদ ও অর্থনৈতিক অনিয়মনির্ভর সেই শাসনের অবসানের পর রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কার, রাজনৈতিক সহাবস্থান এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া গতি পায়নি। অন্যদিকে রাজনীতিতে বিভিন্ন দলের মধ্যে দূরত্ব কমলেও মৌলিক অনেক মতভেদ অব্যাহত থাকে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর এবং নির্বাচিত সরকারের প্রায় ছয় মাস পার হলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতি পায়নি। বরং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। সরকারকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে হচ্ছে। এসব সংকটের প্রায় সবই বিগত স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে সৃষ্ট। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট, যার তাৎক্ষণিক সমাধান সরকারের হাতে নেই।
অবশ্য রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক তাত্ত্বিকরা মনে করেন, দীর্ঘ সময়ের স্বৈরশাসনের পতনের পর একটি দেশের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া সহজ হয় না। একজন স্বৈরশাসকের পতনের মাধ্যমে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনেই একটি দেশে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে না। কারণ কর্তৃত্ববাদী শাসন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করে, অর্থনীতিতে ক্ষত তৈরি করে, রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ায়, প্রশাসনিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। তাই স্বৈরশাসনের পতনের পর দেশের পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা অর্জন একটি দীর্ঘ ও কঠিন প্রক্রিয়া হতে পারে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশেও দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনে তৈরি হওয়া এ ধরনের লক্ষণ স্পষ্ট হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণে স্থবিরতা, বেসরকারি বিনিয়োগের মন্থর গতি এবং পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ ছিল। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। বরং কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়। বর্তমান নির্বাচিত সরকারকেও এসব সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে তাদের ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিকে বহুগুণ জটিল করে তুলছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংকট সমাধানে এরই মধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে কথা হয়েছে, সেখান থেকে ভবিষ্যতে গ্যাস পাওয়া যাবে। এছাড়া মিয়ানমার থেকেও গ্যাস আমদানির আলোচনা চলছে। পাশাপাশি আমরা যথাসম্ভব গ্রিন এনার্জি বা সৌরবিদ্যুৎ (সোলার সিস্টেম) ব্যবহারের দিকে জোর দিচ্ছি। অন্যদিকে বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে গ্যাস আমদানি করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই দেশের ভেতরের প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। তবে এসব সমস্যা তো একদিনের নয়, বরং বহুদিনের পুরনো। আশা করি আমরা এ সংকট সফলভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারব।’
বর্তমানে সামষ্টিক অর্থনীতির বড় উদ্বেগের একটি মূল্যস্ফীতি। ২০২৩ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি জনজীবনে বিপুল চাপ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় দুই অঙ্কের কাছাকাছি ছিল। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় কমে যায়, যা বেসরকারি খাতের উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিসুদ একাধিক দফায় বাড়ালেও উচ্চ আমদানি ব্যয়, টাকার অবমূল্যায়ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমে এলেও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অনেক ওপরে। সম্প্রতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিসুদ ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে।
দীর্ঘ স্বৈরশাসন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করে দেয়। স্বৈরশাসকের পতনের পর প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশামতো কার্যকর হয় না। দেশের রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি সে রকম বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা অন্যতম আর্থিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই ৮-৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায়ও কম। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আহরণ হয়েছে। রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের সক্ষমতাকে সীমিত করছে। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর আরো বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
স্বৈরশাসন ক্রোনি ক্যপিটালিজম তৈরি করে। অলিগার্করা অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নেয়। এতে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়। ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণে ভারাক্রান্ত হয়, বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট হয়। আওয়ামী শাসনে এ ধরনের সব সংকটই দেশে তৈরি হয়েছিল। স্বৈরশাসনের পতনের পর দ্রুতই এ কাঠামোগত সংকটের সমাধান হয় না।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এমন পরিস্থিতির আদর্শ উদাহরণ। বেশ কয়েক বছর ধরে উচ্চ খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিলের অপব্যবহার, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাব এবং কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট পুরো আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (ব্যাসেল-৩), শ্রেণীকরণ নীতি কঠোর করা এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিলেও এ খাতে স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। আর্থিক খাত শক্তিশালী না হলে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
