সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ বা প্রায় ১৭ কোটি। অথচ জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন ডেটাবেজে (বিডিআরআইএস) জন্মনিবন্ধনের সংখ্যা ২৪ কোটি ৮৮ লাখ বা প্রায় ২৫ কোটি। এ বিশাল অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বয়ং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, ‘১৭ কোটি মানুষের দেশে জন্মসনদ ২৫ কোটি, তাহলে আমরা কোন জায়গায় থাকলাম?’
‘জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে গতকাল এক আলোচনায় জাতীয় তথ্যে এমন অসংগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরাও। রাজধানীর একটি হোটেলে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় (জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন) এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।
নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন অসংগতি ও বিপুল ডুপ্লিকেশন শুধু সংখ্যারই বিভ্রান্তি নয়, বরং খাদ্যনিরাপত্তা, শিশুপুষ্টি, টিকাদান কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, রেজিস্ট্রার জেনারেল অফিস ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, সারা দেশের জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ম্যানুয়াল তথ্য ডিজিটাইজেশন হয় ২০১০ সালে। তখন প্রযুক্তিগত ভুলে তিন থেকে চার কোটি বাড়তি এন্ট্রি যুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে তৈরি বিডিআরআইএসেও একই ভুল থেকে যায়। এসব ভুল দূরীকরণে নতুন ডেটাবেজ সফটওয়্যারের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের সময় ইউনিসেফের সহযোগিতায় দেশে প্রথম সরকারিভাবে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
২০০৪ সালের জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন অনুযায়ী, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, বিয়ে নিবন্ধন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং জমি নিবন্ধনে বয়স প্রমাণের জন্য জন্মসনদ ব্যবহার বাধ্যতামূলক। শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেখানে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ স্বেচ্ছায় ও সঠিক নিয়মে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন করেন। বাকি ৯৫ শতাংশ করেন বাধ্য হয়ে।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনে তথ্যদূষণ দূর না করলে সরকারের লক্ষ্য প্রতিটি নাগরিকের জন্য একক ডিজিটাল পরিচয় “ওয়ান সিটিজেন ওয়ান আইডি” পরিকল্পনা ঝুঁকিতে পড়বে। কেননা জন্মনিবন্ধনই হবে এর সূচনাবিন্দু। সেজন্য মাঠপর্যায়ের সব অনিয়ম বন্ধে আগামী ডিসেম্বরে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের নিয়ে বিশেষ সম্মেলনের পরিকল্পনাও রয়েছে।’
রেজিস্ট্রার জেনারেলের অফিসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, ডেটাবেজে অসংখ্য দ্বৈত বার্থ সার্টিফিকেট রয়েছে। কেউ ঢাকার বাইরে থেকে নিয়েছে, আবার ঢাকা থেকেও নিয়েছে। তিনি জানান, সন্তানকে ভালো স্কুলে বা ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য বয়স কমানো এবং বিদেশে চাকরির জন্য বয়স বাড়ানো বা কমানো—এমন নানা কারণে মানুষ একাধিকবার জন্মনিবন্ধন তৈরি করে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সন্তানদেরও একাধিক জন্মসনদ থাকার উদাহরণ রয়েছে।
আইসিটি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা উল্লেখ করেন, ২০১০ সাল থেকে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন শুরুর পর ১৫ বছর পার হয়েছে। শুধু প্রযুক্তি তৈরি করলেই হয় না, তা নাগরিকবান্ধব কিনা তা মূল বিবেচ্য। বর্তমানে বিডিআরআইএস ডেটাবেজটি ২২টি সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত। একক ডেটাবেজ ব্যবহার নিশ্চিত করতে একটি ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি করা হচ্ছে।
এ নিয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেল ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিডিআরআইএস সার্ভারের তথ্যদূষণ দূর করে নির্ভুল ডেটাবেজ তৈরি না করলে সরকারের পরিকল্পনা ঝুঁকিতে পড়বে। সেজন্য এরই মধ্যে দেশের সব থেকে বড় ডেটাবেজ বিডিআরআইএসের সেকেন্ড ভার্সন করার জন্য আমরা মন্ত্রণালয় থেকে নীতিগত অনুমোদন পেয়েছি এবং সেটির ডিপিপি পাস হয়েছে। ফলে আমরা বিডিআরআইএস ভার্সন-২ শুরু করতে পারব, যেখানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও আইরিস আইডিসহ অন্যান্য সুবিধা যুক্ত থাকবে। এতে জন্মনিবন্ধনের ভোগান্তি ও জালিয়াতি বন্ধ হবে।’
নতুন করে দ্বৈত ও ভুয়া নিবন্ধন ঠেকাতে সংশোধন ফি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেল বলেন, ‘বর্তমানে বিলম্বিত নিবন্ধনের ফি মাত্র ৫০ টাকা এবং সংশোধনের ফি ২০-১০০ টাকা হওয়ায় ইউনিয়ন পর্যায়ে ভুয়া নিবন্ধনের একটি বড় সমস্যা রয়েছে। মানুষ বারবার ভুল তথ্য দিয়ে একাধিক নিবন্ধন করছে।’
সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমেই এত বড় অসংগতি দূর করা সম্ভব কিনা জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুধু নতুন সফটওয়্যার বা নতুন ভার্সন তৈরি করাই এ সমস্যার আসল সমাধান নয়। বাংলাদেশে প্রতিটি সেবা বা দপ্তরের ডেটাবেজ আলাদাভাবে ঠিক করতে যাওয়াটাই মূল সমস্যা। বর্তমানে এনআইডি ও ইউনিভার্সাল বা ইউনিফায়েড আইডির কথা বলা হচ্ছে। বিশ্বের বহু উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে একক সিটিজেন নম্বর চালু রয়েছে, যেখানে নাগরিকদের সব তথ্য সংরক্ষিত থাকে। সিস্টেমের ডিজাইন যদি সঠিকভাবে করা যায়, বিষয়টি স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত আলোচনায় রাখা হয় এবং সততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হয়, তবে বিদ্যমান প্রযুক্তি দিয়েই জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে এনআইডি ও অন্যান্য ডেটাবেজ সমন্বয় করা সম্ভব। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল বা বাসায় বসে করার মতো জটিল কোনো প্রযুক্তি নয়। ব্লকচেইন, মেশিন লার্নিং কিংবা এআই ব্যবহার করে সহজেই এ সমন্বয় সাধন করা যায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন একটি “ইন্টিগ্রেটেড ডেটা সিস্টেম” তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি, যেখানে জন্মনিবন্ধন, এনআইডি, পাসপোর্ট, ট্যাক্স তথ্য, সম্পদের হিসাব ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট যুক্ত থাকবে। এতে নাগরিকদের হয়রানি কমবে এবং কেবল একটি আইডি বা পাসপোর্ট নম্বর দিয়েই সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে। তবে এ ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, প্রাইভেসি ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোও এ নিরাপত্তা মেকানিজম নিয়ে কাজ করছে এবং বাংলাদেশেও এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার মতো দক্ষ জনবল রয়েছে।’