জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত ডিভাইডার ও নিরাপত্তাবেষ্টনী সংস্কার হয়নি এখনো

দড়ি-বাঁশ দিয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী, ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার

গত বছর জুলাই আন্দোলনের অন্যতম হটস্পট ছিল রাজধানীর বাড্ডা-রামপুরা। আন্দোলনের সময় কুড়িল থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গত বছর জুলাই আন্দোলনের অন্যতম হটস্পট ছিল রাজধানীর বাড্ডা-রামপুরা। আন্দোলনের সময় কুড়িল থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখানে সড়ক বিভাজক, এর ওপর লোহার গ্রিলের নিরাপত্তাবেষ্টনী, সড়ক বাতির খুঁটি থেকে ম্যানহোল সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে গণ-অভ্যুত্থানের পর এক বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও এখনো সংস্কার হয়নি মহাসড়কের এসব অংশ। সড়ক বিভাজক মেরামত হয়নি, বসেনি নিরাপত্তাবেষ্টনী, কোথাও কোথাও দড়ি দিয়ে সড়ক বিভাজকের ওপর বেষ্টনী দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ দড়ির বেষ্টনী স্বাভাবিকভাবেই পথচারীদের অননুমোদিত ও ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা পারাপার বন্ধ করতে পারছে না। মানুষজন ব্যস্ত জায়গায়ও দড়ি টপকে সড়ক পার হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সড়কে যানবাহনের গতিও হ্রাস পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় নাগরিকরা বলছেন, দড়ি ও বাঁশ দিয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী কোনো আধুনিক শহরে থাকতে পারে না। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ মহাসড়ক সংস্কারের দাবিও তাদের। তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলছেন, এ সড়ক দিয়ে মেট্রোরেলের লাইন তৈরি হবে। সেজন্য তারা এখানে সংস্কার বাবদ কোনো অর্থ ব্যয় করবেন না।

গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, কুড়িল থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত মহাসড়কটির মাঝখানের বিভাজকে থাকা লোহার গ্রিলের নিরাপত্তাবেষ্টনীগুলো ভাঙা। বাড্ডা, মেরুল বাড্ডা ও আফতাবনগর গেটের সামনের অংশের সড়ক বিভাজকে দড়ি ও বাঁশ বেঁধে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। কিছু অংশে কাঁটাতার বসানো। কোথাও কোথাও রাস্তার পাশের ম্যানহোলগুলো অরক্ষিত অবস্থায় আছে। নর্দ্দা, কুড়িল, বাড্ডা লিংক রোড এলাকায় সড়কে অধিকাংশ স্থানে কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই। বাড্ডা লিংক রোড থেকে গুদারাঘাট পর্যন্ত সড়কটির মাঝের বিভাজকে দড়ি বেঁধে নিরাপত্তাবেষ্টনী দেয়া হয়েছে। যদিও দেখা যায় মানুষ এ দড়ি টপকে রাস্তা পারাপার হচ্ছে। এভাবে রাস্তা পারাপারে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে যানবাহন চলাচলের গতি কমছে বলে মনে করেন চালকরা।

বিমানবন্দর-বাড্ডা হয়ে গুলিস্তান রুটে চলাচল করা ভিক্টর ক্ল্যাসিক বাসের এক চালক বলেন, ‘ঢাকার রাস্তায় গাড়ি চালানো খুব ঝুঁকির। হুট করে সামনে পথচারী ও ছোট গাড়ি চলে আসে। রিকশা আমাদের জন্য আতঙ্ক তৈরি করেছে। এর মধ্যে এ রাস্তায় ডিভাইডার (বিভাজক) ভাঙা থাকায় মানুষ যে যেভাবে পারছে সেভাবে রাস্তা পার হচ্ছে। একটু অসচেতন হলেই দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। রোড ডিভাইডারে নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।’

মধ্য বাড্ডা এলাকায় বসবাসরত তরুণ আবু হানিফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ সড়ক, সড়ক বিভাজকের বেষ্টনী, ল্যাম্পপোস্ট সবই গত বছরের আন্দোলনের সাক্ষী। রাস্তার সড়ক বিভাজকগুলো সে সময় নষ্ট হয়েছে। দেশ এখন শান্ত। এগুলো মেরামত করা দরকার। নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকায় ব্যস্ত জায়গা দিয়েও মানুষ রাস্তা পারাপার হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। গাড়ির গতিও ধীর হয়ে যাচ্ছে। এভাবে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’

বাড্ডা লিংক রোড এলাকার ইয়াসির রহমান বলেন, ‘দড়ি দিয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী দেয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও বাঁশ-ডালপালা দেয়া হয়েছে। সড়ক বিভাজকের বেশির ভাগ এখনো ‍উন্মুক্ত রয়ে গেছে। এমনিতে রাজধানীর মানুষ ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করতে চায় না। সবাই শর্টকাটে চলতে চায়। এভাবে বিভাজক ভাঙা থাকায় মানুষ ট্রাফিক নিয়ম ভাঙতে আরো বেশি উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। এ কারণে এ সড়কে যানজট বাড়ছে।’

দ্রুতই এ সড়কের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সড়ক বিভাজকের নিরাপত্তাবেষ্টনী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেটি পুনর্নির্মাণের আগ পর্যন্ত সাময়িক সময়ের জন্য বাঁশ ও দড়ি ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এমনটা করার যৌক্তিকতা নেই। যত দ্রুত সম্ভব নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণ করা হোক সেটিই চাই।’

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্পটি এ মহাসড়ক ধরেই করা হবে। এতে সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। সেজন্য নতুন করে এ মহাসড়ক সংস্কারে কোনো খরচ করা হবে না জানিয়ে ঢাকা ‍উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পান্থপথসহ বিভিন্ন এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো মেরামত করা হয়েছে। কুড়িল-রামপুরা মহাসড়কটি মেরামত করা হবে না। এ মহাসড়ক দিয়ে মেট্রোরেলের (পাতাল রেল) লাইন হবে। মেট্রোরেল হলে মহাসড়ক ভাঙতে হবে। সেজন্য এখানে সিটি করপোরেশন কোনো খরচ করবে না। এ সড়কে এখন খরচ মানে অপচয়। কয়দিন পরে যেহেতু ভাঙাই হবে সেজন্য কোটি কোটি টাকা জলে ফেলার মানে হয় না।’

সাময়িক ব্যবহারের জন্য কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো বেষ্টনীই আর আমরা করব না। বিভিন্ন জায়গায় মেট্রোর কাজ (ইউটিলিটি স্থানান্তর) শুরু হয়ে গেছে। পুরোদমে কাজ শুরু হলে সড়কও ভাঙা লাগবে।’

আরও