ভারতের জিডিপি পরিসংখ্যান ‘সি’ গ্রেডের, বাংলাদেশের মান আরো নিচের হতে পারে?

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মূল্যায়নে ভারতের জাতীয় হিসাবের পরিসংখ্যানকে, যার মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) রয়েছে, ‘‌সি’ গ্রেড দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশটির মূল্যস্ফীতির তথ্যে ‘সমস্যা’ খুঁজে পেয়েছে সংস্থাটি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মূল্যায়নে ভারতের জাতীয় হিসাবের পরিসংখ্যানকে, যার মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) রয়েছে, ‘‌সি’ গ্রেড দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশটির মূল্যস্ফীতির তথ্যে ‘সমস্যা’ খুঁজে পেয়েছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জিডিপি ও মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা ও যথার্থতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। ভারত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ পদ্ধতি, প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও আইএমএফের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন গ্রেড পেয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্তের মূল্যায়ন করা হলে তা ভারতের চেয়ে আরো খারাপ অবস্থানে থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আইএমএফ সম্প্রতি তাদের বার্ষিক মূল্যায়নে ভারতের জিডিপি ও জাতীয় হিসাবের তথ্যকে ‘‌সি’ গ্রেড দিয়েছে। এই গ্রেড দিয়ে সংস্থাটি বলছে যে এসব তথ্যে এমন কিছু সমস্যা রয়েছে যা ভারতের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি অনুধাবনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এক্ষেত্রে পুরনো ভিত্তিবছর (২০১১-১২), জিডিপি হিসাবের পদ্ধতিতে অমিল, যথাযথ মূল্যসূচক না থাকা এবং তথ্য যথেষ্ট বিস্তারিত না হওয়ার মতো ঘাটতির উল্লেখ করেছে আইএমএফ। অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির বিস্তারিত বিশ্লেষণের জন্য বিনিয়োগের খাতভিত্তিক আরো বিস্তারিত তথ্য এবং উৎপাদন ও ব্যয়ভিত্তিক জিডিপির আরো সূক্ষ্ম বিভাজন প্রয়োজন বলে জানিয়েছে আইএমএফ।

বিশ্বব্যাংকের ‘মেথডোলজি অ্যাসেসমেন্ট অব স্ট্যাটিস্টিক্যাল ক্যাপাসিটি স্কেল’ শীর্ষক জরিপে দেখা যায় পরিসংখ্যানগত সক্ষমতার পদ্ধতিগত মূল্যায়নে বিশ্বব্যাপী গড়ের তুলনায় মাঝারি স্তরের সক্ষমতা রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর। যেখানে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল ও ভুটানের তুলনায় পিছিয়ে বাংলাদেশ। ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ৩০। যেখানে শ্রীলংকার ৫০ এবং ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানের স্কোর ৪০ ও আফগানিস্তানের স্কোর ২০। এছাড়া সেনেগালের স্কোর ৪০, মিসরের ৮০, মরক্কোর ৬০ ও নামিবিয়ার ৪০। শীর্ষে থাকা দেশের মধ্যে চীনের স্কোর ১০০, জার্মানির ৯৮, যুক্তরাষ্ট্রের ৯৫ ও দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর ৯০।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় পরিসংখ্যান সক্ষমতা নিয়ে কাজ করে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর অফিশিয়াল স্ট্যাটিস্টিকস (আইএওএস) ও বিশ্বব্যাংক। ২০২৪ সালে আইএওএসের ‘কান্ট্রি স্ট্যাটিস্টিক্যাল ক্যাপাসিটি: আ রিসেন্ট অ্যাসেসমেন্ট টুল অ্যান্ড ফিউচার রিফ্লেকশন অন দ্য ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পরিসংখ্যান সক্ষমতায় বাংলাদেশের স্কোর ৭০ দশমিক ৮। যেখানে সর্বোচ্চ স্কোর লুক্সেমবার্গের ৯১ দশমিক ৫। এছাড়া মালয়েশিয়ার স্কোর ৮০ দশমিক ৪, শ্রীলংকার ৮০ দশমিক ২ ও ভারতের ৭৩ দশমিক ৬। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের স্কোর ৬৮ দশমিক ৬ ও মালদ্বীপের ৬৫ দশমিক ৩। এসব মূল্যায়নকে বিবেচনায় নিলে পরিসংখ্যানের মানে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের অনেক নিচে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের সরকারি পরিসংখ্যান দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপির তথ্যে নেই বাস্তব চিত্রের প্রতিফলন। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি সরকারের নানা পর্যায় থেকেও জিডিপির তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বলা হয়েছে, উন্নয়নের বয়ান তৈরির জন্য জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকার।