দেশের বহিঃস্থ খাতেও একাধিক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। কয়েক বছর ধরে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপের কারণে বাংলাদেশকে বিনিময় হার ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে হয়েছে। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার, রফতানি আয় দেশে প্রত্যাবাসন এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবুও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে পর্যন্ত ১১ মাসে আমদানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল। একই অর্থবছরে পণ্য রফতানি আয় আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং আমদানি-রফতানির ভারসাম্য রক্ষা এখনো একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ।
বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়াও অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার জিডিপির প্রায় ২৩-২৪ শতাংশের মধ্যে স্থির রয়েছে। উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘসূত্রতা নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ১ শতাংশের নিচে থাকায় শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির গতি সীমিত রয়েছে।
শিল্প ও জ্বালানি খাতও উল্লেখযোগ্য চাপের মধ্যে রয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি, বিদ্যুতের উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, এলএনজি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ভর্তুকির চাপ শিল্প উৎপাদনকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, ইস্পাত, সিমেন্টসহ রফতানিমুখী শিল্পগুলো জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ করছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বখ্যাত রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার মতে, দীর্ঘ স্বৈরশাসন নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে, এমনকি নাগরিকদের নিজেদের মধ্যেও আস্থার সংকট তৈরি করে। এ সামাজিক পুঁজি পুনর্গঠন করতে বছরের পর বছর সময় লাগে।
আওয়ামী আমলে দেশের পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনায় সেখানে বিনিয়োগকারীদের বড় আস্থার সংকট তৈরি হয়। পুঁজিবাজার এখনো দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কার্যকর উৎস হয়ে উঠতে পারেনি। তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির দুর্বল করপোরেট সুশাসন, স্বল্প তারল্য, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সীমিত অংশগ্রহণ, বাজারে আস্থার সংকট এবং নতুন ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি কম হওয়ার কারণে বাজার তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছতে পারেনি। ফলে শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বড় অংশ এখনো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থানও সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সে তুলনায় মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ১০ হাজার। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এক দশকে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণের মধ্যে কর্মসংস্থান হয়েছে কেবল ৮৭ লাখের। বাকি প্রায় ৫৩ লাখ কাজের বাইরে থেকে গেছেন। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য জনমিতিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বিপুল পরিমাণ এই বেকার জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানো না গেলে তা সামাজিক অস্থিরতা তৈরির পাশাপাশি অর্থনীতির জন্যও বোঝা হয়ে উঠবে।
গত দুই বছরে বিভিন্ন কারণে শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে অনেকে কর্মহীন হয়েছেন। গতকাল রাজধানীর গুলশান ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সাংবাদিকদের জানান, গ্যাস সংকটে দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা ৩০-৪০ শতাংশ কমে গেছে। এ খাতে গত দুই বছরে বিভিন্ন কারণে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। ফলে প্রায় ৪০ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের ধীরগতির কারণে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ব্যবসা সম্প্রসারণে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘ সময় কর্মসংস্থান সংকট, দুর্বল বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণে স্থবিরতা শ্রমশক্তির দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
স্বৈরশাসকের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেয়ার পরই বলেছি যে একটা ভঙ্গুর অর্থনীতিকে উদ্ধার করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। প্রথম ধাপে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, আর পরবর্তী ধাপে প্রসপারিটি বা সমৃদ্ধির দিকে যাওয়া। দায়িত্ব নেয়ার পর এরই মধ্যে যে বড় ধরনের দায় রয়ে গেছে, তা তো আমাদের পরিশোধ করতেই হচ্ছে। আমার কাছে তো কোনো অলৌকিক জাদু নেই! দেনা শুধু বৈদেশিক নয়, দেশের ভেতরেও প্রচুর বাকি রয়ে গেছে। যেমন বিদ্যুৎ খাতে ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকার মতো বকেয়া রয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের তৈরি এ বিপুল দেনা আমাদের বহন করতে হচ্ছে এবং পরিশোধ করতে হচ্ছে।’
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি তেলে অতিরিক্ত ৪-৫ বিলিয়ন ডলার গুনতে হচ্ছে। এত খারাপ পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের বাজেট বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে এবং প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার প্রজেক্ট টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। অন্যদিকে প্রায় অর্ধেক ব্যাংকই চরম সংকটে ছিল, সেগুলোকে রিকভারি প্রোগ্রামের আওতায় আনা হয়েছে। এটি একটি সার্বিক ব্যাংকিং ডিজাস্টার ছিল, যা থেকে উত্তরণে ব্যাংক রেজল্যুশনের কাজ চলছে এবং এতে সময় লাগবে। এ বিরাট ঘাটতি রাতারাতি সরকার একা পূরণ করতে পারবে না; ব্যাংকগুলোকে পুনরায় ক্যাপিটালাইজ করতে হবে।’
