ফলে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে কম খরচে কৃষিকাজে সেচ সুবিধা নিশ্চিতের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই খাল ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় বিস্তীর্ণ ফসলি জমি জলাবদ্ধতায় অনাবাদি থাকছে।
কৃষকরা জানান, শুষ্ক মৌসুমে খালগুলো ধু-ধু করে। ফলে সেচের ক্ষেত্রে কোনো কাজে আসে না। তবে যেসব খালের তলদেশ পুরোপুরি ভরাট হয়নি, বর্ষা মৌসুমে সেগুলো দিয়ে পানি নিষ্কাশন হওয়ায় উপকৃত হন তারা। বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, যশোরে গত সাত-আট বছরে ১১ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩১টি খালের ৯৬ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হয়েছে। প্রতি কিলোমিটার পুনঃখননে ব্যয় হয়েছে ১২ লাখ টাকা। ‘বৃহত্তর খুলনা-যশোর জেলা ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় এ পুনঃখনন সম্পন্ন হয়। এছাড়া নতুন করে আরো ৭৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটার খননে সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ লাখ টাকা।
সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, যশোরের চৌগাছা উপজেলার দুটি ইউনিয়ন—ফুলসারা ও পাশাপোলের ৮ কিলোমিটারজুড়ে থাকা বাওটির খালের তলদেশে শ্যাওলা, ঘাস ও কাদাপানিতে ভর্তি। পাশাপোল ইউনিয়নের বিল এড়োর খালেরও জীর্ণদশা। ফলে শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু করে এ খাল। খালটির তলদেশ কাদামাটি জমে ভরাট হয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, ভরাট খাল দিয়ে বর্ষা মৌসুমে পানি বের হয় না। ফলে রানিয়ালি, কালিয়াকুন্ডি, বিল এড়োর ও বড়গোবিন্দপুরের ফসলের মাঠ তলিয়ে যায়। এতে হাজার হাজার বিঘা জমি অনাবাদি থাকে।
স্থানীয় কৃষক নূরুল ইসলাম বলেন, ‘মূল খালটি খনন করা হলেও এর সঙ্গে সংযুক্ত আরো আটটি খালের একটিও পুনঃখনন করা হয়নি। এমনকি বাওটির খাল খননের পর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। যার কারণে জগন্নাথপুর, ফুলসারা, সলুয়া, বাড়িয়ালি, হাউলি ও দশপাখিয়ার বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ বর্ষা মৌসুমে পানির তলে থাকে।’
দুড়িয়ালি গ্রামের কৃষক হরিপদ বিশ্বাস বলেন, ‘একটু বৃষ্টি হলেই সব ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। এ এড়োর খাল দিয়ে মোট ১৮টি মৌজার পানি বের হয়। কিন্তু খালের গভীরতা হারিয়ে যাওয়ায় এখন তা আমাদের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিলে আমরা কৃষকরা অনেক উপকৃত হব।’
বিল এড়োর এলাকার কালিয়াকুন্ডি গ্রামের কৃষক আলী রেজা রাজু বলেন, ‘বাড়ির পাশের খাল থেকে পূর্বপুরুষরা স্যালো মেশিন দিয়ে পানি তুলে জমিতে সেচ দিতেন। তখন জমি ভরপুর ফলন দিত। কিন্তু গত ৫০ বছরে খালটি আর খনন না হওয়ায় গভীরতা হারিয়েছে। এখন হাজার হাজার বিঘা জমির আবাদ হুমকির মুখে।’
বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের জেলা সম্পাদক ও ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা তসলিম উর রহমান বলেন, ‘খাল পুনঃখননে অনেক টাকা ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু এ খনন কোনো কাজে আসছে না। কারণ খালে পানি না থাকায় সেচ দেয়া যায় না। বলতে গেলে, খালগুলো শুধু বিলে জমে থাকা পানি বের হওয়ার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। অর্থাৎ এগুলো ড্রেনেজ সিস্টেমের কাজ করছে।’
ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ছোলজার রহমান বলেন, ‘খালগুলোতে যদি পানি সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিক থাকবে। খালের পানিতে প্রচুর পরিমাণে পলি ও জৈব পদার্থ থাকায় সারের চাহিদা কমে আসবে। উৎপাদন খরচ কমবে এবং ফসলের গুণগত মানও ভালো হবে।’
বিএডিসি যশোর অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মাজহারুল ইসলাম জানান, খননের পর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো বাজেট থাকে না। কৃষকরা বর্ষা মৌসুমে খালে পাট জাগ দেয়ার সময় মাটি ব্যবহার করেন। সেগুলো খালের তলদেশে জমে ভরাট হয়ে যায়।