দেশী-বিদেশী বিভিন্ন নথিতে পাওয়া তথ্য এবং অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে বাংলাদেশের জিডিপির প্রকৃত আকার ৩০০-৩৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। যদিও তা দেখানো হচ্ছে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অতিরঞ্জিত করে দেখাতে বিগত সরকার দেশের জিডিপি পরিসংখ্যানকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারও এসব পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কাজ না করে বরং আগের ধারায় জিডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যানের গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও প্রাপ্যতা পর্যালোচনা করে প্রতিষ্ঠানটিকে শক্তিশালী করতে চলতি বছরের এপ্রিলে আট সদস্যবিশিষ্ট একটি টাস্কফোর্স গঠন করে সরকার। গত ২০ অক্টোবর পরিসংখ্যান দিবসে টাস্কফোর্স তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিমাত্রায় প্রকল্পনির্ভর সংস্কৃতির কারণে বিবিএস তাদের মূল কাজ—নিয়মিত ও নিরপেক্ষ পরিসংখ্যান প্রণয়ন থেকে অনেকটাই বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ের জরিপ যেমন দুর্বল হয়েছে, পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত এবং সদর দপ্তরকেন্দ্রিক কাজের প্রবণতা বেড়েছে। তাছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব, জটিল আমলাতন্ত্র ও দাতানির্ভরতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি তথ্যের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে পারছে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

টাস্কফোর্সের সদস্য ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনুস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তথ্য-উপাত্তের ক্ষেত্রে বিবিএস কিন্তু আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পদ্ধতি অনুসরণ করে। আমরা বিবিএসের করা ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিংসহ বিভিন্ন জরিপের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখেছি। এক্ষেত্রে কিছু অদক্ষতা ছাড়া বড় কোনো সমস্যা নজরে আসেনি। তারা কিছু জরিপে ছোট আকারের স্যাম্পল ব্যবহার করেছিল। আমরা এটিকে আরো বড় পর্যায়ে করার সুপারিশ করেছি। তবে সংস্থাটি যদি কোনো ধরনের বানোয়াট তথ্য-উপাত্ত তৈরি করে তাহলে সেটি ফরেনসিক তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা হোক।’

তিনি মনে করেন, বিবিএসের উচিত তারা যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করে এবং যেসব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান তৈরি করে সেগুলো সবার জন্য প্রকাশ করা। তাহলে অর্থনীতিবিদ, গবেষক, গণমাধ্যমসহ যে কেউ সেগুলোর যথার্থতা যাচাই করে দেখতে পারবেন।

বিগত সরকারের সময়ে রফতানি আয়ের অতিরঞ্জিত তথ্যের মাধ্যমেও জিডিপির তথ্য বেশি দেখানো হতো। এ কারণে প্রতি বছরই ব্যালান্স অব পেমেন্টে (বিওপি) ট্রেড ক্রেডিটে বড় অংকের ঘাটতি তৈরি হতো। রফতানির অর্থ প্রত্যাবাসিত না হওয়ার কারণে এ ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে বিগত সরকারের সময়ে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট করার চাপ দেয়া হলে সরকারের পক্ষ থেকে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। তখন দেখা যায়, হিসাবায়ন পদ্ধতির ত্রুটির কারণে বছরের পর বছর ধরে রফতানির আয় বেশি দেখানো হয়েছে। এ ত্রুটি সংশোধন করার পর দেখা যায় ২০২৩-২৪ হিসাব বছরে ৫ লাখ ২৩ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকার পণ্য ও সেবা রফতানি হয়েছে। যদিও আগের হিসাব অনুসারে এর পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৬৩ হাজার ১২ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে রফতানি বেশি দেখানো হয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা। রফতানি আয়ের এ তথ্য সংশোধনের পর বিবিএসের চূড়ান্ত হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে দেশের জিডিপির আকার ৪৫ হাজার কোটি টাকা কমে ৫০ লাখ ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা বা ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এর আগে সাময়িক হিসাবে বিবিএস ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জিডিপির আকার ৪৫৯ বিলিয়ন ডলার দেখিয়েছিল।

অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা থাকে জিডিপির। বৈশ্বিকভাবে জিডিপির অনুপাতের সঙ্গে ঋণ কিংবা রফতানি থেকে শুরু করে রাজস্ব আয়সহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক নির্দেশকের তুলনা করা হয়। গত দেড় দশকে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারেননি দেশী-বিদেশী অর্থনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকরা। একটি দেশের ঋণের নিরাপদ সীমা কত হবে, রফতানি আয় পর্যাপ্ত কিনা, ব্যয় মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব আহরণ হচ্ছে কিনা—এ সবকিছু পরিমাপ করা হয় জিডিপির অনুপাতে। ফলে জিডিপির তথ্য অতিরঞ্জিত হলে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এসব নির্দেশকও ভুল তথ্য দেয়। বিগত সরকার ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখাতে জিডিপি বাড়িয়ে দেখিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩-২৪-এর তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ বেড়ে ৪৬২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। অথচ গত অর্থবছরের প্রায় পুরোটা সময় অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পার করেছে দেশের অর্থনীতি। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের মন্দার পাশাপাশি কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির এ তথ্য অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের (আইএসআরটি) অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদাত হোসেন বিবিএসকে শক্তিশালী করতে গঠিত টাস্কফোর্সের একজন অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিংয়ের ক্ষেত্রে ৮০-৯০টি নির্দেশকের তথ্য-উপাত্ত বিবেচনায় নিতে হয়। বিবিএস কিন্তু এসব নির্দেশকের সবগুলো নিজেরা করে না। তারা বিভিন্ন উৎস থেকে এগুলো সংগ্রহ করে। এক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন সংস্থাও জড়িত। ফলে ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিংয়ের ক্ষেত্রে গুণগত মান নিশ্চিত করার একটি প্রভাব থাকে। প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিগত দিক দিয়ে আমরা তেমন সমস্যা খুঁজে পাইনি। তবে তথ্য-উপাত্তের উৎসে সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকলে এর গুণগত মান খারাপ নাকি ভালো সেটির ময়নাতদন্ত করা সম্ভব নয়।’

পরিস্থিতির উন্নয়নে করণীয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একটি দেশের পরিসংখ্যান ব্যবস্থা অনেক বিস্তৃত। এটিকে সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে একটি ডাটা ব্যাংক করতে হবে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় পরিসংখ্যান বিষয়ে দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয়ে আমরা টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে সুপারিশ করেছি। জরিপের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে জনবলকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। তা না হলে জরিপের পদ্ধতি ও বিশ্লেষণ ভালো হলেও এর গুণগত মান নিয়ে ঝুঁকি থেকে যাবে।’

ভারতের মূল্যস্ফীতির তথ্যে সমস্যা খুঁজে পেয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মূল্যায়নে ভারতের প্রধান মূল্যস্ফীতি সূচক, অর্থাৎ ভোক্তা মূল্যসূচক ‘বি’ গ্রেড পেয়েছে। এর অর্থ তথ্য মোটামুটি ভালো, কিন্তু এতে ঘাটতি আছে। এক্ষেত্রে আইএমএফ বলছে, দেশটির মূল্যসূচকের ভিত্তিবছর পুরনো, ২০১১-১২ সালের। মূল্যস্ফীতির বাস্কেটে থাকা পণ্যের সংখ্যা ও ভর পুরনো নমুনা অনুসারে নির্ধারিত, যা বর্তমান ভোক্তাদের প্রকৃত ব্যয় অভ্যাসের সঙ্গে মিলছে না।

বাংলাদেশে বিবিএসের পরিসংখ্যানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। চালসহ খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি স্বাভাবিকভাবে বাড়ার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি হিটম্যাপ অনুযায়ী, খাদ্য মূল্যস্ফীতি হিসাবের ক্ষেত্রে চালের ভর ধরা হয় ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বাজারে চালের দাম বেশি থাকলেও বিবিএসের হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমে যায়।

মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতির বাস্কেটে ৭৪৯টি পণ্য যুক্ত করা হয়েছে। এখানে আলমারি, ল্যাপটপ, চেয়ার-টেবিল থেকে এমন অনেক পণ্য রয়েছে, যা হয়তো কেউ জীবনে একবার ক্রয় করেন। আগে এতে ৪২০টি পণ্য ছিল। কিন্তু এখন অনেক পণ্য থাকায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও তা মূল্যস্ফীতিতে তেমন প্রভাব ফেলে না। যদি অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের হিসাবে মূল্যস্ফীতি প্রকাশ করা হয়, তাহলে তা বর্তমান হারের কয়েক গুণ হয়ে যাবে।

সম্প্রতি দেশের জনসংখ্যার পরিসংখ্যানসংক্রান্ত বিবিএসের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা অনুযায়ী দেশে মোট জনসংখ্যা ১৯ কোটি। যেখানে বিবিএসের স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসভিআরএস) ২০২৩-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার।