তবে সংকটের মধ্যেও পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারের আশাবাদ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘তবে আশার কথা হলো আমাদের প্যাকেজ রিফর্ম পুরোপুরি শেষ না হলেও ক্যাপিটাল মার্কেট বা শেয়ারবাজার এরই মধ্যে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে এবং সূচক ওপরের দিকে যাচ্ছে। রিফর্মের মাধ্যমে স্টক মার্কেটকে নতুন করে সাজানো হচ্ছে। চারদিকে যে বহুমুখী সমস্যা ছড়িয়ে আছে, সেগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে অ্যাড্রেস করতে হচ্ছে। এটি তো কোনো স্বাভাবিক অর্থনীতি ছিল না, পুরো বিধ্বস্ত একটি অর্থনীতি ছিল। তাই এটাকে কেবল স্থিতিশীল করতেই আমাদের দুই বছর সময় লেগে যাবে।’
বাজেট ঘাটতি পূরণে ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতা ভবিষ্যতে ‘ঋণের অতিরিক্ত বোঝা’ সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় ২০২৪ সালের জুন শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। এর পরের অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ ঋণের পরিমাণ বেড়ে ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ২১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রক্ষেপণ বলছে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়াবে।
বড় ঋণ করে প্রকল্প নেয়া ছিল ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা সরকারের নীতি। তার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমপুঞ্জীভূত ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের চাপও ক্রমেই বাড়তে শুরু করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩০ কোটি টাকার সুদ পরিশোধ করেছে সরকার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সুদ বাবদ ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রয়েছে। ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় সীমিত হতে পারে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা; বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে আরো বাজারভিত্তিক করা, ভর্তুকি ব্যবস্থার যৌক্তিকীকরণ, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনীতির ঝুঁকিগুলো উঠে এসেছে। সম্প্রতি এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচক করেছে। তবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান ‘বি প্লাস’ এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণমান ‘বি’ বহাল রাখা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, ব্যাংক খাতের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈদেশিক খাতের ঝুঁকির কারণে আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি আরো মন্থর হতে পারে। একই সঙ্গে আগামী তিন বছরে দেশের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশে সীমিত থাকতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছে তারা।
সব মিলিয়ে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি বা বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল করায় সীমিত নয়; বরং স্বৈরশাসনে সৃষ্ট দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করে একটি টেকসই, প্রতিযোগিতামূলক ও সুশাসনভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে দেশ তিউনিসিয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে এগোবে কিনা—এমন প্রশ্নের সরল উত্তর দেয়া কঠিন। এ ধরনের সম্ভাবনা নির্ভর করে অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতার ওপর। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদি অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হয়, রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ে এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার বিলম্বিত হয়, তাহলে অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।’
অর্থনীতির আজকের সংকট বিগত স্বৈরশাসনের ফল হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) সদস্য সচিব আখতার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আমলে ৩০ লাখ কোটি টাকার পাচারই অর্থনীতিকে আজকের এ জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। সেই সঙ্গে বর্তমান সরকার দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই ৬৯ কিংবা ৭৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ঋণ গ্রহণ এবং এর প্রভাবের বিষয়ে জাতীয় সংসদে খোদ অর্থমন্ত্রীই উল্লেখ করেছেন। সেক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাত স্বচ্ছতার দিকে এগোলে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।’
ট্রানজিশন তত্ত্ব অনুযায়ী স্বৈরশাসনের পতনের পর রাষ্ট্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি বিভিন্ন পর্যায়ে, প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার শূন্যতা পূরণ করতে মুখোমুখি হয়ে যায়। এ রকম পরিস্থিতি দেশে অস্থিতিশীলতা বাড়ায়। তাই রাজনৈতিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা মনে করি, দেশ স্থিতিশীল থাকা না-থাকা মূলত ক্ষমতাসীন দলের ভূমিকার ওপরই নির্ভর করছে। বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত বা ১১ দলীয় জোটের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল এবং গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করার বিষয়ে আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সরকারের সব ভালো কাজে আমরা সহযোগিতা করব। এখন সরকার যদি আমাদের সহযোগিতা নিতে না চায়, কিংবা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা অর্থাৎ “জুলাই সনদ” ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে, তবে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা অপূরণীয় থেকে যাবে। এতে দেশ একটি সংঘাতের দিকে ধাবিত হতে পারে। দেশকে এমন সংঘাত থেকে ফেরানোর একমাত্র পথ হলো সরকারি দলের ইতিবাচক ভূমিকা এবং তা কেবল জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই সম্ভব।’