আইএমএফের মূল্যায়নে ভারতের সরকারি আর্থিক পরিসংখ্যান এবং মুদ্রা ও আর্থিক পরিসংখ্যান কাভারেজের দিক দিয়ে ‘‌সি’ গ্রেড পেয়েছে। বাংলাদেশে বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমিয়ে দেখানোর পাশাপাশি সঞ্চিতি সংরক্ষণে ছাড় দেয়ার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর মুনাফা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। এ অবস্থায় দেশের সরকারি আর্থিক পরিসংখ্যান ও ব্যাংক খাতের পরিসংখ্যানের তথ্যের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে এখনো পুরোপুরিভাবে আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুসরণ করে ব্যাংক খাতে সম্পদ শ্রেণীকরণ করা হয় না। এটি করা হলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আরো বাড়ার পাশাপাশি মুনাফা কমবে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

দেশের জনমিতি, স্বাস্থ্য, শিল্প ও শ্রম, জাতীয় হিসাব, মূল্য ও মজুরি, শিল্প উৎপাদন ও মূল্যসূচক, দারিদ্র্য, পরিবেশ, জেন্ডার ও কৃষিবিষয়ক পরিসংখ্যান সংগ্রহ ও তথ্য পর্যালোচনা করা বিবিএসের মূল কাজ। সংস্থাটির এসব তথ্য-উপাত্তের ওপর নির্ভর করে সরকার ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিকৌশল নির্ধারিত হয়। ফলে এসব তথ্য-উপাত্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ও আস্থার সংকট থাকলে এগুলোর ওপর ভিত্তি করে নেয়া নীতিকৌশলও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ত্রুটিপূর্ণ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে নেয়া নীতিকৌশলের কার্যকারিতার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়।

খোদ বিবিএস পরিচালিত এক জরিপে সংস্থাটির তথ্যকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ব্যবহারকারী—এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি পরিসংখ্যান নিয়ে তাদের অবিশ্বাস সবচেয়ে বেশি। সংশয় রয়েছে বিবিএসের অন্য সব তথ্য নিয়েও। বিআইডিএসের সঙ্গে যৌথভাবে বিবিএসের এ জরিপ পরিচালিত হয়। শিক্ষাবিদ, গবেষক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও উন্নয়ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এ জরিপে অংশ নেন। ‘‌ব্যবহারকারী সন্তুষ্টি জরিপ-২০২৪’ শীর্ষক এ জরিপে উঠে আসে মোট ব্যবহারকারীর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ দশমিক ১৬ শতাংশ বিবিএসের মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। এর পরই ২৬ শতাংশ মানুষ ন্যাশনাল অ্যাকাউন্ট পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দিহান। এর মাধ্যমে জিডিপির হিসাব-নিকাশ করা হয়। আর ২৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ মানুষ আয় ও দারিদ্র্যের হিসাব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ে সন্দেহ রয়েছে ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশ মানুষের। ২৩ শতাংশের বেশি মানুষ শিল্প, শ্রম ও শিক্ষাবিষয়ক পরিসংখ্যান নিয়ে দ্বিধায় থাকেন।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের এখানে তথ্য-উপাত্তের গুণগত মান নিয়ে আগে থেকেই সমস্যা ছিল। সরকারের দিক থেকে তথ্য-উপাত্তের মান উন্নত করার চেষ্টা হচ্ছে। এজন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনও জমা দেয়া হয়েছে। তবে বিবিএস এখনো আগের পদ্ধতি ব্যবহার করছে এবং সেটি নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। আইএমএফ যেহেতু বাংলাদেশের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে এ ধরনের কোনো মূল্যায়ন এখনো করেনি, সেহেতু এক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান কী সেটা বলা মুশকিল। তবে আমি মনে করি তথ্য-উপাত্তের গুণগত মানের দিক দিয়ে আমাদের অবস্থান ভারতের সমপর্যায়ে হবে না, বরং খারাপই হবে। ভারত যে ধরনের ডিজিটালাইজেশন, বিভিন্ন সফটওয়্যার ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পদ্ধতি অনুসরণ করে; তা সত্ত্বেও তারা “‍সি” পেয়েছে, তাতে আমি কিছুটা অবাকই হয়েছি। এটি থেকে আমাদের অনেক শিক্ষণীয় আছে। তথ্য-উপাত্ত ভালো না হলে প্রকৃত অবস্থা প্রতিফলিত হয় না এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না। ভারত যদি এক্ষেত্রে “‍সি” পায় তাহলে বাংলাদেশের কী অবস্থা সেটি বিবেচনায় নিয়ে আমাদের আরো উন্নতি করাটা আশু করণীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

আরও